ক্ষিণবঙ্গ ও সংলগ্ন উত্তর ওড়িশার বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে ভারতের বৃহত্তম বজ্রপাত-প্রবণ বলয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুণের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল মেটিয়োরোলজির গবেষণা। কলকাতা এই বলয়ের কেন্দ্রের কাছাকাছি। নতুন জাতীয় মানচিত্র এবং পশ্চিমবঙ্গের চার দশকের আবহাওয়ার বিশ্লেষণও পূর্ব ও মধ্য ভারতে মাটিতে আঘাত করা বজ্রপাতের উচ্চ ঘনত্বের কথা বলছে।

১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের তথ্য বিশ্লেষণে কলকাতায় ৬১টি বিপর্যয়কর বজ্রঝড় নথিভুক্ত হয়েছে—পরীক্ষিত এলাকার মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দক্ষিণবঙ্গের উপকূলীয় অংশে প্রবল বজ্রঝড় তৈরির অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যায়। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের আবহাওয়া দপ্তরের পর্যবেক্ষণভিত্তিক ২০২৬ সালের আরেক গবেষণায় কলকাতায় বজ্রপাতের দিন মার্চে ১৭ থেকে মে মাসে ৭০-এ ওঠার কথা এসেছে।

বজ্রপাতে মৃত্যুর সরকারি হিসাব উৎসভেদে আলাদা। রাজ্যের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৩০৪, ২০১৯ সালে ২৬৫, ২০২০ সালে ২৯৫, ২০২১ সালে ২৬০ এবং ২০২২ সালে ২২৯ জন মারা যান। ২০২৩ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত আরও ১০৬ জনের মৃত্যু ধরে ওই সময় মোট সংখ্যা ছিল ১,৪৫৯।

অপরাধ নথিবিভাগের হিসাবে ২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গে বজ্রপাতে মৃত্যু ১৪৩। আবহাওয়া দপ্তরের বিপর্যয়কর আবহাওয়া-নথিতে ২০২৪ সালে বজ্রঝড় ও বজ্রপাতে ৬০ মৃত্যু এবং ৩১৫ জন আহতের কথা আছে। রাজ্য কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালে ১৩৯ মৃত্যুর হিসাব দিয়েছে। সংজ্ঞা ও তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি আলাদা হওয়ায় সংখ্যাগুলিকে সরাসরি ধারাবাহিক তালিকা হিসেবে তুলনা করা যায় না।

বাংলার ভূগোল ঝুঁকির প্রধান কারণ। গরম মাসে স্থলভাগ দ্রুত উত্তপ্ত হয়, আর বঙ্গোপসাগর থেকে বিপুল জলীয় বাষ্প আসে। উষ্ণ আর্দ্র বায়ু দ্রুত উঠে বিশাল বজ্রমেঘ তৈরি করে। মেঘের ভিতরে জলকণা, বরফ ও নরম শিলার সংঘর্ষে বৈদ্যুতিক আধান আলাদা হয়; ব্যবধান অতিরিক্ত বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ মাটি বা অন্য মেঘের দিকে নেমে আসে।

গবেষণায় দক্ষিণবঙ্গের বায়ুমণ্ডলে দ্রুত ঊর্ধ্বগতির জন্য বিপুল শক্তি এবং সেই গতি আটকানোর তুলনামূলক দুর্বল বাধা পাওয়া গেছে। কলকাতার কংক্রিট ও পিচ দিনের তাপ ধরে রেখে স্থানীয় অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে। দূষণের কণা মেঘ তৈরিতে ভূমিকা রাখলেও দূষণ সরাসরি বজ্রপাত বাড়াচ্ছে—এমন সরল কারণগত সিদ্ধান্তে বিজ্ঞানীরা সতর্ক।

মৃত্যুর প্রধান কারণ শুধু বজ্রপাতের সংখ্যা নয়; মানুষের উন্মুক্ত অবস্থান। কৃষক, মৎস্যজীবী, নির্মাণকর্মী ও মাঠে কাজ করা মানুষ ঝড়ের সময়ে নিরাপদ পাকা আশ্রয় থেকে দূরে থাকেন। গাছের নিচে দাঁড়ানো, জলাশয়ে থাকা বা খোলা মাঠে মোবাইল ব্যবহার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

পূর্বাভাস থাকলেও তা গ্রামের শ্রমিকের কাছে সময়মতো এবং কার্যকর নির্দেশ হিসেবে না-পৌঁছলে উপগ্রহের তথ্য জীবন বাঁচায় না। বজ্রপাতের সতর্কতা স্থানীয় ভাষায় ফোনবার্তা, পঞ্চায়েতের ঘোষণা এবং কাজ বন্ধ করার স্পষ্ট নিয়মে রূপান্তর করতে হবে।

প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্লকে সহজ বজ্রনিরোধক আশ্রয়, বিদ্যালয়ে মহড়া এবং মাঠের শ্রমিকের জন্য নিরাপত্তা-প্রটোকল প্রয়োজন। মৃত্যুর ভিন্ন সরকারি সংখ্যা মিলিয়ে এক উন্মুক্ত তথ্যভান্ডারও তৈরি করা উচিত। আকাশের বিদ্যুৎ বন্ধ করা যাবে না; সতর্কবার্তা ও নিরাপদ আশ্রয়ের মধ্যে ব্যবধান অবশ্যই কমানো যায়।