বাঙালির গান্ধিকে নিয়ে এত আপত্তি কেন?

যা জানা জরুরি
- সুমন চট্টোপাধ্যায়: বাঙালি কেন গান্ধিকে তেমন পছন্দ করে না?
- গান্ধির নাম উঠলেই কেউ বলেন, তিনি সুভাষচন্দ্রকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।
- কারও অভিযোগ, বিপ্লবীদের আত্মত্যাগের মূল্য তিনি বোঝেননি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সুমন চট্টোপাধ্যায়: বাঙালি কেন গান্ধিকে তেমন পছন্দ করে না? কথাটা অনেকবার শুনেছি। গান্ধির নাম উঠলেই কেউ বলেন, তিনি সুভাষচন্দ্রকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। কেউ দেশভাগের জন্য তাঁকে দায়ী করেন। কারও অভিযোগ, বিপ্লবীদের আত্মত্যাগের মূল্য তিনি বোঝেননি। তবে সব বাঙালির মনোভাব এক নয়। বাংলায় গান্ধির অসংখ্য অনুগামীও ছিলেন। আমাদের প্রশ্ন হল, বাঙালির একটি অংশের মনে তাঁর বিরুদ্ধে এত ক্ষোভ তৈরি হল কেন? সেই ক্ষোভে বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে, আবার কিছু ভুল ধারণাও আছে।
এখানে বাঙালি বলতে কাদের বোঝাচ্ছি, সেটাও জরুরি। কলকাতার মধ্যবিত্ত, পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু, মুসলমান কৃষক এবং মেদিনীপুরের কংগ্রেসকর্মীর অভিজ্ঞতা এক নয়। একটি গোষ্ঠীর স্মৃতিকে সকলের মত বলে ধরলে ভুল হবে। আবার বাঙালি মাছ খায়, গান্ধি নিরামিষাশী ছিলেন, তাই তাঁকে পছন্দ করে না—এমন ব্যাখ্যাও যথেষ্ট নয়। বাংলায় কঠোর সংযমী ও ত্যাগী মানুষ গভীর শ্রদ্ধা পেয়েছেন। খাবার বা পোশাকের ফারাক দিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত বোঝা যায় না। বরং দেখতে হবে, কোন সিদ্ধান্তে কার আশা ভেঙেছে, কার নিরাপত্তা বিপন্ন হয়েছে, কার রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মানুষের ক্ষোভের কারণ খুঁজতে হলে এই অভিজ্ঞতাগুলিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এটাই আলোচনার প্রয়োজনীয় ভিত্তি।
সবার আগে আসে সুভাষচন্দ্র বসুর কথা। বাঙালির কাছে তিনি সাহস ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। এমন একজন মানুষ, যিনি গোটা দেশকে নেতৃত্ব দিতে পারতেন। তাঁর সঙ্গে গান্ধির সংঘাত তাই অনেকের কাছে শুধু রাজনৈতিক মতবিরোধ হয়ে থাকেনি। হয়ে উঠেছে বাঙালির অপমানের ইতিহাস। এই অনুভূতির পিছনে নির্দিষ্ট ঘটনাও রয়েছে। ১৯৩৯ সালে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচনে সুভাষ ২০৩ ভোটে হারান গান্ধির সমর্থিত প্রার্থী পট্টাভি সীতারামাইয়াকে। গান্ধি বলেন, এই পরাজয় সীতারামাইয়ার চেয়ে তাঁর নিজের পরাজয় বেশি।
এর পরে কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির অধিকাংশ সদস্য পদত্যাগ করেন। ত্রিপুরী অধিবেশনে প্রস্তাব গৃহীত হয়, সভাপতিকে গান্ধির ইচ্ছানুযায়ী কমিটি গড়তে হবে। পরিস্থিতিটা ভাবুন। সুভাষ ভোটে জিতেছেন, কিন্তু দল চালাতে দরকার তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর সমর্থকের সম্মতি। শেষ পর্যন্ত তিনি সভাপতিত্ব ছাড়েন। আলোচনা হয়েছিল, নেহরু তাঁকে পদত্যাগ প্রত্যাহার করতেও বলেছিলেন। তবু সমাধান হয়নি। এখানেই গান্ধির বিরুদ্ধে জোরালো প্রশ্ন ওঠে: তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব কি নির্বাচিত সভাপতির ক্ষমতার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল?
বিরোধের পিছনে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভিন্ন চিন্তা ছিল। সুভাষ পরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং রাষ্ট্রের উদ্যোগে দারিদ্র্য দূর করার পক্ষে ছিলেন। গান্ধি জোর দিতেন গ্রাম, ছোট উৎপাদন ও স্থানীয় স্বনির্ভরতায়। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে এসব তর্ক সরল হয়ে দাঁড়ায়: আমাদের সুভাষকে উঠতে দেওয়া হয়নি। সুভাষ থাকলে দেশভাগ হত না, এমন কথাও শোনা যায়। এই আক্ষেপ বোঝা যায়; তবে যা ঘটেনি, তার পরিণতি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। আবার ১৯৪৪ সালের বেতার ভাষণে সুভাষ নিজেই গান্ধিকে ‘জাতির পিতা’ সম্বোধন করে আশীর্বাদ চেয়েছিলেন। বিরোধের মধ্যেও শ্রদ্ধা ছিল।
দ্বিতীয় কারণ বাংলার বিপ্লবী ঐতিহ্য। ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন, সূর্য সেন, প্রীতিলতা কিংবা বিনয়-বাদল-দীনেশের আত্মত্যাগ আমাদের স্বাধীনতার স্মৃতির বড় অংশ। এই ইতিহাস থেকে প্রশ্ন ওঠে, অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা ভুল হবে কেন? গান্ধির বক্তব্য ছিল, স্বাধীনতা পাওয়ার লক্ষ্য যেমন জরুরি, তার পথও তেমন জরুরি। তিনি অহিংস সংগ্রাম চাইতেন। সেই পথেও সাহস লাগে। কিন্তু বিপ্লবীদের অনুগামীদের কারও মনে হতে পারত, গান্ধি তাঁদের প্রিয় নায়কদের লড়াইকে যথেষ্ট মর্যাদা দিচ্ছেন না।
১৯২২ সালে চৌরিচৌরার হিংসার পরে অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত এই দূরত্ব বাড়িয়েছিল। সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল, একটি জায়গার ঘটনার জন্য সারা দেশের আন্দোলন থামবে কেন? পরে চিত্তরঞ্জন দাশ ও মতিলাল নেহরু স্বরাজ্য দল গড়ে আইনসভায় প্রবেশের পথ নেন। কাজেই গান্ধির কৌশল নিয়ে বাংলার প্রশ্ন সুভাষকে দিয়ে শুরু হয়নি। তবে ভগৎ সিংহকে বাঁচানোর চেষ্টাই গান্ধি করেননি, এই অভিযোগ ভুল। ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ তিনি ভাইসরয়কে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। চেষ্টা যথেষ্ট ছিল কি না, সেই প্রশ্ন আলাদা।
তৃতীয় এবং গভীরতম কারণ দেশভাগ। উদ্বাস্তু পরিবারের কাছে স্বাধীনতার গল্প অন্যরকম। দেশের পতাকা উঠেছে, কিন্তু তাঁদের মাথার ছাদ চলে গিয়েছে। হারিয়েছে জমি, পেশা, পরিচিত পাড়া। যাঁকে স্বাধীনতার প্রধান নেতা বলা হচ্ছে, তাঁর কাছেই সেই মানুষ জানতে চাইতে পারেন: আমাদের রক্ষা করা গেল না কেন? এই ক্ষোভকে অজ্ঞতা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। গান্ধিকে যত স্বাধীনতার সর্বক্ষমতাময় মুখ হিসেবে দেখানো হয়েছে, স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিপর্যয়ের দায়ও তত সহজে তাঁর উপর পড়েছে।
কিন্তু গান্ধি একাই দেশভাগ করেছেন, এমন দাবি ইতিহাসসম্মত নয়। ব্রিটিশ সরকার, মুসলিম লীগের পাকিস্তান-দাবি, কংগ্রেস নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাত মিলিয়ে বিভাজন ঘটেছিল। গান্ধি দেশভাগের বিরোধী ছিলেন। তবে ১৯৪৭ সালের ১৪ জুন কংগ্রেসের সভায় তিনি নেতৃত্বের গৃহীত বিভাজন-পরিকল্পনা মেনে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি দেন। তাই তাঁর কোনও রাজনৈতিক দায় নেই বলাও ঠিক নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, বিরোধী হয়েও তিনি শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্ষে দাঁড়ালেন কেন? বিকল্প পথ তৈরি করতে পারলেন না কেন?
বাংলার নিজেদের নেতৃত্বের ভূমিকাও মনে রাখতে হবে। ইতিহাসবিদ জয়া চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন, বাঙালি হিন্দু সমাজের প্রভাবশালী অংশও বাংলা ভাগের দাবিতে আন্দোলন করেছিল। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের ভয় এবং ক্ষমতার হিসাব ছিল। দেশভাগের সমস্ত দায় গান্ধির উপর চাপালে এই ইতিহাস আড়াল হয়। উদ্বাস্তুর যন্ত্রণা সত্য, কিন্তু সেই যন্ত্রণার জন্য কে কতটা দায়ী, তা বুঝতে আলাদা বিচার দরকার। ব্যক্তিগত ক্ষতি কোনও নির্দিষ্ট নেতার বিরুদ্ধে প্রতিটি অভিযোগকে সত্য করে দেয় না।
গান্ধি বাংলার হিন্দুদের বিপদের সময় পাশে দাঁড়াননি, এই অভিযোগও ঠিক নয়। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের পরে তিনি নোয়াখালিতে যান। নভেম্বর থেকে পরের মার্চ পর্যন্ত সেখানে কাজ করেন। সব সমস্যার সমাধান হয়নি, স্থায়ী নিরাপত্তাও আসেনি। কিন্তু বিপন্ন মানুষের মধ্যে মাসের পর মাস থাকার ঘটনাকে উদাসীনতা বলা যায় না। তাঁর কাজের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন করা যায়; সেই কাজটাই অস্বীকার করলে সমালোচনা দুর্বল হয়।
কলকাতায় ক্ষোভের বড় কারণ ছিলেন সোহরাওয়ার্দী। ১৯৪৬ সালের হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি বাংলার সরকারপ্রধান। বহু হিন্দু তাঁকে বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করতেন। পরের বছর গান্ধি তাঁকে সঙ্গে নিয়ে শান্তি ফেরাতে গেলে প্রশ্ন ওঠে, দায়ী মানুষটিই আবার সম্মান পাচ্ছেন কেন? গান্ধি বেলেঘাটায় বিক্ষোভের মুখে পড়েন। তাঁর যুক্তি ছিল, সোহরাওয়ার্দীকে শান্তি ফেরানোর দায়িত্ব নিতে হবে। কিন্তু আক্রান্ত মানুষের বিচার পাওয়ার প্রশ্ন তাতে মেটে না। আবার সেপ্টেম্বরের অনশনের মাধ্যমে কলকাতায় শান্তি ফেরাতেও গান্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।
এই জায়গায় একটি মানবিক সমস্যাও আছে। সর্বস্ব হারানো মানুষকে গান্ধি বলছেন, প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিরপরাধকে আঘাত করা চলবে না। কথাটি ন্যায়সংগত। কিন্তু আহত মানুষের মনে হতে পারে, আমাদেরই এত সংযম দেখাতে হবে কেন? গান্ধির প্রতি ক্ষোভের কিছুটা তাঁর নৈতিক দাবির কঠিনতা থেকেও আসতে পারে। তিনি যে আত্মসংযম চাইতেন, তীব্র শোক ও রাগের মধ্যে তা ধরে রাখা সহজ নয়। মানুষের এই অসহায়তাও বুঝতে হবে।
চিন্তার বিরোধের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ রবীন্দ্রনাথ। গান্ধির চরকাকেন্দ্রিক কর্মসূচি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন। দেশের দরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বাধীন চিন্তা, নানা ধরনের কাজ। একটি কাজকে মুক্তির প্রধান পথ করে দেখানো কেন? ১৯৩৪ সালের বিহারের ভূমিকম্পকে গান্ধি অস্পৃশ্যতার পাপের শাস্তি বললেও রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করেন। সামাজিক অন্যায়ের সঙ্গে প্রাকৃতিক ঘটনার এমন সম্পর্ক প্রমাণিত নয়। গান্ধির বক্তব্যের বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর আপত্তির পরিষ্কার জায়গা এটি। কিন্তু তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাও গভীর ছিল। মতভেদকে ঘৃণা বলা যাবে না।
সব বাঙালির সমালোচনার কারণও এক নয়। দলিত দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন ওঠে স্বাধীন রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে। ১৯৩২ সালে অবদমিত শ্রেণির পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর বিরোধিতা করে গান্ধি অনশন করেন। পুনা চুক্তিতে তার বদলে যৌথ নির্বাচকমণ্ডলীতে সংরক্ষিত আসন হয়। আম্বেদকরের উদ্বেগ ছিল নিপীড়িত মানুষের নিজেদের প্রতিনিধি বাছার স্বাধীনতা। বাংলায় বামপন্থী সমালোচনার প্রশ্ন আবার সম্পত্তি ও ক্ষমতার বণ্টন নিয়ে। ধনীর সামাজিক দায়িত্বের উপর গান্ধির জোর তাঁদের কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি, যদিও তাঁর ভাবনায় সম্পদের সামাজিক নিয়ন্ত্রণও ছিল।
স্বাধীনতার ইতিহাস বলার ধরন থেকেও ক্ষোভ জন্মাতে পারে। একজনই দেশকে স্বাধীন করেছেন, এমন ধারণা ছড়ালে বিপ্লবী, কৃষক, শ্রমিক, আজাদ হিন্দ বাহিনী এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষের অবদান চাপা পড়ে। কিন্তু তাঁদের মর্যাদা ফেরাতে গান্ধির অবদান মুছে দেওয়াও ভুল। সুভাষকে ভালোবাসতে গান্ধিকে ঘৃণা করা বাধ্যতামূলক নয়। আবার গান্ধিকে সম্মান করতে সুভাষের প্রতি অন্যায় অস্বীকার করতে হবে না। ইতিহাসকে দুই দলের প্রতিযোগিতা বানালে উভয়কেই ঠিকভাবে বোঝা কঠিন হয়।
বাংলার ইতিহাসেই আছেন মাতঙ্গিনী হাজরা, মানুষের ‘গান্ধিবুড়ি’। তাঁর আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধা করব, অথচ তাঁর গান্ধীয় প্রেরণা ভুলে যাব কেন? বাঙালির গান্ধি-অস্বস্তিতে তাই সুভাষের অভিমান, বিপ্লবীদের স্মৃতি, দেশভাগের ক্ষত এবং যুক্তিসংগত মতভেদ একসঙ্গে আছে। সঙ্গে আছে কিছু অর্ধসত্য। গান্ধির কর্তৃত্ব, সিদ্ধান্ত ও ভুল বিশ্বাসের সমালোচনা অবশ্যই করা যায়। পাশাপাশি নোয়াখালি ও কলকাতায় তাঁর কাজও স্বীকার করতে হবে। বাংলাকে ভালোবাসা এবং গান্ধিকে ন্যায্যভাবে বিচার করা একসঙ্গেই সম্ভব।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



