আর জি করের নিহত চিকিৎসকের দেহ তড়িঘড়ি দাহ এবং তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগে রাজ্য পুলিশের দায়ের করা মামলার তদন্তভার সিবিআইকে দিল কলকাতা হাইকোর্ট। বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, বিচারপতি শম্পা সরকার ও বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের ডিভিশন বেঞ্চ এই নির্দেশ দেয়। আদালতের বক্তব্য, একই বিষয় নিয়ে কেন্দ্রীয় সংস্থা এবং রাজ্য পুলিশ সমান্তরাল তদন্ত চালাতে পারে না।

নিহত চিকিৎসকের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে ৮ আগস্ট খড়দহ থানায় পৃথক এফআইআর দায়ের হয়েছিল। অথচ আর জি করের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ইতিমধ্যেই হাইকোর্টের নজরদারিতে খতিয়ে দেখছে সিবিআইয়ের বিশেষ তদন্তকারী দল। সেই তদন্তের আওতায় দাহের ঘটনাও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজ্য পুলিশের নতুন তদন্ত কীভাবে শুরু হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বেঞ্চ।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর আদালত খড়দহ থানার আইসি এবং তদন্তকারী অফিসারকে সশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলেছিল। বৃহস্পতিবার তাঁরা হাজির হলেও তাঁদের বক্তব্যে সন্তুষ্ট হয়নি ডিভিশন বেঞ্চ। ভবিষ্যতে আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে আদালত জানায়, খড়দহ থানার তদন্তকারী অফিসার এই মামলায় আর কোনও পদক্ষেপ করতে পারবেন না। সমস্ত নথি অবিলম্বে সিবিআইয়ের বিশেষ তদন্তকারী দলের হাতে তুলে দিতে হবে।

মামলাটির কেন্দ্রে রয়েছে পরিবারের সম্মতি ছাড়াই দ্রুত দাহের অভিযোগ। চিকিৎসকের বাবার দাবি, দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের সম্ভাবনা বন্ধ করে প্রমাণ আড়াল করতেই দাহে তাড়াহুড়ো করা হয়েছিল। অভিযোগে নাম রয়েছে পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষ, প্রাক্তন পুরপ্রধান সোমনাথ দে এবং পরিবারের প্রতিবেশী সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের। এই অভিযোগগুলির সত্যতা নির্ধারণ করাই তদন্তের বিষয়; বৃহস্পতিবারের নির্দেশে তাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।

পৃথক তদন্তের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পটভূমিও রয়েছে। গত ৮ অগস্ট মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্য পুলিশকে নতুন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, দাহের খরচ মকুব করা এবং পরিবারের সদস্যের স্বাক্ষর না থাকার মতো বিষয়গুলির উত্তর পাওয়া প্রয়োজন। পরিবারের অভিযোগ, বাড়িতে দেহ আনার পর তাঁদের আপত্তি সত্ত্বেও পানিহাটির শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল।

এই মামলাতেই ১৩ আগস্ট ওড়িশার সম্বলপুর থেকে নির্মল ঘোষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে ৩ সেপ্টেম্বর বেঙ্গালুরু থেকে গ্রেফতার হন সোমনাথ দে। ফলে তদন্তভার বদলের সঙ্গে ধৃতদের হেফাজতের বিষয়টিও সামনে এসেছে। হাইকোর্ট জানিয়েছে, খড়দহের মামলায় কেউ হেফাজতে থাকলে তাঁকে আরও হেফাজতে রাখা প্রয়োজন কি না, তা সিবিআইয়ের বিশেষ দল বিবেচনা করবে এবং সংশ্লিষ্ট আদালতে প্রয়োজনীয় আবেদন জানাবে।

এর আগে ২১ মে হাইকোর্ট সিবিআইয়ের পূর্বাঞ্চলের যুগ্ম অধিকর্তার নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল। ঘটনার রাতে চিকিৎসকের সহকর্মীদের সঙ্গে নৈশভোজ থেকে তাঁর দেহ দাহ পর্যন্ত সমগ্র ঘটনাক্রম খতিয়ে দেখতে বলা হয়। পরিবারের তোলা প্রমাণ নষ্ট এবং ঘটনা চাপা দেওয়ার অভিযোগও সেই অনুসন্ধানের অন্তর্ভুক্ত। জুনে তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও অসন্তোষ জানিয়েছিল আদালত। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই অনুসন্ধান শেষ করা যায় না। বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের কথা বারবার বলা হলেও তার সমর্থনে তদন্তে কী পাওয়া গিয়েছে, রিপোর্টে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। পরিবারের অভিযোগও পুনর্বিবেচনা করতে বলা হয়েছিল।

২০২৪ সালের ৯ আগস্ট আর জি কর হাসপাতালের সেমিনার কক্ষে চিকিৎসকের দেহ উদ্ধার হয়। ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় প্রাক্তন সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে শিয়ালদহ আদালত। তার পরেও বৃহত্তর ষড়যন্ত্র এবং প্রমাণ লোপাটের অভিযোগের তদন্ত চলছে।

বৃহস্পতিবারের নির্দেশের তাৎপর্য, দাহ নিয়ে পরিবারের অভিযোগ এখন আদালতের নজরদারিতে চলা একই তদন্তের অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হবে। পৃথক সংস্থার হাতে একই ঘটনার অনুসন্ধান চালানোর অবকাশ রইল না। পুলিশের সংগৃহীত নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাইয়ের দায়িত্বও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী দলের হাতে গেল।