‘বিষ’ মন্তব্যে পিএমওর নজর, প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা

যা জানা জরুরি
- বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে থাকা আম্বেদকরপন্থী লেখালেখিকে সমাজমাধ্যমের একটি বেনামি পোস্টে ‘বিষ’ বলে আক্রমণের পর বিষয়টি পর্যালোচনা করছে প্রধানমন্ত্রীর দফতর (পিএমও)।
- আর তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাবিদ কাঞ্চা ইলাইয়া শেফার্ড।
- তাঁর প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি নিয়ে সিদ্ধান্ত বা পর্যালোচনার ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা দফতর কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা থাকার কথা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে থাকা আম্বেদকরপন্থী লেখালেখিকে সমাজমাধ্যমের একটি বেনামি পোস্টে ‘বিষ’ বলে আক্রমণের পর বিষয়টি পর্যালোচনা করছে প্রধানমন্ত্রীর দফতর (পিএমও)। আর তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাবিদ কাঞ্চা ইলাইয়া শেফার্ড। তাঁর প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি নিয়ে সিদ্ধান্ত বা পর্যালোচনার ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা দফতর কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা থাকার কথা। সেখানে পিএমও সরাসরি যুক্ত হচ্ছে কেন?
বিতর্কটি তাই শুধু কয়েকটি বই বা লেখাকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে উচ্চশিক্ষায় পাঠ্যসূচি নির্ধারণের প্রক্রিয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতার প্রশ্নও।
কোথা থেকে বিতর্ক
বিতর্কের সূত্রপাত ‘দ্য স্টোরি টেলার’ নামে একটি এক্স অ্যাকাউন্টের ২৬ সেপ্টেম্বরের পোস্টকে ঘিরে। পোস্টে পিতৃতন্ত্র, জাতপাতের বিনাশ এবং ইতিহাসচর্চায় ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের সমালোচনাকে একসঙ্গে নিশানা করা হয়েছে। পোস্টদাতার অভিযোগ, এই ধরনের লেখা তরুণদের মনে ‘বিষ’ ঢোকাচ্ছে এবং বামপন্থীরা এর মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ কর্মী তৈরি করছে।
তবে এগুলি পোস্টদাতার রাজনৈতিক অভিযোগ, কোনও প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাগত মূল্যায়ন নয়।
পোস্টে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি স্নাতকোত্তর স্তরের দলিতচর্চার পাঠ্যতালিকার প্রসঙ্গ তুলে বি আর আম্বেদকরের Annihilation of Caste, শর্মিলা রেগের Against the Madness of Manu এবং জ্যোতিবা ফুলের Gulamgiri-র নাম উল্লেখ করা হয়েছে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ব্রজরঞ্জন মণি ও গেইল ওমভেটের লেখার কথাও বলা হয়েছে। অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গে মহিষাসুরকে ঘিরে বিকল্প আখ্যানের বই নিয়েও আপত্তি তোলা হয়েছে।
তবে ওই পোস্টে পাঠ্যসূচি নিয়ে করা প্রতিটি দাবি স্বাধীন ভাবে যাচাই করা যায়নি।
বই মানেই মত মানা নয়
এই বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির একটি হল—কোনও লেখাকে পাঠ্যসূচিতে রাখা আর সেই লেখকের প্রতিটি বক্তব্যকে শিক্ষার্থীদের মেনে নিতে বলা কি একই বিষয়?
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে কোনও বই থাকার অর্থ সাধারণত সেই বইটি নিয়ে পড়াশোনা, বিশ্লেষণ এবং সমালোচনার সুযোগ তৈরি করা। জাতপাত, সামাজিক আধিপত্য, লিঙ্গবৈষম্য কিংবা প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা সেই আলোচনার অংশ হতে পারে। একই সঙ্গে সেই লেখার যুক্তি বা সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত করার জায়গাও শিক্ষার্থীর থাকে।
দিল্লির ডক্টর বি আর আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘Reading Ambedkar’ পাঠক্রমের বিবরণেও আম্বেদকরকে আধুনিক ভারতের অন্যতম নির্মাতা ও প্রভাবশালী চিন্তাবিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের তাঁর লেখা নিয়মিত ও গভীর ভাবে পড়ার সুযোগ দেওয়াই ওই পাঠক্রমের অন্যতম উদ্দেশ্য। সেখানে এটাও বলা হয়েছে, তাঁর কিছু লেখা পাঠকের প্রচলিত বিশ্বাস ও চিন্তার কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
অর্থাৎ কোনও লেখা অস্বস্তিকর বা বিতর্কিত হওয়া এবং সেটি শিক্ষাগত ভাবে অপ্রয়োজনীয় হওয়া—দুটি এক বিষয় নয়।
প্রশ্ন পিএমওর ভূমিকা নিয়েও
শেফার্ডের আপত্তির জায়গাটি মূলত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে। কোনও বইয়ের তথ্য, যুক্তি বা পাঠ্য হিসেবে উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু সেই প্রশ্নের বিচার করবেন কারা, কী ধরনের বিশেষজ্ঞ মত নেওয়া হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষাগত সিদ্ধান্তকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষত কোনও পরিচয়হীন সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্টের অভিযোগ যদি সরকারি পর্যালোচনার সূত্র হয়ে থাকে, তা হলে সেই অভিযোগ কী ভাবে যাচাই করা হচ্ছে, সেটিও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।
এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পিএমও বিষয়টি পর্যালোচনা করছে বলে জানা গেলেও কোনও নির্দিষ্ট বই নিষিদ্ধ করা হয়েছে বা পাঠ্যসূচি থেকে বাদ দেওয়ার চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য নেই। ফলে ঘটনাটিকে এখনই ‘বই সরানোর সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না।
পর্যালোচনার লিখিত নির্দেশ, তার পরিধি, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বক্তব্য এবং সরকারের বিস্তারিত ব্যাখ্যা সামনে এলে উদ্যোগটির প্রকৃতি আরও স্পষ্ট হবে।
স্বাধীনতার প্রশ্ন
শেষ পর্যন্ত বিতর্কটি গিয়ে ঠেকছে উচ্চশিক্ষায় মতভেদের জায়গা কতটা থাকবে, সেই প্রশ্নে। আম্বেদকর বা তাঁর অনুসারী লেখকদের বক্তব্য সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। একই ভাবে তাঁদের লেখা নিয়ে সমাজমাধ্যমে ওঠা অভিযোগও যাচাইয়ের বাইরে থাকতে পারে না।
কোনও পাঠ্যসূচি বদলানোর আগে বিষয়বিশেষজ্ঞদের মত, সেই পাঠের শিক্ষাগত উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তি সামনে আসা জরুরি। তবেই বোঝা সম্ভব হবে, পর্যালোচনার লক্ষ্য পাঠ্যসূচির শিক্ষাগত মান যাচাই করা, নাকি সমাজমাধ্যমে ওঠা মতাদর্শগত আপত্তিও সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



