ধ্বংসস্তূপের নীচে ১০ হাজার দেহ?

যা জানা জরুরি
- গাজা সিটির তেল আল-হাওয়া এলাকায় রাস্তার সামান্য একটি অংশ পরিষ্কার করতেই কেটে গেল গোটা দিন।
- দিনের শেষে রাষ্ট্রপুঞ্জের ইঞ্জিনিয়ার আহমেদ আলিয়ান ক্লান্ত, অবসন্ন।
- দীর্ঘ, তপ্ত দিনের শেষে কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছিল তাঁর।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
গাজা সিটির তেল আল-হাওয়া এলাকায় রাস্তার সামান্য একটি অংশ পরিষ্কার করতেই কেটে গেল গোটা দিন। দিনের শেষে রাষ্ট্রপুঞ্জের ইঞ্জিনিয়ার আহমেদ আলিয়ান ক্লান্ত, অবসন্ন। অথচ চারপাশে তখনও ধ্বংসস্তূপের পাহাড়।
দীর্ঘ, তপ্ত দিনের শেষে কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছিল তাঁর। আলিয়ানের কথায়, “মনে হচ্ছে, হাতে একটা চামচ নিয়ে আমরা সমুদ্র খালি করার চেষ্টা করছি।”
বেইরুট স্ট্রিটে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)-র যে দলটি কাজ করছে, আলিয়ান তারই সদস্য। একসময় গাজা সিটির অন্যতম ব্যস্ত সড়ক ছিল এই রাস্তা। দু’পাশে দোকান, অফিস, বাড়ি—রাস্তায় ছিল গাড়ি আর মানুষের ভিড়। এখন সেখানে শুধুই ধ্বংসস্তূপ, ভাঙা কংক্রিট আর নিস্তব্ধতা।
ধ্বংসস্তূপ ও বিধ্বস্ত দোকানের অংশ জমে রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কাছেই একটি বহুতল হেলে দাঁড়িয়ে। কংক্রিটের ভিতের একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত। তবু ঘরছাড়া কয়েকটি পরিবার তখনও সেখানে আশ্রয় নিয়ে ছিল। ইজরায়েলি বোমাবর্ষণে নিকাশি ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত ও অবরুদ্ধ হওয়ায় কোথাও কোথাও রাস্তার মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছিল নোংরা জল।
রাষ্ট্রপুঞ্জের হিসাব বলছে, গাজা ভূখণ্ডের ধ্বংসস্তূপের অধিকাংশ সরাতেই সাত থেকে দশ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। খরচ হতে পারে কয়েকশো কোটি ডলার। অর্থাৎ যুদ্ধ থামলেও ধ্বংসস্তূপ সরানোর যুদ্ধ শেষ হতে এখনও বহু বছর বাকি।
প্যালেস্টাইনে রাষ্ট্রপুঞ্জের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-র বিশেষ প্রতিনিধি জাকো সিলিয়ার্সের হিসাব অনুযায়ী, গাজায় জমে থাকা ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি ১০ লক্ষ টন। তাঁর দাবি, গত ১৮ বছরে বিশ্বের সমস্ত যুদ্ধে তৈরি হওয়া ধ্বংসস্তূপের পরিমাণের প্রায় ২০ গুণ এটি।
কাজটি শুধু বিশাল নয়, ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণও। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে মৃতদেহের সম্ভাব্য অবশেষ এবং অবিস্ফোরিত বোমা। তবু রাস্তা পরিষ্কারের কাজ চলছে। এখনও পর্যন্ত ৫৮০ কিলোমিটার রাস্তা পরিষ্কার করা হয়েছে। তাতে ত্রাণবাহী ট্রাক, উদ্ধার ও ত্রাণকর্মী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলের কিছুটা সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কিন্তু এই বিপুল ধ্বংসস্তূপের তুলনায় সরানো হয়েছে সামান্যই। প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময়ের কাজের পর ৯ লক্ষ ৭ হাজার টন ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়েছে। তার মধ্যে ৩ লক্ষ টনেরও বেশি প্রক্রিয়াকরণ করে ফের ব্যবহারযোগ্য করা হয়েছে। মোট ধ্বংসস্তূপের তুলনায় এই পরিমাণ মাত্র দেড় শতাংশের মতো।
কাজ আরও কঠিন করে তুলেছে গাজায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ঢোকানোর উপর ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষের বিধিনিষেধ। তাদের যুক্তি, খাদ্য ও ওষুধ ছাড়া প্রায় সব ধরনের সহায়তাসামগ্রীই অসামরিক এবং সামরিক—দুই কাজেই ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে সেগুলি কোনও না কোনও ভাবে হামাসের কাজে লাগতে পারে।
শুরুতে ডব্লিউএফপির কাজ ছিল মূলত রাস্তা থেকে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দু’পাশে ঠেলে রাখা, যাতে অন্তত ত্রাণবাহী ট্রাক চলতে পারে। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ এতটাই বেড়ে যায় যে সেই কাজও কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইজরায়েলি বোমাবর্ষণ অব্যাহত থাকায় কিছু রাস্তা বারবার পরিষ্কার করে খুলতে হয়েছে।
তার উপর এগিয়ে আসছে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’। গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির সময় এই সীমানারেখা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ইজরায়েলি সেনা আরও ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকায় রেখাটিও সরে যাচ্ছে। এখন সাধারণ মানুষ ও ত্রাণকর্মীরা গাজার মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকায় পৌঁছতে পারেন। ফলে সরানো ধ্বংসস্তূপ কোথায় রাখা হবে, সেটিও হয়ে উঠেছে বড় সমস্যা।
এই পরিস্থিতিতে ধ্বংসস্তূপকেই নতুন করে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে ইউএনডিপি। গাজাজুড়ে পাঁচটি ধ্বংসস্তূপ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। রাস্তা ও ক্ষতিগ্রস্ত জরুরি পরিকাঠামো থেকে সংগ্রহ করা ধ্বংসাবশেষ প্রথমে বাছাই করা হয়। ধাতু, ইস্পাতের রড এবং কংক্রিট ছাড়া অন্যান্য উপাদান সরিয়ে ফেলার পর কংক্রিট ভেঙে ছোট ছোট টুকরো করা হয়। শেষে সেগুলি কাচের গুলি বা ছোট নুড়ির মতো আকার নেয়।
গাজায় ইউএনডিপি সাতটি পেষণযন্ত্র ব্যবহার করছে। সব ক’টিই যুদ্ধের আগে থেকে সেখানে ছিল। নতুন যন্ত্রপাতি ঢোকানো সম্ভব না হওয়ায় স্থানীয় ইঞ্জিনিয়াররা পুরনো মডেল অনুসরণ করে গত এক বছরে দু’টি যন্ত্র নিজেরাই পুনর্নির্মাণ করেছেন।
এর মধ্যে একটি কেন্দ্রের বিস্তীর্ণ চত্বরে, যেখানে আগে রাষ্ট্রপুঞ্জের গুদাম ছিল, এখন ধ্বংসস্তূপের পাহাড়। একের পর এক ট্রাক এসে প্রথমে ওজন মাপে, তার পর বোঝা নামিয়ে দেয়। কংক্রিট ভাঙার যন্ত্রের একটানা গর্জনে এলাকা মুখর। বাতাস ভরে থাকে ধুলোয়।
যন্ত্রপাতির অবস্থাও চিন্তার কারণ। গাজায় পাওয়া অধিকাংশ সরঞ্জামই জীর্ণ। কাজের মাঝেই প্রায়ই বিকল হয়ে যায়। খুচরো যন্ত্রাংশ, ইঞ্জিনের তেল এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর তীব্র অভাব পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
তবু গুঁড়ো করা ধ্বংসস্তূপের ব্যবহার মিলছে নানা জরুরি কাজে। রাস্তা মেরামত, গর্ত ভরাট কিংবা তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ের নীচে মাটি উঁচু করার কাজে তা ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্মাণসামগ্রী ঢোকানোর উপর কড়া বিধিনিষেধের মধ্যে এই পুনর্ব্যবহারই অনেক ক্ষেত্রে একমাত্র উপায়।
ডব্লিউএফপি দলের সদস্য নেহাল আবু হাসানের কথায়, এই উপকরণের মান স্বাভাবিক নির্মাণসামগ্রীর সঙ্গে তুলনীয় নয়। কাজ করাও কঠিন। “কিন্তু কোনও বিকল্প নেই,” তিনি বলেন। “আমরা যে বাস্তবতার মধ্যে বেঁচে আছি, সেই বাস্তবতাই আমাদের এই সমাধানগুলি বেছে নিতে বাধ্য করেছে।”
ধ্বংসস্তূপ সরানোর সুফল অবশ্য চোখে পড়ছে। জাবালিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে তেল আল-হাওয়ায় থাকা ইব্রাহিম দারাদোনা জানান, রাস্তা চওড়া হয়েছে, ইঁদুর-পোকার উপদ্রব কমেছে, গাড়ি চলাচল সহজ হয়েছে। শিশুদের জন্যও এলাকা কিছুটা নিরাপদ হয়েছে।
কিন্তু প্রায় তিন বছর পরেও গাজার মানবিক সংকট কাটেনি। ২১ লক্ষেরও বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ এখনও তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে ধ্বংসস্তূপ।
এই ধ্বংসস্তূপই আবার স্থানীয় অর্থনীতিকে কিছুটা সচল করার পথও খুলছে। দোকান ও ছোট ব্যবসার সামনে জমে থাকা ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে দিলে অনেক ব্যবসা ফের খুলতে পারছে। সিলিয়ার্সের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে থেকে ধ্বংসস্তূপ সরানোর পর অনেক ক্ষেত্রেই প্রায় ২০ দিনের মধ্যে সেগুলি ফের চালু হয়েছে।
তবে ধ্বংসস্তূপ মানেই শুধু কংক্রিট, ইট আর লোহার টুকরো নয়। কোনও কোনও পরিবারের কাছে তার নীচে চাপা পড়ে আছে গোটা একটি জীবন।
আবু হাসানের কথায়, “কোনও কোনও এলাকায় মানুষের কাছে ধ্বংসস্তূপ শুধুই ভাঙাচোরা জিনিস নয়; তার মধ্যে রয়েছে তাঁদের গোটা জীবন আর স্মৃতি।”
আর কোথাও কোথাও সেই ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও চাপা পড়ে থাকতে পারে মানুষের দেহ।
ইউএনডিপির অনুমান, গাজার ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও আট হাজার থেকে ১০ হাজার মৃতদেহ থাকতে পারে। কোথায় দেহাবশেষ থাকার সম্ভাবনা বেশি, তা চিহ্নিত করতে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটিসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে ইউএনডিপি। ধ্বংসস্তূপ সরানোর ক্ষেত্রেও সেই জায়গাগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এ জন্য একটি ফরেনসিক প্রক্রিয়াও গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। উদ্দেশ্য শুধু দেহাবশেষ উদ্ধার নয়—সেগুলি যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ ও শনাক্ত করা, ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সমাধিস্থ করার অধিকারকে মর্যাদা দেওয়া এবং পরিবারগুলিকে প্রয়োজনীয় নথি ও শংসাপত্র দেওয়া।
সিলিয়ার্সের কথায়, গাজার পরিবারগুলির কাছে এই কাজের গুরুত্ব অপরিসীম।
এর সঙ্গে রয়েছে আরও এক অদৃশ্য বিপদ—অবিস্ফোরিত বিস্ফোরক। রাস্তা বা ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের আগে ইউএনডিপি ও ডব্লিউএফপির দল রাষ্ট্রপুঞ্জের মাইন অপসারণ সংস্থা আনমাস, ব্রিটিশ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হ্যালো ট্রাস্ট এবং অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে। লক্ষ্য, সম্ভাব্য বিপজ্জনক জায়গা চিহ্নিত করা এবং কর্মী ও ঘরে ফিরতে থাকা পরিবারগুলিকে সতর্ক করা।
কিন্তু গাজায় বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতা সীমিত। ফলে সব অবিস্ফোরিত বোমা সরিয়ে ফেলা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে বিপজ্জনক জায়গাগুলি চিহ্নিত করে শুধু সতর্কতামূলক চিহ্ন বসানো হচ্ছে।
ধ্বংসস্তূপে অ্যাসবেস্টসের মতো ক্ষতিকর পদার্থ থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। তার তন্তু শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকলে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আংশিক দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িও বিপজ্জনক। বাইরে থেকে নিরাপদ মনে হলেও হঠাৎ ভেঙে পড়তে পারে কোনও কাঠামো।
তাই গাজা পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ শুধু ধ্বংসস্তূপ সরানো নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেহাবশেষ উদ্ধার, অবিস্ফোরিত বোমা শনাক্ত করা, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির নিরাপত্তা যাচাই এবং মানুষের বসবাসের ন্যূনতম পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
সিলিয়ার্সের কথায়, প্রাথমিক পুনরুদ্ধারের কাজ ধীর গতিতে এগোচ্ছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও পরিষেবা আনার পথে একের পর এক বাধা থাকলেও যতটা সম্ভব কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি।
কারণ গাজার সামনে এখন শুধু ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ নয়—সেই ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে থাকা মানুষ, স্মৃতি এবং একটি স্বাভাবিক জীবনের সম্ভাবনাকেও ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



