নতুন সপ্তাহের শুরুতেই বড় ধাক্কা খেল ভারতের শেয়ার বাজার। সোমবার সকাল ১০টা ৭ মিনিট নাগাদ সেনসেক্সের পতন ৯০০ পয়েন্ট ছাড়ায়, শতাংশের হিসাবে প্রায় ১.২২। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আমেরিকা–ইরান আলোচনায় অচলাবস্থা লগ্নিকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সে সময়ে ২.১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৬.৪৯ ডলারে পৌঁছয়।

বাজার খোলার পর থেকেই বাড়তে থাকে বিক্রির চাপ। সকাল ৯টা ১৭ মিনিটে সেনসেক্স ছিল ৭৩,৩৮৩.৭০ পয়েন্টে, আগের দিনের তুলনায় ৫১২.০৪ পয়েন্ট নীচে। দিনের গোড়ার এই পরিসংখ্যান অবশ্য বাজার বন্ধের চূড়ান্ত হিসাব নয়।

এই ধাক্কার আগে টানা সাত সপ্তাহ ধরে কমেছে সেনসেক্স ও নিফটি। ২০২০ সালের পর এত দীর্ঘ সাপ্তাহিক পতন আর দেখা যায়নি। গত শুক্রবার অবশ্য সামান্য ঘুরে দাঁড়িয়েছিল বাজার। সেনসেক্স ০.৪৩ শতাংশ বেড়ে ৭৩,৮৯৫.৭৪ পয়েন্টে এবং নিফটি ০.৩৪ শতাংশ উঠে ২৩,১৪০.৫০ পয়েন্টে বন্ধ হয়। তবু গোটা সপ্তাহের হিসাবে দুই সূচকের ক্ষতি কাটেনি। ফলে শুক্রবারের স্বস্তি যে স্থায়ী হয়নি, সোমবারের শুরুতেই তা স্পষ্ট। গত সপ্তাহে ষোলোটি প্রধান ক্ষেত্রের মধ্যে এগারোটিতেই পতন হয়। আর্থিক ও তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের শেয়ারে টানা চার সপ্তাহ ক্ষতি হয়েছে। দুর্বলতা কয়েকটি সংস্থার শেয়ারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

পতনের এই ধারার ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে। গত সপ্তাহের আগে পঁচিশ বছরে নিফটি টানা সাত বা তার বেশি সপ্তাহ নেমেছিল মাত্র চারবার—২০২০ সালে, ২০০৮ সালে এবং ২০০১ সালে দু’বার। ২০০১ সালে টানা ন’সপ্তাহ পতনের নজির রয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে পতন হওয়া এবং ক্ষতির পরিমাণ একই বিষয় নয়; আগের প্রতিটি সংকটের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি সমান করে দেখা চলে না।

বর্তমান অস্থিরতার কেন্দ্রে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত। হরমুজ প্রণালী ফের খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে, তেহরান জানিয়েছে, আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে বিরোধের সমাধান কূটনৈতিক পথেই সম্ভব। আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। সোমবার এশিয়ার অন্য বাজারগুলিও সামগ্রিকভাবে দুর্বল ছিল।

ভারতের ক্ষেত্রে চড়া তেলের দাম একাধিক চাপ তৈরি করতে পারে। দেশটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক। দাম বাড়লে আমদানির খরচ বাড়ে, মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয় এবং সংস্থাগুলির লাভের উপর চাপ পড়ে। টাকার বিনিময়মূল্যও তখন নজরে থাকে। এই অর্থনৈতিক যোগসূত্র থেকেই বোঝা যায়, দূরের যুদ্ধের খবর কেন মুম্বইয়ের শেয়ার বাজারে এত দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। জ্বালানির দাম স্থিতিশীল না হলে ব্যবসার ভবিষ্যৎ খরচের হিসাব করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

বিদেশি লগ্নিকারীদের বিক্রিও বাজারের দুর্বলতা বাড়াচ্ছে। প্রাথমিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুক্রবার তাঁরা নিট ৩,৬৯৪ কোটি টাকার ভারতীয় শেয়ার বিক্রি করেছেন। সেপ্টেম্বরে এখনও পর্যন্ত নিট বিক্রির পরিমাণ প্রায় ১৮০ কোটি ডলার। বছরের শুরু থেকে সেই অঙ্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,৫৮৬ কোটি ডলারে। বিদেশি অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা বাজারে নতুন করে আস্থা ফেরানোর পথে অন্যতম বাধা হয়ে রয়েছে।

তবে চাপ কেবল তেল থেকে আসছে না। আমেরিকার সরকারি বন্ডের আয়ও গত সপ্তাহে বেড়েছে। দশ বছরের মার্কিন বন্ডের আয় ৫.১০ শতাংশ ছাড়ানোয় ভারতের মতো উদীয়মান বাজারের সম্পদের তুলনামূলক আকর্ষণ কমতে পারে। দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক লগ্নিকারীদের কেনাকাটা পতনের ধাক্কা কিছুটা সামলেছে, কিন্তু সামগ্রিক দুর্বলতা দূর করতে পারেনি। আপাতত বাজারের নজর তাই তেলের দামের গতিপথ, পশ্চিম এশিয়ার কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বিদেশি লগ্নির প্রবাহের দিকে। পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধি ও সুদের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। শুক্রবারের সামান্য উত্থানের পর সোমবারের পতন দেখাচ্ছে, সাময়িক কেনাকাটা বাজারের গভীর উদ্বেগ এখনও মেটাতে পারেনি।