সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: একটি নোটিসে সময় লেখা ছিল না। কিন্তু সেই নোটিসে এমন একটি পুলিশি নথির নম্বর ছিল, যা তৈরি হয়েছিল গ্রেফতারের সময়। অথচ নোটিসটি দেওয়ার কথা গ্রেফতারের আগে। এলাহাবাদ হাইকোর্টের চোখে ধরা পড়েছিল এই অসংগতি। আদালতের সিদ্ধান্ত ছিল, আগে আকৃতি চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, পরে নোটিস তৈরি করে নিয়ম মানার চেহারা দেওয়া হয়েছে। একটি কাগজের এই ছোট্ট গরমিল আসলে বড় প্রশ্ন তোলে: আইন মেনে মানুষকে ধরা হচ্ছে, না মানুষকে ধরার পরে আইন মানার গল্প লেখা হচ্ছে?

এই প্রশ্ন থেকেই জর্জ অরওয়েলের কথা আসে। তাঁর উপন্যাসে ক্ষমতাবানরা শুধু মানুষের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করে না, কী ঘটেছে আর কী ঘটেনি, সেটিও ঠিক করে দেয়। সরকারি বিবরণের সঙ্গে বাস্তব না মিললে বিবরণ বদলায় না; বাস্তবের রেকর্ড বদলানো হয়। আকৃতির মামলায় হাইকোর্টের ধরা অসংগতিটি সেই প্রবণতার কথা মনে করায়। গ্রেফতারের সময় এবং নোটিস দেওয়ার ক্রম একটি মানুষের স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত। সেখানে পরে লেখা কাগজকে আগের ঘটনা হিসেবে দেখানো নিছক দাপ্তরিক ভুল বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আকৃতি পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরের মেয়ে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক হওয়ার পরে তিনি আইন পড়ছিলেন। সংবাদপ্রতিবেদনে তাঁর বয়স বলা হয়েছে পঁচিশ। এপ্রিল মাসে নয়ডার শ্রমিকদের আন্দোলনের সঙ্গে তিনি যুক্ত হন। শ্রমিকদের অভিযোগ ছিল, মাসে দশ থেকে পনেরো হাজার টাকা মজুরিতে বারো ঘণ্টা কাজ করতে হয়। বহুদিন বেতন বাড়েনি, অথচ ঘরভাড়া, খাবার এবং সংসারের খরচ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁরা বেশি মজুরি ও সহনীয় কাজের সময় চাইছিলেন। আকৃতি তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে হিংসার অভিযোগও ছিল। কারখানায় ভাঙচুর, আগুন লাগানো এবং পুলিশের গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহন নষ্ট করার ঘটনা প্রশাসনের বক্তব্যে উঠে আসে। রাজ্য সরকারের দাবি, আকৃতি ও তাঁর সহযোগীরা ৬–৮ এপ্রিল পরিকল্পনা করেছিলেন, কীভাবে মানেসর ও নয়ডার শ্রমিক অসন্তোষকে হিংসাত্মক করা যায়। হিংসা শুরু হয় ১৩ এপ্রিল থেকে, যখন আকৃতি ইতিমধ্যেই হেফাজতে। সরকারের যুক্তি ছিল, তিনি বাইরে না থাকলেও আগের ষড়যন্ত্রের ফলেই পরে গোলমাল হয়েছে। এই দাবির সমর্থনে কী ছিল, সেটিই আদালতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আকৃতির বক্তব্য অনুযায়ী, ১১ এপ্রিল বিকেল সাড়ে পাঁচটায় নয়ডার বোটানিক্যাল গার্ডেন মেট্রো স্টেশন থেকে পুলিশ তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। পরে বিভিন্ন থানায় রাখা হয়। পরিবার ও বন্ধুদের খবর দেওয়া হয়নি। রাজ্য সরকার বলেছিল, তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে ১২ এপ্রিল। এই এক দিনের ফারাক ছোট নয়। একজন মানুষ কখন থেকে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে, তার উপর নির্ভর করে তাঁর অধিকার রক্ষার সময়সীমা এবং পুলিশের জবাবদিহি। সরকারি খাতায় পরের দিনের তারিখ লিখলে আগের সময়টুকুর হিসাব কোথায় থাকবে?

হাইকোর্ট এই বিরোধ মেটাতে রাজ্যেরই জমা দেওয়া হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথন পরীক্ষা করে। দেখা যায়, ১১ এপ্রিল দুপুরে আকৃতি বার্তার উত্তর দিচ্ছিলেন। কিন্তু বিকেল ৫টা ৫৬ মিনিটের পর একের পর এক বার্তা এবং ফোনের উত্তর নেই। শুধু উত্তর না দেওয়াই সব ক্ষেত্রে আটকের প্রমাণ নয়। তবে মামলার অন্য পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে আদালত মনে করে, আগের সন্ধ্যা থেকেই হেফাজতে থাকার আকৃতির বক্তব্য সমর্থন পাচ্ছে। রাষ্ট্রের নিজের জমা দেওয়া তথ্যই রাষ্ট্রের সময়ের হিসাবকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

এর পরে সামনে আসে পঞ্চাশ হাজার টাকার মুচলেকার নোটিস। সরকারের বক্তব্য, ছয় মাস সদাচরণ বজায় রাখার মুচলেকা দিতে অস্বীকার করায় আকৃতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৩০ ধারার ওই নোটিসে গ্রেফতারসংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরির নম্বর দেখে বিচারপতিরা প্রশ্ন তোলেন। পরে তৈরি হওয়া নম্বর আগের নোটিসে এল কীভাবে? নোটিসে সময়ও লেখা ছিল না। আদালত সিদ্ধান্তে পৌঁছয়, নোটিসটি গ্রেফতারের পরে বানানো হয়েছে। সময় বাদ দেওয়াও ইচ্ছাকৃত। সরকারের আইনজীবীর কাছে এর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা মেলেনি।

নোটিস আগে দেওয়ার অর্থ হল, ব্যবস্থা নেওয়ার আগে মানুষটিকে জানানো, তাঁর কথা বলার সুযোগ রাখা। সেই সুযোগ না দিয়ে পরে কাগজ তৈরি করলে অধিকারটি আর থাকে না; অধিকার রক্ষা করা হয়েছে বলে একটি নথি থাকে। অরওয়েলীয় দুঃস্বপ্নের সঙ্গে মিল এখানেই। রাষ্ট্র নিজের কাজের সত্যতা যাচাই করতে নথি ব্যবহার করছে না, নিজের কাজকে ঠিক প্রমাণ করতে নথি সাজাচ্ছে। নাগরিক তখন একই সঙ্গে বন্দি এবং সরকারি গল্পের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাধ্য। তাঁর স্মৃতির চেয়ে পুলিশের কাগজকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য ধরে নেওয়ার বিপদ তৈরি হয়।

‘অরওয়েলীয় দুঃস্বপ্ন’ বা ‘অরওয়েলিয়ান ডিস্টোপিয়া’  বলতে কী বোঝায়, এই জায়গায় তা একটু পরিষ্কার করা দরকার। জর্জ অরওয়েলের ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত ‘নাইনটিন এইটি ফোর’ উপন্যাসে এমন এক সমাজ আছে, যেখানে শাসক মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, কথা বলা, এমনকি চিন্তার উপরও দখল চায়। চারদিকে নজরদারি। পুরনো সংবাদ ও নথি বদলে দেওয়া হয়, যাতে শাসকের আজকের বক্তব্যের সঙ্গে অতীতও মিলে যায়। সত্য মন্ত্রক নামের দপ্তর আসলে শাসকের প্রয়োজনমতো সত্যের চেহারা তৈরি করে। শব্দগুলি সুন্দর থাকে, তাদের ভিতরের অর্থ বদলে যায়।

‘ডিস্টোপিয়া’ হল এমন এক কল্পিত সমাজ, যেখানে ভয়, দমন এবং অবিচার মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে গ্রাস করেছে। অরওয়েলের বিশেষত্ব, তিনি দেখিয়েছিলেন এই দমন শুধু বন্দুক দিয়ে চলে না। চলে ভাষা বদলে, তথ্য নিয়ন্ত্রণ করে, মানুষকে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়েও সন্দেহ করতে শিখিয়ে। আজ যা দেখা গেল, কাল সরকারি ঘোষণা বলতে পারে তা ঘটেইনি। তখন প্রতিবাদকারীকে শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়লে হয় না; যে অন্যায়টি হয়েছে, সেটিও নতুন করে প্রমাণ করতে হয়। আকৃতির মামলায় তুলনাটি তাই নিছক সাহিত্যিক সাজসজ্জা নয়।

এবার আসা যাক তাঁর বিরুদ্ধে হিংসায় উসকানির অভিযোগে। সরকারের জমা দেওয়া একটি বার্তায় শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের কথিত অন্যায় আচরণ ঠেকাতে মানুষকে জড়ো হওয়ার আহ্বান ছিল। হাইকোর্টের বক্তব্য, এই কথা পুরোটাই সত্য ধরে নিলেও তার মধ্যে হিংসায় উসকানি পাওয়া যাচ্ছে না। আদালত বারবার জানতে চেয়েছিল, কোন বার্তা বা ভিডিয়োয় দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ কিংবা সম্পত্তি ধ্বংসের আহ্বান আছে। সরকারপক্ষ তেমন কোনও নির্দিষ্ট বার্তা বা দৃশ্য দেখাতে পারেনি।

আদালতের সামনে থাকা ভিডিয়োয় নারীপুরুষের জমায়েত এবং একজনের বক্তব্য দেওয়ার দৃশ্য ছিল। ওই দৃশ্যে লাঠি, পাথর বা হিংসায় ব্যবহার করা যায় এমন অস্ত্র নিয়ে উত্তেজিত জনতা দেখা যায়নি। হাইকোর্টের কাছে সেটি শ্রমিকদের দাবি নিয়ে সমবেত হওয়ার ছবি বলেই মনে হয়েছিল। এর অর্থ এই নয় যে আন্দোলনের কোথাও কোনও হিংসা হয়নি। অর্থ হল, ওই নির্দিষ্ট দৃশ্য আকৃতির বিরুদ্ধে হিংসার অভিযোগ প্রমাণ করছিল না। এই পার্থক্য মুছে দিলে মিছিলে উপস্থিত থাকা আর আগুন লাগানো একই অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়।

কেউ হেফাজতে থাকলেই আগের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়ে যান না। কিন্তু ষড়যন্ত্র হয়েছিল বললে তার ভিত্তি দেখাতে হয়। কার সঙ্গে কী পরিকল্পনা, কোন বক্তব্যে হিংসার নির্দেশ, কীভাবে সেই পরিকল্পনার সঙ্গে পরের ঘটনার যোগ—এসব প্রশ্ন এড়িয়ে শুধু অভিযোগের পুনরাবৃত্তি যথেষ্ট নয়। হাইকোর্টের আপত্তি ছিল এই জায়গায়। প্রশাসন নিজের সন্দেহকে এমন গুরুত্ব দিচ্ছিল, যেন সন্দেহের জোরই প্রমাণের অভাব পূরণ করতে পারে। একটি গুরুতর অভিযোগ আরও জোরে বললে সেটি আরও সত্য হয়ে যায় না।

এখানে অরওয়েলের সঙ্গে দ্বিতীয় মিলটি দেখা যায়। মানুষের কথা তার স্বাভাবিক অর্থ হারিয়ে সরকারি সন্দেহের অর্থ পায়। শ্রমিকের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান হয়ে ওঠে বিপদের ইঙ্গিত। মানুষের জমায়েত হয়ে ওঠে ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনা। এইভাবে ভাষা বদলালে প্রশাসনকে আর শ্রমিকের দাবির উত্তর দিতে হয় না। আলোচনা চলে যায় মজুরি থেকে নিরাপত্তায়, কাজের সময় থেকে পুলিশের ক্ষমতায়। যাঁরা দাবি তুলেছেন, তাঁদের সমস্যার সমাধান করার বদলে তাঁদের সামলানোই প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়। প্রশ্নকারীকেই সমস্যা বানানোর এই কৌশল গণতন্ত্রের পক্ষে ভয়াবহ।

সরকারের বক্তব্যে আকৃতির রাজনৈতিক পরিচয়ও এসেছিল। তাঁকে রেভলিউশনারি ওয়ার্কার্স পার্টি অব ইন্ডিয়ার সদস্য বলা হয়। সংগঠনটি নাগরিকত্ব আইন ও নাগরিকপঞ্জিবিরোধী আন্দোলন এবং গাজা নিয়ে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিল, তাও উল্লেখ করা হয়। এই তথ্য দিয়ে তাঁর নির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণ হয় না। কোনও সংগঠন একাধিক বিষয়ে সরকারের বিরোধিতা করেছে বলেই তার সদস্যের প্রতিটি কাজ সন্দেহজনক হতে পারে না। রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে অপরাধের ফাঁক পূরণ করতে গেলে নাগরিককে তাঁর কাজের জন্য নয়, তাঁর চিন্তার জন্য বিচার করার পথ খুলে যায়।

১৩ মে আকৃতির বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করা হয়। এই আইনের কাজ সাধারণ অপরাধের বিচার শেষে সাজা দেওয়া নয়। নির্দিষ্ট বিপদ ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কার ভিত্তিতে আগাম আটক রাখার ব্যবস্থা এতে রয়েছে। দেশের নিরাপত্তার পাশাপাশি জনশৃঙ্খলা এবং অত্যাবশ্যক পরিষেবা রক্ষার কারণেও এটি ব্যবহার করা যায়। নির্ধারিত শর্ত ও অনুমোদনসাপেক্ষে আটক বারো মাস পর্যন্ত চলতে পারে। তাই এটি প্রয়োগের আগে অত্যন্ত সতর্ক পরীক্ষা দরকার। ভবিষ্যতের আশঙ্কা দেখিয়ে বর্তমানের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা সামান্য ক্ষমতা নয়।

নিরাপত্তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, এ নিয়ে বিরোধের অবকাশ নেই। কিন্তু কাকে বিপজ্জনক বলা হচ্ছে এবং কেন, তার উত্তরও রাষ্ট্রকে দিতে হবে। অপরাধের নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রতিবাদ অপছন্দ বলে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে ফারাক। কঠোর আইন সেই ফারাক মুছে দেওয়ার অনুমতি নয়। বরং যে আইনে মানুষের স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি সীমিত হয়, তার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি যাচাই হওয়া দরকার। নিরাপত্তার নাম উচ্চারণ করলেই প্রশ্ন বন্ধ হয়ে গেলে সেই শব্দটি নাগরিককে রক্ষার বদলে ক্ষমতাকে আড়াল করার কাজে লাগে।

আকৃতির বিরুদ্ধে সাধারণ ফৌজদারি মামলা তখন চলছিল। তার উপরে বিশেষ আইনে আটকের প্রয়োজন কেন, সেই প্রশ্ন স্বাভাবিক। হাইকোর্ট বলেছিল, কোনও অভিযুক্ত সাধারণ মামলায় জামিন পেতে পারেন বলে তাঁকে অন্য ব্যবস্থায় আটকে রাখার জন্য জাতীয় নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করা যায় না। আটকাদেশের কারণগুলি আদালতের কাছে বারবার একই কথা বলা, অনুমান এবং যথেষ্ট উপাদান ছাড়া গড়ে তোলা মতামত বলে মনে হয়েছিল। ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষাকারী সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘিত হয়েছে বলে আদালত এই আটক বাতিল করে।

এখানে দুঃস্বপ্নের তৃতীয় দিকটি স্পষ্ট হয়। নাগরিকের সামনে মুক্তির একটি আইনি পথ আছে, কিন্তু প্রশাসন আরেকটি দরজা বন্ধ করে রাখছে। সাধারণ মামলায় জামিনের শর্ত পূরণ করলেও বিশেষ আটক থাকলে তিনি বেরোতে পারবেন না। বিশেষ আইনের বৈধ ব্যবহার অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু তার নিজস্ব যথেষ্ট কারণ থাকতে হবে। নইলে বিচারকের পরীক্ষায় টিকবে কি না, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে আটক চালিয়ে যাওয়ার সুবিধা তৈরি হয়। আইন তখন ক্ষমতার সীমা টানার বদলে সেই সীমা পাশ কাটানোর উপায় হয়ে ওঠে।

২ সেপ্টেম্বর বিচারপতি অতুল শ্রীধরন ও বিচারপতি অচল সচদেবের বেঞ্চ আকৃতির বিশেষ আটক বাতিল করে। হাইকোর্টের সতর্কবার্তা ছিল, আমলা ও পুলিশের স্বেচ্ছাচার চলতে থাকলে উত্তরপ্রদেশ অরওয়েলের দুঃস্বপ্নের মতো হয়ে উঠতে পারে। গোটা রাজ্য ইতিমধ্যেই সেই অবস্থায় পৌঁছে গেছে, এমন ঘোষণা আদালত করেনি। আদালত একটি বিপজ্জনক পথের দিকে আঙুল তুলেছিল। সেই পথের ধাপগুলি এই মামলায় দেখা যাচ্ছিল: নথির অসংগতি, অভিযোগের দুর্বল ভিত্তি এবং তার উপর দাঁড়িয়ে কঠোর আটকক্ষমতার প্রয়োগ।

জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মেধা রূপমের ভূমিকা নিয়েও হাইকোর্ট কঠোর মন্তব্য করে। পুলিশের অভিযোগ পরীক্ষা করে দেখা এবং সাধারণ আইন কেন যথেষ্ট নয়, তা বিচার করার দায়িত্ব তাঁর ছিল। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, পূর্ব অপরাধের ইতিহাসহীন এই ছাত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে অন্যদের ভয় দেখানোর উদাহরণ তৈরি করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই মন্তব্যগুলি এখন সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশের আওতায়। তবু এর মধ্যে যে সাধারণ প্রশ্নটি রয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ: উচ্চপদস্থ আধিকারিক স্বাধীনভাবে যাচাই করবেন, না পুলিশের সুপারিশে শুধু অনুমোদনের সই দেবেন?

একজনকে ভয় দেখানোর ফল অনেকের উপর পড়ে। শ্রমিকের সহকর্মী, আকৃতির সহপাঠী বা পরিচিত কেউ ভাবতে পারেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যদি মাসের পর মাস জেলে থাকতে হয়, তবে চুপ থাকাই ভালো। এই ভয় ছড়াতে সবাইকে গ্রেফতার করতে হয় না। কয়েকটি ঘটনা থেকেই সমাজ নিজের মুখ বন্ধ করতে শেখে। অরওয়েলের জগতের সঙ্গে এখানেও মিল আছে: রাষ্ট্রের নির্দেশ পৌঁছনোর আগেই মানুষ নিজের কথা আটকে দেয়। বাইরে থেকে শান্ত দেখালেও সেই সমাজের ভিতরে নিরাপত্তাবোধ থাকে না, থাকে শাস্তি এড়ানোর চেষ্টা।

আকৃতি পঞ্চাশ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়েছিলেন। হাইকোর্ট পাঁচ লক্ষ টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং দায়ী অন্য আধিকারিকদের বেতন থেকে টাকা আদায়ের কথা বলা হয়; প্রাথমিক প্রতিবেদন তৈরি করা থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকও তার আওতায় পড়তে পারেন। চাকরির নথিতে আদালতের অসন্তোষ লেখার নির্দেশও ছিল। এর বক্তব্য সহজ: নাগরিকের অধিকার নষ্ট করার দায় শুধু সরকারি কোষাগারের হবে কেন? যাঁর ভুল সিদ্ধান্ত, তাঁর নিজের কোনও দায় থাকবে না কেন? এই নির্দেশগুলিও আপাতত স্থগিত।

মেধা রূপম সুপ্রিম কোর্টে আপত্তি জানান, তাঁকে বক্তব্য রাখার সুযোগ না দিয়েই ব্যক্তিগতভাবে বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। রাজ্যের যুক্তি ছিল, আটকাদেশ একাধিক অনুমোদনের ধাপ পেরিয়েছে; জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একাই সিদ্ধান্তের গোটা ব্যবস্থাটি নন। এই আপত্তিগুলি শোনার অধিকার তাঁদের আছে। নাগরিককে ন্যায্য সুযোগ দেওয়ার দাবি করলে আধিকারিকের ক্ষেত্রেও সেই নীতি মানতে হবে। তবে কারও ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে মূল আটক কেন প্রয়োজন হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় শেষ হয়ে যায় না।

২৩ সেপ্টেম্বর বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মা ও বিচারপতি এন কোটিশ্বর সিংহের বেঞ্চের প্রাথমিক নির্দেশে স্থগিতাদেশের পরিসর নিয়ে বিভ্রান্তি হয়েছিল। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সংশোধিত নির্দেশে স্পষ্ট হয়, স্থগিত হাইকোর্টের ২৭ থেকে ৩৩ অনুচ্ছেদ, যার মধ্যে কঠোর মন্তব্য ও ক্ষতিপূরণ রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আটক বাতিলের সিদ্ধান্তে স্থগিতাদেশ নেই। পরবর্তী শুনানি ধার্য ৭ অক্টোবর। এই পার্থক্য জরুরি: আধিকারিকেরা অন্তর্বর্তী স্বস্তি পেয়েছেন; আকৃতির বিশেষ আটক বৈধ বলে সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।

কিন্তু মামলাটি ওই বেঞ্চে গেল কীভাবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সুপ্রিম কোর্টের ১৩ জুলাই থেকে কার্যকর বিষয়ভিত্তিক তালিকায় বন্দিপ্রত্যক্ষীকরণ ও প্রতিরোধমূলক আটকের মামলা প্রথম চারটি নির্দিষ্ট বেঞ্চের দায়িত্বে। বিচারপতি শর্মার নিয়মিত বিষয়তালিকায় সেটি নেই। আবার আকৃতির আগের আবেদন এবং একই শ্রমিক আন্দোলনের অন্য মামলা বিচারপতি বি ভি নাগরত্নার বেঞ্চে উঠেছিল। লাইভলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নতুন আবেদন দুটির বিষয়সংখ্যাও প্রতিরোধমূলক আটকসংক্রান্ত। ফলে প্রকাশিত বণ্টনব্যবস্থা থেকে এই সরে আসার কারণ জানতে চাওয়া যুক্তিসংগত।

বিশেষভাবে অন্য মামলা শোনার সুযোগ শর্মার তালিকায় রয়েছে। প্রধান বিচারপতি সেইভাবে মামলা দিতে পারেন। তাই এই বণ্টন নিজেই বেআইনি, এমন সিদ্ধান্ত টানা যাবে না। কিন্তু বিশেষভাবে দেওয়া হয়ে থাকলে কেন দেওয়া হল, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রকাশিত সূত্রে মেলেনি। একই শুনানিতে অনলাইন সংযোগের শব্দ বন্ধ হয়ে সাংবাদিকদের একাংশের শুনানি অনুসরণ বন্ধ হওয়ার কথাও লাইভল জানিয়েছে। কোনও একটি ঘটনা দিয়ে পক্ষপাত প্রমাণ হয় না। তবে ব্যাখ্যার অভাব এবং শুনানিতে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা একসঙ্গে স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়।

২৫ সেপ্টেম্বর লাইভল আরও জানায়, বিচারপতি শর্মার পুত্র মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে নির্বাচন কমিশনের নিযুক্ত আইনজীবী। মেধা রূপম প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কন্যা। পুত্রের পেশাগত সম্পর্ক মামলার পক্ষগুলিকে জানানো হয়েছিল কি না, প্রতিবেদনটি তা স্পষ্ট নয় বলেছে। এই সম্পর্ক থেকেই বিচারপতি প্রভাবিত হয়েছেন, এমন প্রমাণ নেই। তবে নিরপেক্ষতা সম্পর্কে সংশয় উঠলে তা দূর করার প্রয়োজন আছে। বিচারকের ব্যক্তিগত সততার প্রশ্ন এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে সাধারণ মানুষের চোখে নিরপেক্ষ রাখার দায়িত্ব সম্পর্কিত হলেও এক বিষয় নয়।

‘লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ফর কনস্টিটিউশন’ সংশ্লিষ্ট নির্দেশ প্রত্যাহার করে বিচারপতি শর্মা নেই, এমন বেঞ্চে নতুন শুনানির দাবি জানিয়েছে। তারা মামলা বণ্টনের ব্যাখ্যাও চেয়েছে। এটি সংগঠনের দাবি, আদালতের সিদ্ধান্ত নয়। এই ঘটনাগুলিকে প্রমাণিত যোগসাজশ বলে চালানো অন্যায় হবে। কিন্তু প্রশ্ন তোলাই অন্যায়, এমন মনোভাবও গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের কাজ পরীক্ষা করে যে প্রতিষ্ঠান, তার নিজের পদ্ধতিও যথাসম্ভব পরিষ্কার থাকা দরকার। বিচারব্যবস্থার উপর আস্থা রাখার অর্থ অন্ধভাবে বিশ্বাস করা নয়; আস্থার যুক্তিসংগত ভিত্তি থাকতে হয়।

এই জায়গায় অরওয়েলের তুলনাটি সাবধানে ব্যবহার করা প্রয়োজন। হাইকোর্টের নথি পরীক্ষা, আটক বাতিল এবং সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান দেখায়, প্রশ্ন করার জায়গা এখনও কার্যকর। সব প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে দমনযন্ত্র বলে দিলে সেই বাস্তবটি হারিয়ে যায়। কিন্তু প্রতিকারের প্রতিষ্ঠান নিয়ে অস্বচ্ছতা তৈরি হলে নাগরিকের উদ্বেগ গভীর হয়। যাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসন সন্দেহ তুলেছে, তিনি কোথায় গিয়ে নির্ভর করবেন? তাই বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা স্বাধীনতার আলোচনার বাইরের বিষয় নয়। সেটি স্বাধীনতা রক্ষার ব্যবস্থারই একটি অপরিহার্য অংশ।

আকৃতির বিশেষ আটক বাতিল হলেও সমস্ত মামলা শেষ হয়নি। অন্য ফৌজদারি মামলায় জামিনের প্রয়োজন রয়ে গিয়েছে। ২৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নয়ডার সেক্টর ৬৩ থানার একটি মামলায় তাঁর জামিনের আবেদনে হাইকোর্ট রাজ্যের জবাব চেয়েছে; পরের শুনানি ২৭ অক্টোবর। ফলে তাঁকে সব অভিযোগ থেকে মুক্ত বলা যাবে না। আবার অন্য মামলা আছে বলেই বিশেষ আইনে অযৌক্তিক আটক গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যবস্থাকে আলাদাভাবে আইনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। একটির বৈধতা অন্যটির অন্যায় ঢাকে না।

এই ঘটনার গোড়ায় ফিরে গেলে দেখা যায়, প্রশ্ন ছিল শ্রমিকের বেতন এবং কাজের সময় নিয়ে। কিন্তু আলোচনার বড় অংশ চলে গেল গ্রেফতার, ষড়যন্ত্র, বিশেষ আটক ও আদালতের নির্দেশে। এই বদলটাই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকের দাবি নিয়ে কথা বলার জায়গা ছোট হয়ে গেলে তাঁর জীবন বদলায় না, শুধু তাঁর অসন্তোষ কম শোনা যায়। প্রশাসন যদি সেই নীরবতাকেই সাফল্য ভাবে, তবে সমস্যার সমাধানের বদলে সমস্যার খবর চাপা দেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়। অরওয়েলের সমাজে সরকারি সাফল্য এবং মানুষের বাস্তব জীবন এমনভাবেই আলাদা হয়ে যায়।

হাইকোর্ট প্রতিবাদের প্রয়োজন বোঝাতে প্রেশার কুকারের চাপ বেরোনোর ব্যবস্থার তুলনা দিয়েছিল। জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ না দিলে বড় বিস্ফোরণের আশঙ্কা বাড়ে। এই কথার অর্থ, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে জায়গা দেওয়া শাসনের দুর্বলতা নয়। মানুষ কথা বলবে, দাবি জানাবে, সরকার তার উত্তর দেবে—এই আদানপ্রদানই বিপদ কমাতে পারে। সব জমায়েতকে সম্ভাব্য গোলমাল ভাবলে পুলিশ দিয়ে রাস্তা খালি করা সম্ভব, কিন্তু মানুষের ক্ষোভ খালি করা সম্ভব নয়। বাইরে নীরবতা এবং ভিতরে শান্তি এক জিনিস নয়।

আকৃতির মামলা তাই একটি বড় সতর্কবার্তা। মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার পরে নথিতে তার ব্যাখ্যা লেখা, প্রতিবাদের ভাষাকে বিপদের ভাষায় বদলে দেওয়া এবং বিশেষ ক্ষমতায় আটক চালানোর প্রবণতা একসঙ্গে দেখলে অরওয়েল অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন। তাঁর দুঃস্বপ্ন শুধু কারাগারে নয়; অন্যায়কে স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় বলে মেনে নেওয়ার অভ্যাসেও। সেই অভ্যাস ঠেকাতে চাই সত্য যাচাই, ক্ষমতার হিসাব এবং স্বাধীন বিচার। নাগরিকের নিরাপত্তার পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত একটাই: রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুক্তিসংগত প্রশ্ন তুলেও তিনি নিজের স্বাধীনতা নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন কি না।