বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

রাতেও রোদ: মহাকাশে আয়না বসিয়ে সূর্যালোক বিক্রির পরিকল্পনা

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: স্বাভাবিক নিয়মে দিনের পরে রাত আসে।
  • কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার স্টার্টআপ সংস্থা রিফ্লেক্ট অরবিটালের ইচ্ছেপূরণ হলে সেই নিয়ম মানা আর বাধ্যতামূলক না-ও থাকতে পারে।
  • ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি ২ কোটি ৮০ লক্ষ ডলারের বেশি বিনিয়োগ পেয়েছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: স্বাভাবিক নিয়মে দিনের পরে রাত আসে। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার স্টার্টআপ সংস্থা রিফ্লেক্ট অরবিটালের ইচ্ছেপূরণ হলে সেই নিয়ম মানা আর বাধ্যতামূলক না-ও থাকতে পারে। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি ২ কোটি ৮০ লক্ষ ডলারের বেশি বিনিয়োগ পেয়েছে। তাদের আশা, মহাকাশে কয়েক দশ হাজার অত্যন্ত প্রতিফলনক্ষম আয়না পাঠিয়ে চাহিদামতো পৃথিবীর অন্ধকার অংশে আলো ফেলা যাবে। উদ্দেশ্য, সূর্যাস্তের পরেও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা, দুর্যোগে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে সাহায্য করা এবং হয়তো শহরের পথবাতির প্রয়োজনও মিটিয়ে দেওয়া।

পরিষেবা হিসেবে সূর্যালোক জোগানোর ধারণা অবশ্য নতুন নয়। রকেটবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ হারমান ওবার্থ ১৯২৩ সালে প্রথম এই প্রস্তাব দেন। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় নাসা বিষয়টি আরও বিশদে খতিয়ে দেখে। রাশিয়া তো বাস্তবে পরীক্ষাও করে ফেলেছিল। ১৯৯৩ সালে ‘জনামিয়া-২’ নামে একটি উপগ্রহ ২০ মিটার ব্যাসের একটি আয়না মেলে ধরেছিল। সেটি পৃথিবীপৃষ্ঠে ৫ কিলোমিটার চওড়া একটি এলাকায় অতি ক্ষীণ আলো ফেলেছিল। কয়েক ঘণ্টা পরে উপগ্রহটি বায়ুমণ্ডলে পুড়ে যায়।

রিফ্লেক্ট অরবিটাল এ বছরের শেষের দিকে তাদের প্রথম পরীক্ষামূলক উপগ্রহ ‘এয়ারেনডিল-১’ উৎক্ষেপণ করতে চায়। আমেরিকার প্রযুক্তিমহলে এখন কার্যত রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেই উপগ্রহটির নাম নেওয়া হয়েছে জে. আর. আর. টলকিনের বই থেকে। উপগ্রহটি ৬২৫ কিলোমিটার উচ্চতার কক্ষপথে পৌঁছলে তার দেহ থেকে চারটি দীর্ঘ দণ্ড প্রসারিত হওয়ার কথা। সেগুলির মাঝখানে টানটান করে মেলে দেওয়া হবে অত্যন্ত প্রতিফলনক্ষম অ্যালুমিনিয়ামের প্রলেপ দেওয়া অতি পাতলা প্লাস্টিকের চাদর। তাতে তৈরি হবে ১৬০ বর্গমিটার আয়তনের একটি আয়না—মোটামুটি একটি ভলিবল কোর্টের সমান। সব কিছু পরিকল্পনামতো চললে উপগ্রহটি পৃথিবীপৃষ্ঠে প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার চওড়া একটি এলাকায় আলো ফেলবে।

সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, উপযুক্ত কক্ষপথে ৭৬টি উপগ্রহ থাকলেই চাহিদামতো পৃথিবীর যে-কোনও জায়গায় সূর্যালোক পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। আলোকিত এলাকাগুলিতে সেই আলোর উজ্জ্বলতা হবে মোটামুটি পূর্ণিমার চাঁদের আলোর সমান। দীর্ঘমেয়াদে সংস্থার পরিকল্পনা, এর চেয়ে অনেক বড় আকারের কয়েক দশ হাজার উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানো। অনেকগুলি উপগ্রহের আলোকরশ্মি একই জায়গায় ফেলে আলোর তীব্রতা বহুগুণ বাড়ানো যাবে। সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বেন নাওয়াকের বক্তব্য, স্পেসএক্সের একটি ফ্যালকন ৯ রকেটেই এমন প্রায় ১২০টি উপগ্রহ ধরে যাবে।

মূল ব্যবসায়িক পরিকল্পনাটি কার্যকর করতে রিফ্লেক্টের বিপুল সংখ্যক উপগ্রহ প্রয়োজন। সংস্থাটি সেগুলিকে বিশেষভাবে পরিকল্পিত মেরু কক্ষপথে স্থাপন করতে চায়, যাতে প্রতিদিন একই স্থানীয় সময়ে সেগুলি পৃথিবীর নির্দিষ্ট কোনও অঞ্চলের উপর দিয়ে যায়। সন্ধ্যা ও ভোরের দিকে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির প্যানেলে বাড়তি সূর্যালোক ফেলে উৎপাদন বাড়ানোই তাদের লক্ষ্য। সাধারণত এই সময়েই বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে, বিদ্যুতের দামও হয় সর্বোচ্চ, অথচ সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন থাকে কম। পৃথিবী নীচে ঘুরতে থাকলে বলয়ের মতো সাজানো একদল উপগ্রহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের একাধিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রকে পরিষেবা দিতে পারবে।

সংশয়বাদীরা মনে করিয়ে দেবেন, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপন্ন বিদ্যুৎ অন্য সময়ে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার প্রযুক্তি তো ইতিমধ্যেই রয়েছে—ব্যাটারি। আর তার খরচও দ্রুত কমছে। কিন্তু নাওয়াকের যুক্তি, তাঁর উপগ্রহ ব্যাটারির জায়গা নেবে না; বরং ব্যাটারির পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। তাঁর বক্তব্য, বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যত বেশি সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হয়—যার উৎপাদন একটানা চলে না—ততই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত ব্যাটারির ব্যবস্থা করার খরচ দ্রুত বাড়ে। তাঁর আশা, সৌরপ্যানেলগুলি দিনের আরও বেশি সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলে এমন ব্যাটারির প্রয়োজন কমবে, যেগুলি খুব কম ব্যবহার হয় বলে ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, অথচ সৌরবিদ্যুতের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রয়োজন পড়ে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনই অবশ্য রিফ্লেক্টের একমাত্র পরিকল্পনা নয়। জরুরি উদ্ধারকাজে সাহায্য করতে দিনের আলোর সময়সীমা বাড়ানোরও ইচ্ছে রয়েছে সংস্থাটির। কিংবা খামার, খোলামুখ খনি ও স্কি রিসর্টে রাতের আরও কিছুটা সময় কাজ—বা খেলাধুলা—চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া যেতে পারে। নাওয়াকের মতে, শহরগুলিও আকর্ষণীয় ক্রেতা হয়ে উঠতে পারে। কারণ, প্রতিফলিত সূর্যালোকের খরচ লক্ষ লক্ষ বাসিন্দার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া গেলে তা এতটাই সস্তা হতে পারে যে পথবাতির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

পরিকল্পনা বিরাট। কিন্তু এর কোনওটি কি সত্যিই বাস্তবায়িত হতে পারে? গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ার কলিন ম্যাকিনেস প্রতিফলিত সৌরশক্তি নিয়ে কাজ করেন। তাঁর মতে, রিফ্লেক্ট এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে তিনটি প্রবণতা এসে মিলেছে: ‘সৌরবিদ্যুতের বাড়তে থাকা চাহিদা, রকেট উৎক্ষেপণের কমতে থাকা খরচ এবং (স্পেসএক্সের উপগ্রহভিত্তিক ব্রডব্যান্ড পরিষেবা স্টারলিঙ্কের সাফল্যের পরে) মহাকাশে বড় কাঠামো তৈরির ক্রমবর্ধমান আগ্রহ।’ প্রতিফলক উপগ্রহের একটি সমষ্টি কীভাবে কাজ করতে পারে, তা নিয়ে ম্যাকিনেস ও তাঁর সহকর্মীরা একাধিক গবেষণা করেছেন। ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণার সিদ্ধান্ত ছিল, মহাকাশে একঝাঁক আয়না স্থাপনের প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতেই পারে—যদি উৎক্ষেপণের খরচ বর্তমান খরচের এক-তৃতীয়াংশে বা তারও নীচে নেমে আসে। স্পেসএক্সের বিশাল স্টারশিপ রকেট ধীরে ধীরে ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠার দিকে এগোচ্ছে। ফলে এমনটা ঘটতেই পারে।

রিফ্লেক্টের হিসাব সত্যিই মিলে গেলেও অবশ্য সবাই খুশি হবেন না। স্টারলিঙ্ক ইতিমধ্যেই জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কারণ, তার উপগ্রহগুলি থেকে প্রতিফলিত আলো টেলিস্কোপে তোলা ছবিতে বিঘ্ন ঘটায়। বিশেষভাবে আলো প্রতিফলিত করার জন্য তৈরি উপগ্রহের ক্ষেত্রে সেই সমস্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। স্লোভাক অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের আলোকদূষণ বিশেষজ্ঞ মিরোস্লাভ কোচিফাই ও তাঁর সহকর্মীদের ৬ অগস্ট প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রের প্রাক্‌প্রকাশ সংস্করণে হিসাব করা হয়েছে, রিফ্লেক্টের বড় উপগ্রহগুলির যে-কোনও একটির আলোকরশ্মির মধ্যে দাঁড়িয়ে আকাশের কোনও তারাই দেখা সম্ভব হবে না। এমন ৪০০টি উপগ্রহের রশ্মি একসঙ্গে মেলালে সেই আলোর আভা ৮০ কিলোমিটার দূর থেকেও দেখা যেতে পারে। কোচিফাইয়ের হিসাবে, সৌরপ্যানেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করাতে অন্তত প্রায় এতগুলি উপগ্রহের আলো একত্র করা প্রয়োজন।

নাওয়াক অবশ্য সমঝোতার সুরে কথা বলছেন। তাঁর দাবি, উপগ্রহগুলি কোন দিকে মুখ করে রয়েছে, তা বদলে দিলেই সহজে আলো ফেলা বন্ধ করা যাবে। তিনি আরও জানিয়েছেন, বড় টেলিস্কোপগুলির চারপাশে এমন কিছু সংরক্ষিত এলাকা নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে রিফ্লেক্টের, যেখানে আলো ফেলা নিষিদ্ধ থাকবে। তাঁর কথায়, ‘এই বিষয়টি ঠিকভাবে সামলাতে না পারলে, নিয়ন্ত্রণবিধির চাপে আমাদের অস্তিত্বই মুছে যেতে পারে।’

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles