৪৮ ঘণ্টায় সুর বদল কমিশনের, বাংলার আপিল ও ফর্ম ৬ নিয়ে নীরবতা

যা জানা জরুরি
- মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় অবস্থানে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল নির্বাচন কমিশন।
- নিজেদের দুই সদস্যের লিখিত আপত্তিকে প্রথমে স্বাভাবিক আলোচনার অংশ বলে ব্যাখ্যা করলেও শনিবারের বৈঠকে সেই উদ্বেগগুলির অনেকটাই মেনে পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে কমিশন।
- কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিচারিক নির্দেশে ভোটার তালিকায় নাম ওঠার বিরুদ্ধে আপিল, নতুন ভোটারদের আবেদনপত্রে পরিবর্তন এবং ভোটার তথ্যভান্ডারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি এখনও অনুত্তরিত।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় অবস্থানে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল নির্বাচন কমিশন। নিজেদের দুই সদস্যের লিখিত আপত্তিকে প্রথমে স্বাভাবিক আলোচনার অংশ বলে ব্যাখ্যা করলেও শনিবারের বৈঠকে সেই উদ্বেগগুলির অনেকটাই মেনে পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে কমিশন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিচারিক নির্দেশে ভোটার তালিকায় নাম ওঠার বিরুদ্ধে আপিল, নতুন ভোটারদের আবেদনপত্রে পরিবর্তন এবং ভোটার তথ্যভান্ডারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি এখনও অনুত্তরিত।
নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী দশ মাসে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, কমিশনের নামে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যা তাঁদের জানানো হয়নি। বিষয়গুলি নিছক দপ্তরের কাজকর্মে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভোটার তালিকায় নাম তোলা, বাদ দেওয়া, পুনর্বহাল এবং সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের মতো মৌলিক দায়িত্বও এর মধ্যে ছিল।
কমিশনের প্রাথমিক ব্যাখ্যা ছিল, ওই নথিগুলি পরামর্শ ও মতামত; গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে। অথচ ২৬ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পরে ঘোষিত ব্যবস্থাগুলির সঙ্গে দুই কমিশনারের আপত্তির স্পষ্ট মিল রয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, বৈঠকের আগে আলোচ্যসূচি পাঠানো হবে, পরে কার্যবিবরণী জারি হবে। আধিকারিকদের বিদেশযাত্রায় কমিশনের অনুমোদন লাগবে। কমিশনারদের নির্দেশও যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
ভোটার তালিকার বৈদ্যুতিন ব্যবস্থা ইসিআইনেট পর্যালোচনার জন্য কমিটি গড়ার কথাও জানিয়েছে কমিশন। পাশাপাশি চলতি বিশেষ নিবিড় সংশোধনে পুরনো তালিকার সঙ্গে পরিচয় মেলেনি অথবা তথ্যে অসংগতি রয়েছে বলে নোটিস পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়িতে যাবেন বুথস্তরের কর্মীরা। তাঁরা নথি সংগ্রহ করবেন। সাধারণভাবে ওই ভোটারদের দপ্তরে হাজির হতে হবে না; ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে শুনানি হবে। প্রয়োজন হলে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকেও প্রতিনিধিত্বের অনুমতি দেওয়া যাবে।
তবে বাংলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি রয়ে গিয়েছে। বিচারিক আধিকারিকেরা যাঁদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁদের নাম বাদ দেওয়ার আর্জি জানিয়ে আপিল করা হয়েছিল। অনুসন্ধান অনুযায়ী, আগস্টে সান্ধু জানতে চান, কমিশনের পক্ষে এই আপিল করার অনুমতি কে দিয়েছেন এবং বাস্তবে কে আবেদন করেছেন। তিনি নথিতে জানান, তাঁকে, জোশীকে এবং বাংলার তৎকালীন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে আবেদন করার ভিত্তি বা প্রক্রিয়া জানানো হয়নি।
সেই প্রশ্নের উত্তর নতুন বিবৃতিতেও নেই। ফলে আপিলগুলি কমিশনের অনুমোদিত সিদ্ধান্ত ছিল কি না, থাকলে অনুমোদন দিয়েছিলেন কে—এই সংশয় কাটেনি। বাংলার ভোটারদের কাছে এর তাৎপর্য বিশেষ: বিচারিক পরীক্ষায় নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরেও সেই অন্তর্ভুক্তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। নতুন প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতি এই নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের দায় নির্ধারণ করছে না।
এখানে আবেদনকারীর পরিচয় জানার পাশাপাশি সিদ্ধান্তের নথিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আপিলের ফল একজন নাগরিকের তালিকাভুক্ত থাকার অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই কোন কর্তৃপক্ষ, কোন যুক্তিতে এবং কোন অনুমোদনে সেই প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, তা জানানো স্বচ্ছতারই অংশ, নিছক দাপ্তরিক খুঁটিনাটি নয়।
ফর্ম ৬ নিয়েও জট কাটেনি। নতুন ভোটার হিসেবে নাম তোলার এই আবেদনপত্রের অনলাইন সংস্করণে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আবেদনকারী অথবা তাঁর বাবা-মা কিংবা ঠাকুরদা-ঠাকুমার নাম আগের বিশেষ নিবিড় সংশোধনের তালিকায় ছিল কি না। প্রশ্নটি বাধ্যতামূলক বলে চিহ্নিত না হলেও উত্তর না দিয়ে আবেদন জমা দেওয়ার পরবর্তী ধাপে যাওয়া যাচ্ছিল না।
দেখা নথি অনুযায়ী, মে মাসেই জোশী বলেছিলেন, বিধিতে নির্ধারিত আবেদনপত্র বদলাতে হলে সংশ্লিষ্ট বিধি সংশোধন করতে হবে। সান্ধুও সেই মত সমর্থন করেন। পরে আগস্টে সান্ধু পরিবর্তনটিকে অনুমোদনহীন ও বেআইনি আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে সরানোর নির্দেশ দেন। নতুন বিবৃতিতে সংশোধনপর্বের বাইরে বিধিনির্ধারিত ফর্ম ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অনলাইন আবেদনপত্রের অতিরিক্ত প্রশ্নটি সরানো হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ইসিআইনেটের বিতর্কও কেবল প্রযুক্তিগত ত্রুটির নয়। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মাঠপর্যায়ের আধিকারিকদের হাতে ভোটার তালিকা প্রস্তুতির দায়িত্ব থাকলেও ব্যবস্থা ব্যবহারের অনুমতি নিয়ন্ত্রণ করছিল দিল্লির তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ। ফলে যাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা, তিনি সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার সম্পূর্ণ সুযোগ পাচ্ছিলেন না। জোশী তাই স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন—আইনস্বীকৃত কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কেউ ভোটার তথ্যভান্ডার বদলাতে পারেন কি না।
তদারকির ব্যবস্থাও বিরোধের বিষয় হয়েছিল। জুলাইয়ে কাজের দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের একটি নির্দেশে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের উপর নজরদারির একটি স্তর সরিয়ে দেওয়া হয়। সান্ধু ও জোশী পৃথকভাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে চিঠি দেন এবং পরে ওই নির্দেশ বাতিল করেন। এখন পর্যালোচনা কমিটি গড়ার ঘোষণা হলেও ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত, নির্দেশ ও তদারকির সম্পর্ক কী হবে, সেই ব্যাখ্যা জরুরি।
এই সমস্যার বাস্তব নজির গোয়া। সেখানে স্থানীয় আধিকারিকেরা নথি পরীক্ষা ও শুনানির পরে ৯৭ জনকে যোগ্য ভোটার বলে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু আগে বাদ যাওয়া নাম ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় সুবিধা ব্যবস্থায় চালু ছিল না। সাত দিনে আটটি বার্তা পাঠিয়েও সমাধান হয়নি। যাচাইয়ে সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ পর্যন্ত তাঁদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত অনুকূলে হলেও প্রযুক্তিগত অনুমতির অভাবে ভোটার বাইরে থেকে গিয়েছেন।
কমিশন এখন জানিয়েছে, ওই ৯৭ জনের মধ্যে ৮১ জন ফর্ম ৬ পূরণ করেছেন। তাঁদের অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। কিন্তু আগে যোগ্য বলে স্বীকৃতি পাওয়ার পরেও কেন নাম ফেরানো যায়নি, সেই প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি। ঘটনাটি দেখায়, মাঠপর্যায়ের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পথ বন্ধ থাকলে শুধু নতুন আবেদন সংগ্রহ সমস্যার গোড়ায় পৌঁছয় না।
সব মিলিয়ে পরিবর্তনের সূচনা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তার স্থায়িত্ব যাচাই বাকি। তিন সদস্যের প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্তের আগে প্রত্যেকের অংশগ্রহণ, লিখিত আপত্তির নিষ্পত্তি এবং পুরনো সিদ্ধান্তের দায় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এখন দেখার, ঘোষিত নিয়মগুলি দৈনন্দিন কাজে কতটা মানা হয় এবং বাংলার ভোটারদের নিয়ে অনুত্তরিত প্রশ্নগুলির জবাব কমিশন কবে দেয়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



