ভিতরের আপত্তিতে বদল এসআইআরে, শুনানিতে ছাড়; বাংলার প্রশ্নে নীরব কমিশন

যা জানা জরুরি
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন ঘিরে নিজেদের দুই সদস্যের আপত্তি প্রকাশ্যে আসার পরে পদ্ধতিতে একগুচ্ছ পরিবর্তন আনল নির্বাচন কমিশন।
- শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশীর বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, পুরনো তালিকার সঙ্গে পরিচয়…
- বাড়িতে গিয়ে নথি সংগ্রহ করবেন বুথস্তরের কর্মীরা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন ঘিরে নিজেদের দুই সদস্যের আপত্তি প্রকাশ্যে আসার পরে পদ্ধতিতে একগুচ্ছ পরিবর্তন আনল নির্বাচন কমিশন। শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশীর বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, পুরনো তালিকার সঙ্গে পরিচয় মেলেনি বা তথ্যে অসংগতি ধরা পড়েছে বলে নোটিস পাওয়া ভোটারদের সাধারণভাবে শুনানির জন্য দপ্তরে যেতে হবে না। বাড়িতে গিয়ে নথি সংগ্রহ করবেন বুথস্তরের কর্মীরা।
পাশাপাশি ভোটার তালিকা পরিচালনার বৈদ্যুতিন ব্যবস্থা ইসিআইনেটের পর্যালোচনা হবে। কমিশনের বৈঠকের আলোচ্যসূচি আগে পাঠানো, কার্যবিবরণী প্রকাশ এবং কমিশনারদের নির্দেশ যথাযথভাবে পালনের কথাও জানানো হয়েছে। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পরে তিন সদস্যের এটিই প্রথম বৈঠক। বিবৃতিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সিদ্ধান্তগুলিতে পূর্ণাঙ্গ কমিশনের অনুমোদন রয়েছে। তবে ঘোষিত সংশোধনের পরেও বিতর্কের কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
বিতর্কের সূত্রপাত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে। সেখানে অভ্যন্তরীণ নথির ভিত্তিতে জানানো হয়, দশ মাসে অন্তত চোদ্দোবার আপত্তি জানিয়েছিলেন সান্ধু ও জোশী। নতুন ভোটারের নাম তোলা, নাম বাদ দেওয়া ও ফেরানো, ভোটার তালিকার তথ্যভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলায় নাম অন্তর্ভুক্তির নির্দেশের বিরুদ্ধে আপিল—আপত্তির পরিধি ছিল বিস্তৃত। তাঁদের অভিযোগ, বেশ কিছু নির্দেশ তাঁদের না জানিয়েই কমিশনের নামে জারি হয়েছিল। কমিশন অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সর্বসম্মতির কথাই বলে এসেছে।
কমিশনের পাল্টা ব্যাখ্যা, দেশজুড়ে বিশেষ সংশোধন চালানোর মূল নির্দেশ এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সময়সূচি সর্বসম্মতভাবেই গৃহীত হয়েছিল। মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে দুই কমিশনারের চিঠি সম্পর্কে তার দাবি, বিষয়টি নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়, প্রেষণে থাকা এক আধিকারিকের কাজকর্ম নিয়ে। দুই কমিশনারের নির্দেশের পরে সংশ্লিষ্ট কাজের পুনর্বণ্টন কার্যকর হয়নি এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের উপর উপনির্বাচন কমিশনারের তদারকিও প্রত্যাহার করা হয়নি। এই ব্যাখ্যাও পূর্ণাঙ্গ কমিশনের অনুমোদিত।
এখন সবচেয়ে প্রত্যক্ষ স্বস্তি পাবেন চলতি সংশোধনে নোটিস পাওয়া ভোটাররা। বুথস্তরের কর্মীরা তাঁদের বাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে ইসিআইনেটে জমা দেবেন। সেই নথি পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেবেন ভোটার নিবন্ধনের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক। ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে তাঁর বিবেচনায় শুনানি হতে পারে; অগ্রাধিকার দেওয়া হবে দূরবর্তী শুনানিকে। প্রয়োজন হলে ভোটার পরিবারের কোনও প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকে নিজের হয়ে অংশ নেওয়ার অনুমতিও দিতে পারবেন।
পুরনো সংশোধনের তালিকায় নিজের বা বাবা-মা, দাদু-ঠাকুমার নামের সঙ্গে সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা যায়নি, এমন ভোটারদের বলা হচ্ছে ‘আনম্যাপড’। অন্যদিকে, নামের অমিল বা বয়সের সম্পর্কের মতো তথ্যে যন্ত্রনির্ভর পরীক্ষায় অসংগতি ধরা পড়লেও নোটিস যাচ্ছে। নতুন সিদ্ধান্তে এই দুই ধরনের ক্ষেত্রে দপ্তরে হাজিরার প্রয়োজন কমবে। তবে নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া থাকছে; হাজিরা থেকে ছাড় পেলেই নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হয়ে যাচ্ছে, এমন নয়।
মহারাষ্ট্রের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের চিঠিতেও এই হয়রানির বিষয়টি উঠেছিল। জানা গেছে, ২৪ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে এস চোক্কালিঙ্গম প্রশ্ন তোলেন, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বিদেশে থাকা ভোটারদের হাজিরা থেকে ছাড়ের ব্যবস্থা থাকলেও প্রবীণ, প্রতিবন্ধী এবং অন্য দুর্বল অবস্থায় থাকা মানুষের জন্য অনুরূপ সুযোগ নেই কেন। সন্তোষজনক নথি পাওয়া গেলে ব্যক্তিগত হাজিরা মকুব এবং নির্ধারিত তালিকার বাইরেও উপযুক্ত নথি গ্রহণের সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি।
দরিদ্র, গৃহহীন, শ্রমিক এবং রাত্রিবাসের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তাকেন্দ্র ও বিশেষ শিবির করতেও বলা হয়েছে। দিল্লিতে দাবি ও আপত্তি জানানোর সময় বেড়ে হয়েছে ৩০ অক্টোবর; নিষ্পত্তির সময় ৩০ নভেম্বর। মহারাষ্ট্রে সংশ্লিষ্ট সময়সীমা যথাক্রমে ১২ অক্টোবর ও ১০ নভেম্বর। এই বাড়তি সময় নথি সংগ্রহ এবং ভুল সংশোধনের সুযোগ দেবে, যদিও তার সুফল নির্ভর করবে স্থানীয় ব্যবস্থাপনার উপর।
ইসিআইনেট নিয়ে সিদ্ধান্তটির তাৎপর্য আরও গভীর। কমিশন জানিয়েছে, একজন প্রবীণ উপনির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে আইআইটি অথবা আইআইআইটির একজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ থাকবেন। ব্যবস্থাটি সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি মেনে চলছে কি না, তাঁরা পরীক্ষা করবেন। মাঠপর্যায়ের আধিকারিকদের প্রয়োজন হলে আরও কাজের সুযোগ দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে তথ্যপ্রযুক্তির নতুন ব্যবস্থা কমিশনের অনুমোদনে যাওয়ার আগে আধিকারিকদের কমিটিতে আলোচনা করতে হবে।
এর পটভূমিতে রয়েছে ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ দিল্লিতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার অভিযোগ। অনুসন্ধানে উঠে আসে, স্থানীয় আধিকারিকেরা নিজেদের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ণ প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন না বলে দুই কমিশনার উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। ফলে পর্যালোচনার আসল পরীক্ষা হবে, সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের সিদ্ধান্ত বৈদ্যুতিন ব্যবস্থায় কার্যকর করা যাচ্ছে কি না। দ্রুত কাজ করার ক্ষমতার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং সংশোধন করার অধিকারও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
গোয়ার ঘটনাটি সমস্যার বাস্তব উদাহরণ। স্থানীয় আধিকারিকদের যাচাইয়ে যোগ্য বিবেচিত হওয়া ৯৭ জনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় ওঠেনি। কমিশন এখন জানিয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৮১ জন অন্তর্ভুক্তির জন্য ৬ নম্বর আবেদনপত্র পূরণ করেছেন; বাড়ি বাড়ি গিয়ে আবেদন সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আবেদন জমা পড়া আর তালিকায় নাম ফিরে আসা এক নয়। সংশোধনের সাফল্য বোঝা যাবে অন্তর্ভুক্তি সম্পূর্ণ হলে।
নতুন ভোটারদের ৬ নম্বর আবেদনপত্র নিয়েও জট কাটেনি। কমিশনের অবস্থান, বিশেষ সংশোধনের জন্য সংযুক্ত ঘোষণাপত্র সুপ্রিম কোর্টের সমর্থন পেয়েছে; বিশেষ সংশোধনের বাইরের সময়ে বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত আবেদনপত্র ব্যবহৃত হবে। কিন্তু বৈদ্যুতিন আবেদনপত্রে বাবা-মায়ের পুরনো ভোটার তালিকার তথ্য চাওয়ার যে প্রশ্ন নিয়ে আপত্তি উঠেছিল, সেটি সরানো হয়েছে কি না, বিবৃতিতে স্পষ্ট নয়। কে প্রশ্নটি যুক্ত করেছিলেন, তারও ব্যাখ্যা নেই।
বাংলার ক্ষেত্রে অনুত্তরিত প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট। বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের নির্দেশে যাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করার অনুমতি কে দিয়েছিলেন? সেগুলি কমিশনের পক্ষে করা হয়ে থাকলে, সেই সিদ্ধান্ত কার? বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শনিবারের বিবৃতি এই বিষয়ে নীরব। ফলে চলতি সংশোধনে শুনানির নিয়ম শিথিল করার ঘোষণা থেকে বাংলার আপিলসংক্রান্ত সমস্যার নিষ্পত্তি হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার অবকাশ নেই।
কমিশন অবশ্য জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার-সহ কুড়িটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিশেষ সংশোধন শেষ হয়েছে। সেখানে সংশোধনের সময়ে কিংবা পরে বাদ পড়া মানুষ এবং প্রথমবার ভোটার হতে চাওয়া তরুণেরা নিয়মিত হালনাগাদের মাধ্যমে নাম তোলার আবেদন করতে পারবেন। এজন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে রাজ্য ও জেলা নির্বাচনী কর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আবেদন গ্রহণের এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কতজনকে তালিকায় ফেরায়, সেটিই এখন দেখার।
কমিশনের অভ্যন্তরীণ পরিচালনাতেও কিছু নিয়ম পুনরুচ্চারিত হয়েছে। বৈঠকের আগে আলোচ্যসূচি পাঠাতে হবে, পরে কার্যবিবরণী দিতে হবে। আধিকারিকদের বিদেশযাত্রায় কমিশনের অনুমোদন লাগবে এবং তাঁদের বার্ষিক কর্মমূল্যায়ন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। কমিশনারদের নির্দেশ মানার কথাও বিশেষভাবে বলা হয়েছে। এই ঘোষণাগুলি থেকে বোঝা যায়, বিতর্ক ভোটার যাচাইয়ের পদ্ধতির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ভিতরে যৌথ সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক জবাবদিহিকেও সামনে এনেছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় বিভাজন স্পষ্ট। কংগ্রেসের জয়রাম রমেশের অভিযোগ, ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পরে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছে কমিশন; প্রযুক্তিগত পর্যালোচনা ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের প্রশ্নের বিকল্প নয়। অন্যদিকে বিজেপির রবিশঙ্কর প্রসাদ কমিশনের ব্যাখ্যাকে স্বাগত জানিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ ভিত্তিহীন বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, কমিশনের সিদ্ধান্ত ও আদালতের অবস্থান উপেক্ষা করে রাজনৈতিক আক্রমণ চালানো হচ্ছে।
সব মিলিয়ে শনিবারের সিদ্ধান্তে ভোটারের দপ্তরে যাতায়াতের বোঝা কমানোর এবং কমিশনের কাজকর্মে কিছু নিয়ম প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু আস্থা ফেরানোর পরীক্ষা হবে প্রয়োগে: নথি দেওয়ার পরে দ্রুত সিদ্ধান্ত মিলছে কি না, যোগ্য মানুষের নাম ফিরছে কি না, স্থানীয় আধিকারিক নিজের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারছেন কি না। বাংলার আপিল ও আবেদনপত্রের পরিবর্তন নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যাও প্রয়োজন। তিন কমিশনারের একসঙ্গে বৈঠক সেই কাজের সূচনা হতে পারে; তার ফলের বিকল্প হতে পারে না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



