সব কিছুর সঙ্গেই এখন প্রদাহের যোগ খোঁজা হচ্ছে কেন?

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: আধুনিক জীবনযাপন, বয়স বাড়া, খাবার কিংবা শরীর—অন্তর্জালে এখন প্রায় সব আলোচনারই সাধারণ ভাষা হয়ে উঠেছে প্রদাহ।
- অপরাহ্ উইনফ্রের কথোপকথনমূলক অনুষ্ঠানের সাম্প্রতিক একটি পর্বে উঠে এল ক্যানসার গবেষণার এক চমকপ্রদ নতুন অনুমান।
- তার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোনও সম্পর্ক নেই।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: আধুনিক জীবনযাপন, বয়স বাড়া, খাবার কিংবা শরীর—অন্তর্জালে এখন প্রায় সব আলোচনারই সাধারণ ভাষা হয়ে উঠেছে প্রদাহ। অপরাহ্ উইনফ্রের কথোপকথনমূলক অনুষ্ঠানের সাম্প্রতিক একটি পর্বে উঠে এল ক্যানসার গবেষণার এক চমকপ্রদ নতুন অনুমান। তার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোনও সম্পর্ক নেই। নেই নতুন কোনও ওষুধ কী ভাবে কাজ করে, সেই প্রসঙ্গও। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ।
উইনফ্রের অতিথি ছিলেন ক্যানসার গবেষক ও চিকিৎসক সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়, পুলিৎজারজয়ী ‘দ্য এম্পেরর অব অল ম্যালাডিজ’ বইয়ের লেখক। কথাবার্তার মাঝখানে উইনফ্রে ক্যানসার চিকিৎসার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপনার শরীরে হাজার হাজার ক্যানসার কোষ ঘুমিয়ে রয়েছে। তার পরে এমন কিছু ঘটে, যা তাদের জাগিয়ে তোলে। আমি একে বলি ‘ঘুমন্ত রাজকন্যাকে জাগানোর চুম্বন’। আমরা বুঝতে পারছি, সেই জাগিয়ে তোলার ঘটনাটি হল দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ… ক্যানসার সম্পর্কে আমাদের ভাবনাটাই এতে বদলে যাচ্ছে… ওই বিশেষ ধরনের প্রদাহ যদি আমরা পরীক্ষা করে শনাক্ত করতে পারি, তা হলে ভবিষ্যতে ক্যানসার হওয়ার পূর্বাভাস দিতে পারে, এমন একটি জৈব নির্দেশক আমাদের হাতে আসবে। এমনকি, তা রোগ প্রতিরোধেও কাজে লাগতে পারে।”
দীর্ঘায়ু নিয়ে ক্রমবর্ধমান আগ্রহের এই সময়ে জীবদেহের যে প্রক্রিয়াগুলি নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হচ্ছে, প্রদাহ তাদের অন্যতম। বিজ্ঞানীরা ক্রমশ এমন প্রমাণ পাচ্ছেন যে, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা মৃদু প্রদাহ বহু রোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ, সামনে কোনও তাৎক্ষণিক বিপদ না থাকলেও রোগপ্রতিরোধের কাজে নিয়োজিত কোষগুলি দীর্ঘ সময় সক্রিয় থেকে যাচ্ছে। ডায়াবিটিস ও ক্যানসার থেকে শুরু করে যে সব রোগে শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা নিজের সুস্থ কোষকেই আক্রমণ করে, কিংবা অ্যালঝাইমার্সের মতো স্নায়ুরোগ—নানা অসুখের সঙ্গেই এর যোগ মিলছে।
গত সপ্তাহেই ‘ইউরোপিয়ান জার্নাল অব প্রিভেন্টিভ কার্ডিয়োলজি’-তে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার এবং মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালনের বিপর্যয় বা স্ট্রোকের ঝুঁকি ৪৩ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। এমআরসি ল্যাবরেটরি অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস ও ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডনের বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, উপসর্গ দেখা দেওয়ার বহু বছর আগে থেকেই প্রদাহ নিঃশব্দে হৃৎপিণ্ডের গঠনে ক্ষতি করে। তার দেওয়াল পুরু হয়ে যায়, প্রকোষ্ঠগুলি ছোট হতে থাকে এবং সেগুলিতে রক্ত ভরার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
তা হলে প্রদাহ যে এখন সকলের ভাবনার বিষয় হয়ে উঠবে, তাতে আর আশ্চর্য কী! যেদিকেই তাকানো যাক, কেউ না কেউ বলে দিচ্ছেন, কী ভাবে তা কমাতে হবে। নিজে নিজে সুস্থ থাকার পরামর্শবই থেকে ইনস্টাগ্রামে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের ছোট ছোট ভিডিয়ো—সর্বত্রই একই আলোচনা। কোন খাবারে প্রদাহ বাড়ে, প্রদাহে পেট কেন ফুলে যায়, মুখেই বা তার ছাপ কী ভাবে পড়ে—তিন মিনিটেরও কম সময়ে সব বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
হলুদকে তুলে ধরা হচ্ছে প্রায় অলৌকিক দাওয়াই হিসেবে। কেউ আবার খাদ্যতালিকা থেকে একের পর এক খাবার বাদ দেওয়ার পদ্ধতিতে অগাধ আস্থা রাখছেন। এর সঙ্গে আছে পরজীবী তাড়িয়ে শরীর ‘বিষমুক্ত’ করার দাবি, বরফজলে স্নান, সেলারির রস খেয়ে শরীরকে নতুন করে চাঙ্গা করা এবং শুধু একটি খাবার খেয়ে শরীর ‘শুদ্ধ’ করার নানা আয়োজন। বিজ্ঞান যত বেশি রোগের সঙ্গে প্রদাহের যোগ খুঁজে পাচ্ছে, সুস্থতার পণ্য ও পরিষেবার ব্যবসাও তত বেশি প্রদাহ কমানোর সামগ্রী বেচে মুনাফা করছে। তবে এই সব দাবি চোখ বুজে বিশ্বাস না করাই ভাল। বহু সময় আমাদের কাছে পরামর্শ পৌঁছে দিচ্ছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি চিকিৎসক, রোগ সারানোর দাবিদার কিংবা সুস্থ থাকার উপায় বাতলানো সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবশালীরা।
ইতিহাসের অধিকাংশ সময় জুড়ে চিকিৎসক এবং সাধারণ মানুষ নজর দিয়েছেন সেই সব লক্ষণে, যা চোখে দেখা যায় বা শরীরে টের পাওয়া যায়—ক্ষতের চারপাশে লাল হয়ে ফুলে ওঠা ত্বক, ব্যথা, জ্বর। চল্লিশের কোঠায় বয়স, সংবাদমাধ্যমে কর্মরত কাজল এস. (নাম পরিবর্তিত) বলছিলেন, “মনে আছে, কয়েক বছর আগে একটি লেখা পড়েছিলাম। তাতে বলা হয়েছিল, যাঁদের কাজ খুব মানসিক চাপের, তাঁদের শরীরে প্রদাহ থাকে। বয়স বাড়লে তা থেকে অসুখ হতে পারে। আমার মনে আছে, চোখ বন্ধ করে মনে মনে নিজের শরীরটা এক বার যাচাই করেছিলাম। ভেবেছিলাম, না, কোথাও তো ফোলা নেই, ব্যথাও নেই। তা হলে আমার প্রদাহ নেই। কত কম জানতাম, কত সরল ছিল আমার ধারণা!” স্বল্পস্থায়ী তীব্র প্রদাহ এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের তফাতটাই তখন তাঁর জানা ছিল না।
এর বছর দুয়েক পরে এক সন্ধ্যায় তাঁর বাঁ হাতের আঙুলের গাঁটগুলি ফুলে উঠল। কয়েক দিনের মধ্যেই ধরা পড়ল ‘প্যালিনড্রোমিক রিউম্যাটিজম’। এটি প্রদাহজনিত বাতের একটি বিরল ধরন, যাতে হঠাৎ হঠাৎ তীব্র গাঁটের ব্যথা ও প্রদাহ দেখা দেয়, আবার এমন আক্রমণ বারবার ফিরে আসে। তাঁর চিকিৎসক বুঝিয়ে বলেছিলেন, একটানা মানসিক চাপ, অনিয়মিত ঘুম এবং অন্ত্রের সমস্যা থেকে তৈরি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তাঁর অসুস্থতায় কী ভাবে প্রধান ভূমিকা নিয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের সময়ে কিন্তু ফোলা বা ব্যথা নাও থাকতে পারে।
তা হলে স্বল্পস্থায়ী তীব্র প্রদাহ আর দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের মধ্যে তফাত কোথায়? প্রথমটি হয় যখন শরীর বাইরের জীবাণুর আক্রমণ ঠেকাতে অথবা ক্ষতিগ্রস্ত কলা সারিয়ে তুলতে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। অতি সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলি প্রসারিত হয়। তাদের দেওয়াল দিয়ে তরল ও কোষের যাতায়াতও সহজ হয়ে ওঠে। ফলে প্রচুর শ্বেত রক্তকণিকা ক্ষতিগ্রস্ত জায়গায় পৌঁছতে পারে। জায়গাটি ফুলে ওঠে। সেই ফোলা আশপাশের স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি করলে ব্যথা হয়।
অন্য দিকে, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ অনেক সময় নিঃশব্দে চলতে থাকে। শরীরের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থা যখন সব সময় অতিরিক্ত উত্তেজিত ও সক্রিয় হয়ে থাকে, তখনই এমনটি ঘটে। গবেষকেরা বুঝতে পারছেন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, বায়ুদূষণ, ঘুমের অভাব এবং মানসিক চাপ এই প্রদাহের উপর যতটা প্রভাব ফেলে বলে আগে মনে করা হত, বাস্তবে তার প্রভাব আরও অনেক বেশি হতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।
স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।



