কুকুরও কান পাতে

যা জানা জরুরি
- মানুষের একটানা কথার স্রোতে কোথায় একটি শব্দ শেষ, কোথা থেকেই বা শুরু হচ্ছে পরেরটি—এই হিসাব করতে হয় খুব ছোটবেলা থেকেই।
- আশ্চর্যের বিষয়, এই কাজে কুকুরও নাকি মানুষের শিশুর মতোই একটি কৌশল ব্যবহার করে।
- কথার ভিড়ে তারা বিশেষ করে কান পাতে ব্যঞ্জনধ্বনির দিকে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মানুষের একটানা কথার স্রোতে কোথায় একটি শব্দ শেষ, কোথা থেকেই বা শুরু হচ্ছে পরেরটি—এই হিসাব করতে হয় খুব ছোটবেলা থেকেই। আশ্চর্যের বিষয়, এই কাজে কুকুরও নাকি মানুষের শিশুর মতোই একটি কৌশল ব্যবহার করে। কথার ভিড়ে তারা বিশেষ করে কান পাতে ব্যঞ্জনধ্বনির দিকে।
হাঙ্গেরির এক নতুন গবেষণায় এমনই ইঙ্গিত মিলেছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, টানা কথার মধ্যে আলাদা আলাদা শব্দ শনাক্ত করতে কুকুর ব্যঞ্জনধ্বনির বিন্যাসের দিকে বিশেষ নজর দেয়। মানুষের ভাষা আয়ত্ত করার জটিল ক্ষমতা কুকুরের নেই, কিন্তু ভাষার শব্দ বিশ্লেষণের এই একটি কৌশলে তাদের মস্তিষ্ক মানুষের সঙ্গে অদ্ভুত মিল দেখাচ্ছে। গবেষণাটি চলতি সপ্তাহে সায়েন্স পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
বুদাপেস্টের এওটভোশ লোরান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানীয় স্নায়ুবিজ্ঞানী এবং গবেষণাটির অন্যতম লেখক আটিলা আন্দিচের কথায়, বিষয়টি হল ‘ব্যঞ্জনধ্বনিকে অগ্রাধিকার দেওয়া’। তাঁর মতে, মানুষের কথা শোনার সময় কুকুরও শব্দের গঠন বুঝতে ব্যঞ্জনধ্বনিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
কী ভাবে বিষয়টি ধরা পড়ল? গবেষকেরা ২০টি কুকুর ও ২০ জন মানুষকে পরীক্ষাগারে নিয়ে একের পর এক অর্থহীন শব্দ শোনান। কিছু শব্দধারায় ব্যঞ্জনধ্বনির বিন্যাসে নির্দিষ্ট ছক ছিল, কোথাও সেই ছক তৈরি হয়েছিল স্বরধ্বনি দিয়ে, আবার কোনও ধারায় ছিল না তেমন কোনও নিয়ম। অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ ইইজি-র মাধ্যমে নথিবদ্ধ করা হয়।
ফল বলছে, ব্যঞ্জনধ্বনির বিন্যাসে নির্দিষ্ট ছক থাকা শব্দধারা শুনলে মানুষ এবং কুকুর—দু’দলের মস্তিষ্কেই বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। আরও চমকপ্রদ বিষয়, যে কুকুরগুলি জীবনের প্রথম দিকে মানুষের সঙ্গে বড় হয়নি, তাদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া মিলেছে।
অর্থাৎ মানুষের কথা শোনার অভ্যাস একেবারে শৈশব থেকেই থাকতে হবে—এমনটা এই পরীক্ষায় দেখা যায়নি।
গবেষণাটির সহলেখক আন্দিচের মতে, ভাষার বিবর্তন নিয়ে এই ফল নতুন প্রশ্ন তুলছে। মানুষের মতো জটিল ভাষাগত ক্ষমতা না থাকা প্রাণীর মস্তিষ্কও মানুষের কথার সংস্পর্শে এসে এমন কিছু কৌশল ব্যবহার করতে পারে, যা ভাষা বোঝার প্রাথমিক ধাপের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এখানেই মানুষের শিশুর সঙ্গে কুকুরের তুলনাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস সুবিয়াউল, যিনি গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, মনে করিয়ে দিয়েছেন—একটি শিশু যখন কথা শিখতে শুরু করে, তখন তার সামনে বিরাট সমস্যা। একই শব্দ বিভিন্ন বয়স, লিঙ্গ বা মানুষের কণ্ঠে সম্পূর্ণ আলাদা শোনাতে পারে। সেই বৈচিত্র্যের মধ্যেও শিশুকে আগে শব্দের সীমা খুঁজে নিতে হয়, তার পরে তার অর্থ বুঝতে হয়।
কুকুরও যে মানুষের শব্দ আলাদা করে ধরার জন্য এত মনোযোগ দিয়ে শোনে, গবেষণাটি তারই ইঙ্গিত দেয়।
তবে এখান থেকে আরও বড় প্রশ্ন উঠে আসে। প্রায় ১৫ হাজার বছর ধরে মানুষের সঙ্গে বসবাস করতে করতে কুকুরের মধ্যে কি এই ক্ষমতা তৈরি হয়েছে? নাকি মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার আগেই তাদের মস্তিষ্কে এর কোনও ভিত্তি ছিল?
উত্তর পেতে হলে গবেষকদের চোখ এখন নেকড়েদের দিকে। সুবিয়াউলের মতে, নেকড়েদেরও যদি মানুষের কথার পরিবেশে বড় করা হয়, তাদের মস্তিষ্ক একইভাবে শব্দের ব্যঞ্জনধ্বনির বিন্যাসে প্রতিক্রিয়া দেখায় কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তবেই বোঝা যেতে পারে এই ক্ষমতা পোষ মানানোর ফল, নাকি কুকুরের পূর্বপুরুষদের মধ্যেই এর কিছুটা উপস্থিত ছিল।
তাঁর ধারণা অবশ্য, নেকড়েরা সম্ভবত কুকুরের মতো আচরণ করবে না। কারণ আগের গবেষণাগুলিতে দেখা গিয়েছে, মানুষের সামাজিক সংকেত বুঝতে কুকুরের অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে পোষ মানানোর দীর্ঘ ইতিহাসের সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ কোথায় তাকাচ্ছে, আঙুল দিয়ে কোন দিকে দেখাচ্ছে—এমন সূক্ষ্ম সংকেতও কুকুর সহজে ধরতে পারে।
মানুষ ও কুকুরের সম্পর্কের জৈবিক দিকটিও এখানে প্রাসঙ্গিক। আগের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পারস্পরিক যোগাযোগের সময় মানুষ ও কুকুর—দু’পক্ষের শরীরেই অক্সিটোসিনের মাত্রা বাড়তে পারে। সামাজিক বন্ধনের সঙ্গে যুক্ত এই হরমোন বাবা-মা ও শিশুর সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাইমেটদের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা সুবিয়াউলের মতে, বুদ্ধিমান হওয়ার সঙ্গে এই ক্ষমতার সরাসরি সম্পর্ক নেই। তাঁর ব্যাখ্যায়, মানুষের সামাজিক সংকেত ধরার ক্ষেত্রে কুকুরের বিশেষ দক্ষতা মূলত মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ সহাবস্থান ও পোষ মানানোর ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত।
এই গবেষণার পরিসর অবশ্য ছোট—মাত্র ২০টি কুকুর ও ২০ জন মানুষ। ফলে ফলাফলকে চূড়ান্ত উত্তর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কুকুরের এই শব্দ-চেনার কৌশল ঠিক কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং এর কতটা জেনেটিক, কতটা পরিবেশের প্রভাব—তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অমৃতা মল্লিকার্জুন, যিনি এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না, মনে করেন, মানুষের সঙ্গে কুকুরের দীর্ঘ সহযাত্রার গল্পে এই গবেষণা নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে। হাজার হাজার বছর ধরে পাশাপাশি থাকতে থাকতে শুধু কুকুরের আচরণই বদলায়নি; সেই সম্পর্কের অভিজ্ঞতা দুই প্রজাতির মস্তিষ্ককেও প্রভাবিত করে থাকতে পারে।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটা শুধু কুকুর কথা বোঝে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হল—মানুষের সঙ্গে এত দীর্ঘ পথ চলতে চলতে তারা আমাদের কথা শোনার কৌশলটাও কি শিখে ফেলেছে?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



