সত্তরেই ফুল বডি স্ক্যান?

যা জানা জরুরি
- শশী তারুর ও অনুপম খের সারা শরীরের স্ক্যান করিয়েছেন।
- কিন্তু বয়স সত্তরের কোঠায় পৌঁছলেই কি প্রতি বছর এমন স্ক্যান করানো জরুরি?
- নাকি নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে স্বাস্থ্যের সামগ্রিক অবস্থা বুঝে প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করানোই যথেষ্ট?
বিস্তারিত প্রতিবেদন
শশী তারুর ও অনুপম খের সারা শরীরের স্ক্যান করিয়েছেন। কিন্তু বয়স সত্তরের কোঠায় পৌঁছলেই কি প্রতি বছর এমন স্ক্যান করানো জরুরি? নাকি নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে স্বাস্থ্যের সামগ্রিক অবস্থা বুঝে প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করানোই যথেষ্ট?
১৭ সেপ্টেম্বর সমাজমাধ্যমে শশী তারুর জানান, ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকাকালীন তিনি বেভারলি হিলস মেডিক্যাল ইমেজিং ক্লিনিকে সারা শরীরের স্ক্যান করাতে গিয়েছিলেন। ক্লিনিকটি চালান দিল্লির প্রাক্তন বাসিন্দা পুনীত চন্দক। সেখানেই দেখা হয়ে যায় অনুপম খেরের সঙ্গে। তিনিও একই পরীক্ষা করাতে এসেছিলেন। তারুর মজা করে লেখেন, পুরনো এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল—যিনি ইদানীং তাঁর সমালোচকও!
ঘটনাটি সামনে আসতেই প্রবীণদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রসঙ্গ উঠেছে। মুম্বইয়ের পরেলের গ্লেনইগলস হাসপাতালের পরিপাকতন্ত্রের শল্যচিকিৎসা ও মিনিম্যালি ইনভেসিভ সার্জারি বিভাগের অধিকর্তা চিকিৎসক প্রশান্ত রাওয়ের মতে, সত্তরের কোঠায় পৌঁছলে বছরে অন্তত এক বার প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উপকারী।
‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে তিনি জানান, নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে গেলে শরীরে কোনও পরিবর্তন হচ্ছে কি না, তা গোড়াতেই ধরা সহজ হয়। আগে থেকে কোনও অসুখ থাকলে বা একাধিক ওষুধ খেতে হলে অবশ্য আরও ঘন ঘন চিকিৎসকের পরামর্শের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে বছরে এক বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা মানেই সব ধরনের রক্ত পরীক্ষা, স্ক্যান ও টেস্ট একসঙ্গে করানো নয়।
রাওয়ের মতে, প্রবীণদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুধু রক্ত পরীক্ষায় আটকে থাকাও ঠিক নয়। রক্তচাপ, ওজন, পুষ্টির অবস্থা, চলাফেরার ক্ষমতা, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি নিয়মিত কী কী ওষুধ খাওয়া হচ্ছে, সেগুলিও পর্যালোচনা করা দরকার।
পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কতটা, স্মৃতিশক্তির অবস্থা কেমন, দৈনন্দিন কাজকর্ম কতটা স্বচ্ছন্দে করা যাচ্ছে—চিকিৎসকের মূল্যায়নে এ সবও থাকা উচিত। প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া হয়েছে কি না এবং বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী ক্যানসার শনাক্তকরণের কোনও পরীক্ষা দরকার কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।
ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে শর্করা বা এইচবিএ১সি, কোলেস্টেরল, কিডনি ও যকৃতের কার্যকারিতা এবং রক্তকণিকার পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা করা যেতে পারে। বয়স, লিঙ্গ ও রোগের ইতিহাস অনুযায়ী অস্থিক্ষয়, দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তির সমস্যা এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের পরীক্ষাও প্রয়োজন হতে পারে।
কিন্তু এখানে মূল কথাটা হল—সব পরীক্ষা সবার জন্য নয়।
তা হলে কি প্রতি বছর ‘ফুল বডি চেক-আপ’ করাতেই হবে? রাওয়ের উত্তর, সকলের ক্ষেত্রে নয়। বছরে এক বার স্বাস্থ্যের সামগ্রিক মূল্যায়ন উপকারী হতে পারে। কিন্তু ‘ফুল বডি চেক-আপ’ নামে একগুচ্ছ পরীক্ষা ও স্ক্যানের প্যাকেজ সবার জন্য সমান প্রয়োজনীয় নয়।
কী পরীক্ষা করা হবে, তা নির্ভর করবে বয়স, উপসর্গ, আগের রোগের ইতিহাস, চলতি ওষুধ এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকির উপর। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষায় কখনও ভুল বিপৎসংকেতও ধরা পড়তে পারে। তার জেরে আবার একের পর এক অতিরিক্ত পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন তৈরি হতে পারে।
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুখ থাকলে বছরে এক বার চিকিৎসকের কাছে গেলেই যথেষ্ট নাও হতে পারে। রোগ কতটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তার উপর নির্ভর করবে কত ঘন ঘন পরীক্ষা বা চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। রাওয়ের মতে, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কিডনির কার্যকারিতা এবং ওষুধপত্র নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে। কত দিন অন্তর এই মূল্যায়ন করা হবে, তা চিকিৎসকই ঠিক করবেন।
আর একটি বিষয় একেবারেই এড়িয়ে যাওয়া চলবে না—নতুন উপসর্গ। বয়স হয়েছে বলে কোনও অস্বাভাবিক লক্ষণকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়া, বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, ক্রমাগত রক্তপাত কিংবা মল-মূত্র ত্যাগের অভ্যাসে আচমকা পরিবর্তন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। হঠাৎ স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা দরকার।
শশী তারুর ও অনুপম খেরের স্ক্যানের খবর প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা উসকে দিলেও, সত্তর পেরোলেই সুস্থ থাকার ফর্মুলা যে ‘প্রতি বছর সব স্ক্যান’, তা নয়। নিয়মিত স্বাস্থ্য মূল্যায়ন, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং নিজের ঝুঁকি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষাই হতে পারে বেশি কার্যকর পথ।
স্বাস্থ্যসংক্রান্ত এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য ও চিকিৎসকের বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি। নিয়মিত কোনও স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করার আগে নিজের চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



