শৈশবেরও কি বাজারদর?

যা জানা জরুরি
- প্রতিবেদন জন্মের ভিডিও থেকে বয়ঃসন্ধির ব্যক্তিগত কথোপকথন—লুকার জীবনের প্রায় প্রতিটি পর্বই তার মা-বাবার চল্লিশ লক্ষ অনুসারীর সামনে এসেছে।
- ক্যামেরা শুধু তার বেড়ে ওঠা দেখেনি, সেই বেড়ে ওঠাকেই বানিয়েছে পরিবারের অনলাইন ব্যবসার অংশ।
- জার্মান পরিচালক যোশা বংগার্ডের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র ‘বেবিস্টার’ ২৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রতিবেদন
জন্মের ভিডিও থেকে বয়ঃসন্ধির ব্যক্তিগত কথোপকথন—লুকার জীবনের প্রায় প্রতিটি পর্বই তার মা-বাবার চল্লিশ লক্ষ অনুসারীর সামনে এসেছে। ক্যামেরা শুধু তার বেড়ে ওঠা দেখেনি, সেই বেড়ে ওঠাকেই বানিয়েছে পরিবারের অনলাইন ব্যবসার অংশ। জার্মান পরিচালক যোশা বংগার্ডের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র ‘বেবিস্টার’ ২৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে।
১৬ বছরের লুকার চরিত্রে মাজা বনস। তাঁর মা স্টেলা ও বাবা ক্রিসের ভূমিকায় বেয়া ব্রক্স ও লিলিওম লেওয়াল্ড। নিকোল রুথার্স ও বংগার্ডের চিত্রনাট্য পরিবারভিত্তিক প্রভাবক-ব্যবসার চকচকে পর্দার আড়ালে সন্তানের গোপনীয়তা, সম্মতি এবং অধিকার নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে।
ছবিটির বিশ্ব-অভিষেক অবশ্য অনেক আগেই। ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ডিসকভারি বিভাগে প্রথম প্রদর্শনের পর জুরিখ, হামবুর্গ-সহ বিভিন্ন উৎসবে ছবিটি দেখানো হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে জার্মান প্রেক্ষাগৃহেও মুক্তি পেয়েছে। ফলে ২৫ সেপ্টেম্বরের ঘটনাটি নতুন চলচ্চিত্র আবিষ্কারের নয়, বরং যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডে এর বাণিজ্যিক মুক্তির।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক উৎসবে আগের প্রশংসাকে ব্রিটিশ মুক্তির সময় পাওয়া নতুন প্রতিক্রিয়া বা পুরস্কার হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই।
কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে আরও একটি সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা। স্টেলা ও ক্রিস পরিবার বড় করার কথা ভাবছেন। কিন্তু লুকার সন্দেহ—নতুন শিশুটি কি সত্যিই পরিবারের ইচ্ছা, নাকি ক্লান্ত হয়ে পড়া অনলাইন ব্র্যান্ডকে আবার চাঙা করার নতুন উপায়?
এখানেই ‘বেবিস্টার’ সরল ‘খারাপ মা-বাবা’র গল্প হয়ে উঠতে চায় না।
স্টেলা ও ক্রিস তাঁদের সন্তানের যত্ন নেন, ভালোবাসেন। কিন্তু ক্যামেরা যখন সবসময় চালু থাকে, তখন সেই যত্নও হয়ে উঠতে পারে কনটেন্ট। ভালোবাসা, অভিনয় এবং আয় একই দৃশ্যে মিশে গেলে লুকার পক্ষে বোঝা কঠিন—কোন মুহূর্তটি তার জন্য, আর কোনটি দর্শকের জন্য।
ছবিটি অবশ্য কল্পকাহিনি; কোনও নির্দিষ্ট বাস্তব পরিবারের গোপন নথি নয়। কিন্তু যে প্রশ্নগুলি এটি তোলে, সেগুলি বাস্তব। অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান নিজের ভবিষ্যৎ অনলাইন পরিচয় তৈরিতে কতটা সম্মতি দিতে পারে? তার ছবি ও ভিডিও থেকে তৈরি আয় কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে? আর বহু বছর পরে সে যদি পুরনো কোনও ভিডিও মুছে ফেলতে চায়, সেই অধিকার তার থাকবে কি?
এই প্রশ্নগুলি পরিবারভিত্তিক কনটেন্ট নির্মাতাদের ঘিরে বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যেই আলোচনায় এসেছে। তবে ছবির চরিত্রগুলির আচরণ দেখে সব প্রভাবক পরিবার একইভাবে সিদ্ধান্ত নেয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।
বিশ্লেষণ
‘বেবিস্টার’-এর সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ধারণা হতে পারে ক্যামেরাকে পরিবারের নিছক যন্ত্র নয়, এক ধরনের ‘তৃতীয় অভিভাবক’ হিসেবে দেখা।
খাবার টেবিলে সে আছে। ঝগড়ার সময় আছে। সান্ত্বনার মুহূর্তেও আছে। আবার সেই ক্যামেরাই পরিবারের আয়ের উৎস। ফলে লুকা যখন ক্যামেরা বন্ধ করতে চায়, তখন সে শুধু নিজের গোপনীয়তা রক্ষা করছে না; পরিবারের ব্যবসার বিরুদ্ধেও দাঁড়াচ্ছে। তার ‘না’ তাই ব্যক্তিগত পছন্দ থেকে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়।
তবে এখানেই ছবিটির আর একটি বিপদ। এমন গল্প খুব সহজেই দর্শকের আত্মতুষ্টির বিনোদন হয়ে উঠতে পারে—পর্দার মা-বাবাকে দেখে ‘খারাপ অভিভাবক’ বলে স্বস্তি পাওয়া, অথচ নিজের সন্তান বা পরিবারের ছবি প্রকাশের অভ্যাস নিয়ে প্রশ্ন না তোলা।
আসল আলোচনা তাই আরও বড়। প্ল্যাটফর্ম ব্যক্তিগত জীবনের কোন অংশকে বেশি পুরস্কৃত করে? বিজ্ঞাপনদাতারা শিশুদের উপস্থিতি থাকা কনটেন্ট কীভাবে মূল্যায়ন করেন? সন্তানের ছবি, তথ্য ও আয় কে রক্ষা করে? এই কাঠামোগত প্রশ্নগুলি বাদ দিলে সমস্যাটি শুধু দুই অভিভাবকের ব্যক্তিগত নৈতিকতার মধ্যে আটকে যায়।
আর বাস্তবতার সঙ্গে ছবির পার্থক্যও মনে রাখা দরকার। পর্দায় ব্যবহৃত সামাজিক মাধ্যম বাস্তব প্ল্যাটফর্মের হুবহু প্রতিরূপ নাও হতে পারে। অনুসারীর সংখ্যা, বিজ্ঞাপন-চুক্তি বা অ্যালগরিদম নাটকের প্রয়োজনে সরলীকৃত হতে পারে। শিশুশ্রম, কর এবং তথ্যসুরক্ষার নিয়মও দেশভেদে আলাদা। সব পরিবার একই পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে না, একই ধরনের ঝুঁকির মুখেও পড়ে না।
তবু একটি প্রশ্ন থেকে যায়। অভিভাবক সন্তানের হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখলেও, সেই সিদ্ধান্ত থেকেই যদি পরিবারের আয় তৈরি হয়, তখন স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সন্তানের নামে আয় সংরক্ষণ, ধারণের সীমা নির্ধারণ কিংবা স্বাধীন তত্ত্বাবধান—এ ধরনের ব্যবস্থা সেই সংঘাত কমাতে পারে।
‘বেবিস্টার’ কোনও আইন লিখছে না। কিন্তু আইন বা নীতির প্রয়োজন কেন হতে পারে, সেই অস্বস্তিটা দর্শকের সামনে রাখতে পারে।
আর লুকার গল্পের সবচেয়ে অস্বস্তিকর জায়গাটিও সম্ভবত এখানেই। শিশুকালের কোনও মুহূর্ত যদি একবার ইন্টারনেটে বিক্রি হয়ে যায়, সেটি আর শুধু পরিবারের স্মৃতি থাকে না। সেটি হয়ে যায় এমন এক ডিজিটাল সম্পদ, যার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ হয়তো শিশুটির নিজের হাতেই নেই।
তাই ছবিটি দেখার পর প্রশ্নটা শুধু ‘লুকার মা-বাবা ঠিক করছেন কি না’ নয়। প্রশ্ন আরও গভীর—একটি শিশুর জীবন থেকে কনটেন্ট বানানোর অধিকার আসলে কার?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



