‘নত হব না’, কথাও চলবে

যা জানা জরুরি
- ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযোগ তাঁর দিকেই ফিরিয়ে দিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
- তাঁর বক্তব্য, পশ্চিম এশিয়ায় আসল দাদাগিরি ও সন্ত্রাস চালাচ্ছে আমেরিকাই।
- তেহরান আলোচনার দরজা বন্ধ করেনি, তবে সেই আলোচনা হতে হবে সমতার ভিত্তিতে—বলপ্রয়োগের হুমকির মধ্যে নয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযোগ তাঁর দিকেই ফিরিয়ে দিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিম এশিয়ায় আসল দাদাগিরি ও সন্ত্রাস চালাচ্ছে আমেরিকাই। তেহরান আলোচনার দরজা বন্ধ করেনি, তবে সেই আলোচনা হতে হবে সমতার ভিত্তিতে—বলপ্রয়োগের হুমকির মধ্যে নয়।
নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদে বুধবারের ভাষণে পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করে দেন, আমেরিকার চাপে ইরান নত হবে না। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর সাধারণ পরিষদে এটাই ছিল তাঁর প্রথম ভাষণ। একই সঙ্গে তিনি জানিয়ে দেন, কূটনীতি ও আলোচনায় ফিরতেও তেহরানের আপত্তি নেই।
পেজেশকিয়ানের কথায়, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং যাঁরা আমাদের উপর দাদাগিরি করতে চান, তাঁদের বুঝতে হবে, আমরা সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু বলপ্রয়োগের ভাষায় নয়।”
এর ঠিক আগের দিনই রাষ্ট্রপুঞ্জে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানকে “নিশ্চিহ্ন” করে দেওয়া হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত তাঁর সামনে রয়েছে। একই ভাষণে অবশ্য তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনাকেও স্বাগত জানিয়েছিলেন তিনি।
কথার পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের অধিবেশনের ফাঁকে কাতারের মধ্যস্থতায় ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে যোগাযোগ হয়। কয়েক মাসের বিরতির পর এটিই ছিল দু’দেশের মধ্যে প্রথম এমন উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ। বৈঠক ও পরবর্তী আলোচনাকে ঘিরে কিছুটা আশার সঞ্চার হলেও, দু’পক্ষ এখনও যুদ্ধ কী ভাবে শেষ করা হবে, তা নিয়ে অনেক দূরে রয়েছে।
হরমুজেই আটকে দর-কষাকষি
পেজেশকিয়ানের ভাষণে হরমুজ প্রণালীর প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, আমেরিকা সামরিক চাপ কমিয়ে নৌ-অবরোধ তুলে নিলে এক সপ্তাহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে আগেই পৌঁছেছিল।
ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, কাতারের মধ্যস্থতায় আমেরিকার কাছে যে শর্তগুলি জানানো হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে যুদ্ধের অবসান, আমেরিকার সামরিক তৎপরতা বন্ধ, নৌ-অবরোধ ও অর্থনৈতিক যুদ্ধের অবসান এবং ইরানের আটকে থাকা সম্পদ মুক্ত করা।
অর্থাৎ হরমুজ শুধু সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্র নয়, এখন কূটনৈতিক দর-কষাকষিরও অন্যতম প্রধান মঞ্চ। যুদ্ধের জেরে জলপথটিতে জাহাজ চলাচল ভয়াবহ ভাবে কমে গিয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বরের আগে সোমবার মাত্র দু’টি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ পেরিয়েছিল; সংঘাতের আগে দৈনিক গড় ছিল প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ।
‘ইরান যুদ্ধ শুরু করেনি’
যুদ্ধের দায় নিয়ে পেজেশকিয়ান আমেরিকা ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে হত্যার জন্য ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে “সন্ত্রাসবাদের” অভিযোগ তোলেন তিনি। সংঘাতের প্রথম কয়েক দিনে নিহত শিশুদের ছবির কথাও উল্লেখ করেন।
তাঁর দাবি, ইরান কোনও যুদ্ধ শুরু করেনি। “আমরা শুধু নিজেদের রক্ষা করেছি। আমরা সন্ত্রাসবাদী নই,” বলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ইরানের উপর চাপিয়ে দেওয়া হামলার শিকার হয়েছে সাধারণ মানুষ।
পেজেশকিয়ান একই সঙ্গে ইরানের শান্তিপূর্ণ অসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকারও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না।
আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে তাঁর বক্তব্য আরও স্পষ্ট। তাঁর মতে, পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ওই অঞ্চলের দেশগুলির নিজেদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে, আমেরিকার মতো বাইরের শক্তির নির্দেশে নয়। প্রতিবেশী দেশগুলিকে নিরাপত্তার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার হিসেবে দেখার কথাও বলেন তিনি।
তেহরানের ভিতরেও এক সুর নয়
তবে পেজেশকিয়ানের কূটনৈতিক বার্তার সঙ্গে ইরানের সব শীর্ষ মহলের বক্তব্য পুরোপুরি মেলে না। ইরানের কট্টরপন্থী মহলের কিছু নেতা আমেরিকার সঙ্গে যোগাযোগকে নিছক দর-কষাকষির পর্যায়েও স্বীকার করতে নারাজ।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কট্টরপন্থী সচিব মহসেন রেজাইয়ের বক্তব্য, আরাঘচি শুধু তেহরানের শর্ত জানিয়েছেন। সেই শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী খোলা বা আলোচনা—কোনওটাই এগোবে না বলে তিনি দাবি করেছেন।
এর ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার প্রশ্নে তেহরানের ভিতরে অবস্থানের পার্থক্যও স্পষ্ট হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ইরানের অভ্যন্তরে কে কতটা ক্ষমতা নিয়ে দর-কষাকষি করছেন, তা নিয়েও প্রশ্নের কথা উঠে এসেছে।
চাপ দু’দিকেই
আমেরিকার জন্যও হরমুজ-সঙ্কটের অর্থনৈতিক মূল্য কম নয়। এই জলপথ দিয়ে সংঘাতের আগে বিশ্বের তেল ও গ্যাস পরিবহণের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যাতায়াত করত। দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম এবং সরবরাহ—দুই নিয়েই চাপ বাড়ছে।
অন্য দিকে, নিষেধাজ্ঞা ও নৌ-অবরোধে ইরানের অর্থনীতির উপরও চাপ বাড়ছে। তেল রফতানি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তেহরানের জন্য যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার খরচও বাড়ছে।
হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব প্রণালী নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর তৎপরতা লোহিত সাগর থেকে ভারত মহাসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
কূটনীতির দরজা খোলা, পথ এখনও কঠিন
পেজেশকিয়ানের ভাষণ তাই একই সঙ্গে শক্ত অবস্থান এবং আলোচনার বার্তা। এক দিকে তিনি স্পষ্ট করেছেন, আমেরিকার চাপের কাছে তেহরান আত্মসমর্পণ করবে না। অন্য দিকে, কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়ার পথও খোলা রেখেছেন ইরান।
তবে তিন ঘণ্টার কূটনৈতিক যোগাযোগকে চূড়ান্ত অগ্রগতি হিসেবে দেখার মতো পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দু’পক্ষের অবস্থানের মধ্যে এখনও যথেষ্ট ফারাক রয়েছে।
ফলে নিউ ইয়র্কের বার্তাটি আপাতত এমন: তেহরান দরজা বন্ধ করছে না, কিন্তু দরজার চাবিটিও ওয়াশিংটনের হাতে তুলে দিচ্ছে না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



