মুখ বাঁকালেই মুকুট!

যা জানা জরুরি
- সুন্দর করে হাসুন—ছবি তোলার এই চেনা নির্দেশ এগরেমন্টে খুব একটা কাজে আসে না।
- এখানে মুখ যত অদ্ভুত ভাবে বাঁকানো যায়, জেতার সম্ভাবনাও যেন ততই বাড়ে।
- ইংল্যান্ডের কামব্রিয়ার ছোট শহরটিতে ১৯ সেপ্টেম্বর বসেছিল বিশ্ব গার্নিং চ্যাম্পিয়নশিপ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সুন্দর করে হাসুন—ছবি তোলার এই চেনা নির্দেশ এগরেমন্টে খুব একটা কাজে আসে না। এখানে মুখ যত অদ্ভুত ভাবে বাঁকানো যায়, জেতার সম্ভাবনাও যেন ততই বাড়ে। ইংল্যান্ডের কামব্রিয়ার ছোট শহরটিতে ১৯ সেপ্টেম্বর বসেছিল বিশ্ব গার্নিং চ্যাম্পিয়নশিপ। ২২ সেপ্টেম্বর রয়টার্সের প্রকাশিত ছবিতে ধরা পড়েছে প্রতিযোগীদের সেই অদ্ভুত মুখভঙ্গির প্রস্তুতি।
গার্নিং বলতে মুখের পেশি, ঠোঁট ও চোয়াল ব্যবহার করে ইচ্ছাকৃত ভাবে বিচিত্র অভিব্যক্তি তৈরি করা বোঝায়। অর্থাৎ জন্মগত চেহারা এখানে বিষয় নয়। নিজের মুখকে কতটা কায়দায় বিকৃত করা যায়, সেটিই আসল কসরত।
রয়টার্সের আলোকচিত্রী তেমিলাদে আদেলাজার ছবিতে দেখা যায় জেড একলস, লিন কেলি, ড্যান জনসন এবং ক্লেয়ার হার্টলিকে। কেউ প্রতিযোগিতার আগে মুখের পেশি গরম করছেন, কেউ আবার ক্যামেরার সামনে নিজের কসরত দেখাচ্ছেন। ছবির পরিচিতিতে কয়েকজনকে আগের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, তা থেকে এ বছরের চূড়ান্ত বিজয়ীর তালিকা তৈরি করা যায় না। পুরনো খেতাবকে তাই নতুন ফল হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই।
মুখভঙ্গির সঙ্গে মেলাও
প্রতিযোগিতাটি এগরেমন্ট ক্র্যাব ফেয়ারেরই অংশ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘কামব্রিয়া ক্র্যাক’-এর ১৯ সেপ্টেম্বরের ঘোষণায় জানানো হয়েছিল, মার্কেট হলে সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ছিল।
গার্নিংয়ের আগে শিঙা বাজানো, শিকার-বিষয়ক ও হাসির গান এবং বিশেষ কেকের র্যাফলও আয়োজনের অংশ হওয়ার কথা ছিল। অর্থাৎ কয়েকটি বিচিত্র মুখ দেখিয়েই অনুষ্ঠান শেষ নয়। গান, আড্ডা, স্থানীয় ঐতিহ্য এবং নানা প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এটি শহরের একটি পূর্ণাঙ্গ উৎসব। অবশ্য নির্ধারিত সূচি মানেই প্রতিটি অনুষ্ঠান ঠিক সেই সময়েই হয়েছে—এমন প্রমাণ নয়।
কাঁকড়া নয়, আপেল!
এগরেমন্ট ক্র্যাব ফেয়ারের ইতিহাস আরও পুরনো। আয়োজকদের নথি অনুযায়ী, মেলার শুরু ১২৬৭ সালে। রাজা তৃতীয় হেনরি স্থানীয় অধিপতিকে সাপ্তাহিক বাজার এবং বার্ষিক মেলা আয়োজনের সনদ দিয়েছিলেন।
তবে নামের ‘ক্র্যাব’ শুনে সামুদ্রিক কাঁকড়ার কথা ভাবলে ভুল হবে। এখানে ‘ক্র্যাব’ বলতে বোঝানো হয়েছে টক বুনো আপেল। আপেল বিলোনোর স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গেই মেলার নাম জড়িয়ে আছে। কৃষিকাজের মরসুম শেষে বাজার, উৎসব ও আনন্দের জমায়েত ধীরে ধীরে এগরেমন্টের নিজস্ব ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
এখন সাধারণত সেপ্টেম্বরের তৃতীয় শনিবার মেলা বসে। তবে তারিখ সব সময় একই ছিল না। আয়োজকদের ইতিহাসে ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন, স্থানীয় পশুর হাটের সঙ্গে দিন মেলানো এবং মানুষের ছুটির সুবিধার কথা বিবেচনা করে মেলার দিন বদলের উল্লেখ রয়েছে।
মেলা পুরনো, গার্নিংয়ের বয়স কত?
এখানে অবশ্য একটি পার্থক্য জরুরি। মেলার বয়স আর গার্নিং প্রতিযোগিতার বয়স এক নয়। গার্নিং ঠিক কবে শুরু হয়েছিল, তার নির্ভরযোগ্য উত্তর আয়োজকদের ইতিহাসেও নেই।
উনিশ শতকের সংবাদপত্রে পুরস্কারের জন্য মুখভঙ্গি করার উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে ঘোড়ার গলায় পরানো এক ধরনের কাঠামোর ফাঁক দিয়ে মুখ বের করে অদ্ভুত অভিব্যক্তি তৈরির রীতি জনপ্রিয় হয়। স্থানীয় ভাষায় সেই কাঠামোর নাম ‘ব্র্যাফিন’। যেন প্রতিযোগীর মুখের জন্যই বানানো অদ্ভুত এক ফ্রেম।
মেলার পুরনো খেলাগুলিও কম বিচিত্র ছিল না। আয়োজকদের নথিতে তেলমাখা খুঁটি বেয়ে পুরস্কার নামানো এবং চিটেগুড়ে ভেজানো কেক খেয়ে শিস দেওয়ার মতো প্রতিযোগিতার উল্লেখ রয়েছে। শেষের খেলাটি অবশ্য এখন আর হয় না। এগুলি এবারের আয়োজনের অংশ নয়, পুরনো মেলার ইতিহাস। সময় বদলেছে, আনন্দের উপকরণ বদলেছে—মুখের কসরতটি থেকে গিয়েছে।
ভেংচিরও ইতিহাস আছে
গার্নিংয়ের দীর্ঘ ঐতিহ্যের ইঙ্গিত মেলে আয়োজকদের সম্মানতালিকাতেও। মহিলাদের বিভাগে অ্যান উডসের নাম ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন বছরে বার বার দেখা যায়। অর্থাৎ এটি হঠাৎ মঞ্চে উঠে ভেংচি কাটার কোনও ক্ষণিকের কাণ্ড নয়। স্থানীয় পরিচিতি, প্রতিযোগিতার স্মৃতি এবং বার বার ফিরে আসার আকর্ষণও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
বিশ্লেষণ: হাসিরও একটা সীমারেখা
এই প্রতিযোগিতার মজা বোঝার জন্য একটি সীমা মনে রাখা জরুরি। কারও স্বাভাবিক মুখ নিয়ে বিদ্রুপ করা আর কেউ স্বেচ্ছায় নিজের মুখের অভিব্যক্তিকে অভিনয়ে বদলে দর্শককে হাসানো—দুই জিনিস এক নয়। এগরেমন্টের প্রতিযোগীরা দ্বিতীয় কাজটিই করেন।
ছবি প্রসঙ্গহীন ভাবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সেই পার্থক্য অবশ্য হারিয়ে যেতে পারে। তাই ছবির সঙ্গে প্রতিযোগিতার নাম, স্থান এবং তারিখও গুরুত্বপূর্ণ। নইলে শিল্পীর কসরত অচেনা মানুষের চেহারা নিয়ে নিছক ঠাট্টায় নেমে আসতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমে যেখানে প্রায় প্রতিটি ছবিই সুন্দর দেখানোর প্রতিযোগিতা, এগরেমন্ট সেখানে একেবারে উল্টো পথে হাঁটে। এখানে অভিব্যক্তিকে নিখুঁত করার বদলে সচেতন ভাবে যতটা সম্ভব অদ্ভুত করে তোলাই কৃতিত্ব। তাই এই উৎসবের নিয়মটা বেশ সহজ: মুখ বাঁকানো এখানে অসৌজন্য নয়, সেটিই আসল শিল্প।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



