স্বাস্থ্য

খাদ্যনালিতে প্রদাহ কিমের, বাবার ক্যানসারের ইতিহাসে কতটা উদ্বেগের কারণ

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ারঃ কিম কার্দাশিয়ানের খাদ্যনালিতে প্রদাহ বা ‘ইসোফেজাইটিস’ ধরা পড়েছে।
  • কারণ, তাঁর বাবা রবার্ট কার্দাশিয়ানের মৃত্যু হয়েছিল খাদ্যনালির ক্যানসারে।
  • কিন্তু খাদ্যনালিতে প্রদাহ হলেই কি ক্যানসারের আশঙ্কা করতে হবে?

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ারঃ কিম কার্দাশিয়ানের খাদ্যনালিতে প্রদাহ বা ‘ইসোফেজাইটিস’ ধরা পড়েছে। এই রোগনির্ণয়ে উদ্বিগ্ন তিনি। কারণ, তাঁর বাবা রবার্ট কার্দাশিয়ানের মৃত্যু হয়েছিল খাদ্যনালির ক্যানসারে। কিন্তু খাদ্যনালিতে প্রদাহ হলেই কি ক্যানসারের আশঙ্কা করতে হবে? পারিবারিক ইতিহাস থাকলে কতটা সতর্ক হওয়া প্রয়োজন?

আইএসআইসি মাল্টিস্পেশ্যালিটি হাসপাতালের পরিপাকতন্ত্র চিকিৎসা বিভাগের প্রধান চিকিৎসক শুভম বৎস জানাচ্ছেন, মুখ থেকে পাকস্থলীতে খাবার পৌঁছে দেয় যে নলটি, তার প্রদাহকেই বলা হয় ইসোফেজাইটিস। তিনি বলেন, ‘‘এটি বেশ পরিচিত সমস্যা। বিশেষত পাকস্থলীর অ্যাসিড উল্টো পথে খাদ্যনালিতে উঠে আসার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকলে। এই অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা জিইআরডি-তে সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ভোগেন।’’

খাদ্যনালির প্রদাহে জ্বালা, ব্যথা এবং গিলতে অসুবিধা হতে পারে। বৎসের ব্যাখ্যা, অন্য কোনও অসুস্থতা নেই, এমন প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এর সবচেয়ে সাধারণ কারণ অ্যাসিড রিফ্লাক্স। পাকস্থলীর অ্যাসিড বার বার খাদ্যনালিতে উঠে এসে তার ভিতরের আবরণে জ্বালা ও প্রদাহ সৃষ্টি করে।

অন্য কারণও থাকতে পারে। কিছু ব্যথার ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক খাদ্যনালিতে আটকে গিয়ে ক্ষতি করতে পারে। খাবারে অ্যালার্জি, ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং স্থূলতাও এই সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। চিকিৎসক আরও জানান, ঘন ঘন একসঙ্গে অনেকটা খাওয়া, ঝাল খাবার খাওয়া কিংবা খাওয়ার পরেই শুয়ে পড়ার মতো অভ্যাস অ্যাসিড রিফ্লাক্স বাড়িয়ে প্রদাহের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কিমের বয়স ৪৫। এই বয়সে রোগটি ধরা পড়ার কি আলাদা তাৎপর্য রয়েছে? চিকিৎসকের কথায়, ‘‘৪৫ বছর বয়সে ইসোফেজাইটিস ধরা পড়েছে বলেই রোগটি বেশি গুরুতর, এমন ধরে নেওয়া যায় না।’’ তবে এই বয়সের অনেকেরই দীর্ঘদিন ধরে অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা থাকতে পারে, যা তেমন লক্ষণ প্রকাশ করেনি কিংবা যার চিকিৎসা হয়নি। তাই খাদ্যনালিতে কোনও ক্ষতি হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। বয়স যা-ই হোক, দ্রুত চিকিৎসা শুরু হলে সাধারণত ফল ভাল হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ইসোফেজাইটিস মানেই খাদ্যনালির ক্যানসার নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে অ্যাসিড রিফ্লাক্স ও প্রদাহ চলতে থাকলে এবং চিকিৎসা না হলে খাদ্যনালির ভিতরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সময়ের সঙ্গে ঘা তৈরি হতে পারে, ক্ষত শুকিয়ে দাগ পড়তে পারে এবং খাদ্যনালি সরু হয়ে যেতে পারে। ফলে খাবার গেলা ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে। খাওয়াদাওয়ায় অসুবিধার কারণে কোনও কোনও রোগীর শরীরে জলের ঘাটতি বা পুষ্টির সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সঙ্গে ‘ব্যারেটস ইসোফেগাস’ নামে আর একটি সমস্যারও সম্পর্ক রয়েছে। এতে দীর্ঘদিন অ্যাসিডের সংস্পর্শে থাকার ফলে খাদ্যনালির স্বাভাবিক ভিতরের আবরণের কোষে পরিবর্তন ঘটে।

ব্যারেটস ইসোফেগাস নিজে ক্যানসার নয়। তবে এটি খাদ্যনালির ক্যানসারের একটি স্বীকৃত ঝুঁকির কারণ। সামগ্রিকভাবে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি কমই থাকে। তা সত্ত্বেও নিয়মিত নজরদারি এবং অ্যাসিড রিফ্লাক্স কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রেক্ষাপটে বাবার ক্যানসারের ইতিহাস নিয়ে কিমের উদ্বেগকে একেবারে অপ্রাসঙ্গিক বলা যায় না। বৎস বলেন, ‘‘পরিবারে খাদ্যনালির ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে, বিশেষত বাবা বা মায়ের মতো নিকটাত্মীয়ের এই রোগ হয়ে থাকলে, বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।’’

তবে পারিবারিক ইতিহাস থাকলেই যে কারও ক্যানসার হবে, তা নয়। কারও খাদ্যনালিতে প্রদাহের পাশাপাশি পরিবারে এই ক্যানসারের উল্লেখযোগ্য ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকেরা আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণ, অ্যাসিড রিফ্লাক্সের উপসর্গ আরও ভালভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন বিচার করে নির্দিষ্ট সময় অন্তর খাদ্যনালি ও পাকস্থলীর এন্ডোস্কোপি করার পরামর্শ দিতে পারেন। উদ্দেশ্য, খাদ্যনালিতে কোনও প্রাথমিক পরিবর্তন হলে তা দ্রুত শনাক্ত করা।

কোন লক্ষণগুলি অবহেলা করা উচিত নয়? বার বার বা দীর্ঘস্থায়ী বুকজ্বালা, বুকের মধ্যে পোড়া পোড়া অনুভূতি, গিলতে অসুবিধা কিংবা ব্যথা, গলা বা বুকের মধ্যে খাবার আটকে আছে বলে মনে হওয়া—এসবই নজরে রাখা প্রয়োজন। চিকিৎসকের কথায়, অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যা মৃদু এবং চিকিৎসাযোগ্য। কিন্তু উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকলে তা উপেক্ষা করা উচিত নয়, কারণ দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ খাদ্যনালির ক্ষতি করতে পারে।

চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের কারণের উপর। অ্যাসিড কমানোর ওষুধ, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, অথবা সংক্রমণ কিংবা অ্যালার্জির চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। উপসর্গ তীব্র হলে, বার বার ফিরে এলে, চিকিৎসাতেও না কমলে কিংবা তার সঙ্গে গিলতে অসুবিধা, রক্তপাত বা অকারণে ওজন কমার মতো লক্ষণ থাকলে এন্ডোস্কোপির পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।

ইসোফেজাইটিস ধরা পড়লে বৎসের পরামর্শ, একবারে অনেকটা না খেয়ে অল্প পরিমাণে খাওয়া, নিজের ক্ষেত্রে যে খাবারে অ্যাসিড রিফ্লাক্স বাড়ে তা এড়ানো এবং খাওয়ার পর অন্তত দু’ থেকে তিন ঘণ্টা না শোয়া। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান এড়ানো এবং চিকিৎসকের নির্দেশমতো ওষুধ খাওয়াও জরুরি।

কিমের ক্ষেত্রে বাবার অসুস্থতার স্মৃতি তাঁর ও পরিবারের উদ্বেগ বাড়াতে পারে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পার্থক্যটি স্পষ্ট: ইসোফেজাইটিস হল খাদ্যনালির প্রদাহ, আর খাদ্যনালির ক্যানসার একটি পৃথক রোগ। প্রদাহের কারণ খুঁজে বার করা এবং দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গের চিকিৎসা করাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু প্রদাহ ধরা পড়েছে বলে ক্যানসার হয়েছে ধরে নেওয়ার কারণ নেই।

মূল প্রতিবেদনের পরামর্শ: এই লেখা প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য ও বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনও নতুন অভ্যাস বা চিকিৎসা শুরু করার আগে নিজের চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles