নামেই লুকিয়েছিল!

যা জানা জরুরি
- প্রতিবেদন: গাছের ডালে শরীর মিশিয়ে চোখের আড়ালে থাকাই কাঠিপোকার স্বভাব।
- কিন্তু উত্তর কুইন্সল্যান্ডের নতুন শনাক্ত প্রজাতি Anchiale robusta যেন সেই কৌশলেই বিজ্ঞানীদেরও বহু দিন বোকা বানিয়েছে।
- বিজ্ঞানী, সংগ্রাহক এবং পোকাপ্রেমীদের সামনে বছরের পর বছর ঘুরলেও এত দিন এটি পরিচিত ছিল অন্য একটি প্রজাতির নামে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রতিবেদন: গাছের ডালে শরীর মিশিয়ে চোখের আড়ালে থাকাই কাঠিপোকার স্বভাব। কিন্তু উত্তর কুইন্সল্যান্ডের নতুন শনাক্ত প্রজাতি Anchiale robusta যেন সেই কৌশলেই বিজ্ঞানীদেরও বহু দিন বোকা বানিয়েছে। বিজ্ঞানী, সংগ্রাহক এবং পোকাপ্রেমীদের সামনে বছরের পর বছর ঘুরলেও এত দিন এটি পরিচিত ছিল অন্য একটি প্রজাতির নামে। ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক গবেষণায় অস্ট্রেলীয় গবেষকেরা জানালেন, বহুল নথিবদ্ধ এই কাঠিপোকাটির আসল পরিচয় এত দিন ভুল ছিল।
সন্দেহটা তৈরি হয় মাঠসমীক্ষাতেই। দেখতে প্রায় একই রকম হলেও কয়েকটি গোষ্ঠীর শরীরের গঠন এবং বাসস্থানে বেশ কিছু পার্থক্য চোখে পড়ে। সেই ধাঁধার সমাধানে গবেষকেরা একসঙ্গে কাজে লাগান ডিএনএ বিশ্লেষণ, জাদুঘরে সংরক্ষিত পুরনো নমুনা, নাগরিক-বিজ্ঞানীদের ছবি ও অবস্থানের তথ্য এবং নতুন করে করা মাঠসমীক্ষা। অর্থাৎ, একটি নতুন পোকা হাতে পেয়েই নতুন নাম দেওয়া হয়নি; বহু বছরের জমা তথ্য মিলিয়ে পুরনো পরিচয়ই নতুন করে খতিয়ে দেখা হয়েছে।
Anchiale robusta-র স্ত্রী পোকা সাধারণত ১২ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার লম্বা, পুরুষের দৈর্ঘ্য ৯ থেকে ১০ সেন্টিমিটার। অধিকাংশের ডানা কালো। তবে কারও কারও পশ্চাৎডানার নিচে দেখা যায় বেগুনি আভা। ডিমের ভারে স্ত্রী পোকা এতটাই ভারী হয়ে উঠতে পারে যে তার উড়তে পারা বিরল। পাতার সঙ্গে মিশে থাকা শান্ত শরীরটি অবশ্য বিপদের মুখে অন্য চেহারা নেয়—ডানা মেলে হঠাৎ উজ্জ্বল রঙ দেখিয়ে শিকারিকে চমকে দিতে পারে।
নাম পেল মাবি অরণ্যও
গবেষণায় উঠে এসেছে আরও একটি নতুন প্রজাতি—Anchiale mabiensis। কুইন্সল্যান্ডের অ্যাথারটন মালভূমির অতি বিপন্ন মাবি বর্ষাবনই তার বাসস্থান। স্ত্রী পোকা প্রায় ১১–১২ সেন্টিমিটার লম্বা। তার ডিমেও রয়েছে বিশেষত্ব—একটি আলাদা হয়ে যাওয়া ঢাকনার মতো অংশ থাকে, যা খুলেই ডিম থেকে বেরিয়ে আসে ছানা। প্রজাতির নামটিও সেই মাবি অরণ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তবে গল্প এখানেই শেষ নয়। গবেষকেরা তৃতীয় একটি প্রজাতির অস্তিত্বও নিশ্চিত করেছেন। আগে যে পরিসরে মাত্র দু’টি প্রজাতি রয়েছে বলে মনে করা হত, বিশ্লেষণে সেখানেই পাওয়া গেছে মোট পাঁচটি পৃথক প্রজাতি। তাদের বিস্তার উত্তর নিউ সাউথ ওয়েলস থেকে উষ্ণমণ্ডলীয় উত্তর কুইন্সল্যান্ড পর্যন্ত। কেপ ইয়র্কের আরও একটি গোষ্ঠী নতুন প্রজাতি হতে পারে বলে সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত নমুনা না থাকায় আপাতত তার কোনও নাম দেওয়া হয়নি।
চেহারা এক, প্রজাতি আলাদা
এই অপেক্ষা করাটাই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ছবিতে রঙের সামান্য তফাত দেখলেই নতুন প্রজাতি ঘোষণা করা যায় না। বয়স, লিঙ্গ, খাবার এবং পরিবেশের প্রভাবেও প্রাণীর চেহারা বদলাতে পারে। আবার বাইরে থেকে দেখতে একই রকম দুটি প্রাণীর ডিএনএ, প্রজননক্ষমতা কিংবা ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতায় বড় পার্থক্য থাকতে পারে। তাই আধুনিক শ্রেণিবিন্যাসে শরীরের গঠন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ আণবিক তথ্য।
নাম বদলালে বদলায় সংরক্ষণও
এখানেই নতুন নামের আসল গুরুত্ব। একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ‘এক’টি প্রজাতি আসলে যদি পাঁচটি ছোট ছোট এলাকায় সীমাবদ্ধ পৃথক প্রজাতির সমষ্টি হয়, তা হলে প্রত্যেকটির বিলুপ্তির ঝুঁকি আগের হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। বিশেষ করে মাবি বর্ষাবনের মতো আবাস কৃষি, আগাছা, বনভূমির খণ্ডীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে থাকলে আলাদা প্রজাতির জন্য আলাদা সংরক্ষণ পরিকল্পনার প্রয়োজন হতে পারে।
এই গবেষণায় নাগরিক-বিজ্ঞানীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের ছবি এবং অবস্থানের তথ্য মিলিয়ে তৈরি হয়েছে কোথায়, কখন এই কাঠিপোকাগুলিকে দেখা গেছে তার বিস্তৃত মানচিত্র। যদিও বিশেষজ্ঞের যাচাই ছাড়া ছবির ভিত্তিতে প্রজাতির পরিচয় চূড়ান্ত করা যায় না।
আর জাদুঘরের পুরনো নমুনাগুলিও দেখিয়েছে, সংরক্ষিত সংগ্রহ শুধু অতীতের স্মৃতি নয়। নতুন প্রযুক্তি হাতে এলে বহু দশক আগের সেই নমুনাই নতুন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।
কাঠিপোকা এত দিন লুকিয়ে ছিল গাছের ডালে। তার ভুল পরিচয়ও লুকিয়ে ছিল মানুষের দেওয়া নামের আড়ালে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



