Table of Contents
হাইলাইটস:
- পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত আমেরিকা–ইরান সমঝোতা স্মারকের (MoU) সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ এখন অনুচ্ছেদ ৫।
- এই ধারার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা।
- কিন্তু আমেরিকা ও ইরান একই ধারার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে।
- এক পক্ষের অভিযোগ, অন্য পক্ষ চুক্তি ভেঙে সামরিক অভিযান চালিয়েছে।
- এর জেরে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন আক্রমণ ও নৌ-সংঘর্ষ শুরু হয়েছে।
- বিশ্ব তেলের বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাস্ফিয়ার: মাত্র কয়েক দিন আগেই মনে হয়েছিল, দীর্ঘ উত্তেজনার পর অবশেষে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সংঘাত প্রশমনের পথ খুলেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বা মেমোরান্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (MoU) দুই দেশের মধ্যে সীমিত হলেও একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতির ভিত্তি তৈরি করেছিল।
কিন্তু সেই আশাবাদ খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক দিনের মধ্যেই পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী অঞ্চলে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ, মার্কিন বাহিনীর ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা এবং তার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটির বিরুদ্ধে ইরানের পাল্টা আঘাত পরিস্থিতিকে আবারও অস্থির করে তুলেছে।
এই নতুন সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে চুক্তির অনুচ্ছেদ ৫।
অনুচ্ছেদ ৫-এ কী বলা হয়েছে?
সমঝোতা স্মারকের অনুচ্ছেদ ৫ মূলত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী আবার নিরাপদ ও স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়ার রূপরেখা নির্ধারণ করে।
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে এই পথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
অনুচ্ছেদ ৫-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল—
- বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করা,
- আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা,
- সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে আনা,
- এবং দুই পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে একটি যৌথ সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
বিতর্ক কোথায়?
সমস্যা শুরু হয়েছে এই ধারার ভাষা ব্যাখ্যা করা নিয়ে।
আমেরিকার দাবি, চুক্তি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে চলাচলের নিশ্চয়তা দিতে হলে মার্কিন নৌবাহিনীর টহল ও প্রয়োজনে সামরিক উপস্থিতি বৈধ।
অন্যদিকে ইরানের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তেহরানের মতে, চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল উত্তেজনা কমানো, নতুন করে বিদেশি সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো নয়। তাদের দাবি, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও নজরদারি অভিযানই চুক্তির চেতনার পরিপন্থী।
ফলে একই ধারাকে দুই দেশ সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে ব্যাখ্যা করছে।
কীভাবে নতুন সংঘর্ষ শুরু হল?
সপ্তাহান্তে কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ, ইরান-সমর্থিত বাহিনী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে এবং নৌপথকে আবারও অচল করার চেষ্টা করেছে।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে আমেরিকা ইরানের কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
এরপর ইরান পাল্টা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
অর্থাৎ, যে অনুচ্ছেদ যুদ্ধ থামানোর জন্য তৈরি হয়েছিল, সেটিই এখন নতুন সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুই পক্ষের অভিযোগ
আমেরিকার বক্তব্য
- ইরান বাণিজ্যিক জাহাজকে হুমকি দিয়েছে।
- আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত করেছে।
- তাই আত্মরক্ষা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রক্ষার জন্য সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ইরানের বক্তব্য
- আমেরিকা অনুচ্ছেদ ৫ লঙ্ঘন করে যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি বাড়িয়েছে।
- মার্কিন হামলাই প্রথম চুক্তিভঙ্গ।
- ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল আত্মরক্ষামূলক।
কেন হরমুজ এত গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ‘চোক পয়েন্ট’-গুলির একটি।
সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে রপ্তানি হওয়া বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই সরু জলপথ দিয়েই বিশ্ববাজারে পৌঁছায়।
প্রণালীটি বন্ধ হয়ে গেলে—
- আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে,
- এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে,
- পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে,
- এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
এই কারণেই হরমুজের নিরাপত্তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের বিষয় নয়; এটি কার্যত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতার ভবিষ্যৎ কী?
১৭ জুনের সমঝোতা পাকিস্তানের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
কিন্তু চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারাটিই যদি দুই পক্ষ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে, তাহলে সেই সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির ভাষা আরও স্পষ্ট না হলে অথবা একটি যৌথ তদারকি ব্যবস্থা কার্যকর না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের বিরোধ দেখা দিতে পারে।
বিশ্ব কী দেখছে?
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন দুটি বিষয় নিয়ে—
প্রথমত, হরমুজ প্রণালী আবার সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে কি না।
দ্বিতীয়ত, সীমিত সংঘর্ষ বড় আকারের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয় কি না।
বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলি ইতিমধ্যেই পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। কারণ সামরিক উত্তেজনা যত বাড়বে, তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও তত বাড়বে।
উপসংহার
আমেরিকা ও ইরানের সর্বশেষ সংঘাত দেখিয়ে দিল, যুদ্ধবিরতি চুক্তি শুধু স্বাক্ষর করলেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। চুক্তির প্রতিটি ধারা, বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ৫-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধান, ভয় পক্ষের কাছে একই অর্থ বহন না করলে সংঘর্ষ যে কোনো সময় ফিরে আসতে পারে।
হরমুজ প্রণালী শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ধমনী। সেই ধমনীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যদি আবার সামরিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তবে তার অভিঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—প্রভাব পড়বে বিশ্বের প্রতিটি দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং কূটনীতিতে।