লাভেনিল ভালারিভান, সোনম মাস্কর ও বিদর্শা বিনোদ—শুটিংয়ে আসার পথ তিন জনের তিন রকম। সেই আলাদা পথই রবিবার এসে মিশল এক মঞ্চে। জাপানের নাগোয়ায় মেয়েদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের দলগত বিভাগে রুপো জিতে ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমসে ভারতের পদকযাত্রার সূচনা করলেন তাঁরা।

ভারতীয় শুটিংয়ে প্রতিভার ভাণ্ডার কতটা সমৃদ্ধ হয়েছে, তারই যেন প্রতিচ্ছবি এই দল। এলাভেনিলের অভিজ্ঞতা, সোনমের সাম্প্রতিক উত্থান আর বিদর্শার হাল না-ছাড়ার জেদ—তিনে মিলে এল প্রথম পদক। গেমস শুরুর আগে রাইফেল কোচ দীপালি দেশপাণ্ডে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে বলেছিলেন, “রাইফেল ও পিস্তলের বিভিন্ন বিভাগে আমাদের এত ভাল খেলোয়াড় রয়েছেন যে, শুধু এশিয়ায় নয়, বিশ্বেও ভারত শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। সেই কারণেই এশিয়ান গেমসে শুটিংয়ের অধিকাংশ দলগত বিভাগে পদকের আশা করতে পারি আমরা।”

তিন পদকজয়ীর জীবনেও ধরা রয়েছে সেই শক্তির উৎস।

এলাভেনিলের জীবনে শুটিং আসার কথাই ছিল না। তামিলনাড়ুর কুড্ডালোরে জন্ম, বড় হওয়া আমদাবাদে। অ্যাথলেটিক্স-সহ নানা খেলায় হাত পাকিয়েছিলেন। তার পরে হঠাৎ এক দিন শুটিং রেঞ্জে গিয়ে বদলে গেল জীবনের অভিমুখ। এক পরিচিতের মেয়ে শুটিং করতেন। তিনিই এলাভেনিলকে রাইফেল হাতে নিয়ে চেষ্টা করে দেখতে বলেন। সেই রাইফেল তিন মাসের জন্য ধার নিয়ে অনুশীলন শুরু করেন কিশোরী।

বাড়িতে খেলাধুলোর বিশেষ কোনও ঐতিহ্য ছিল না। বাবা-মা দু’জনেই শিক্ষাজগতের মানুষ; বাবা বিজ্ঞানী। এলাভেনিল নিজেও এক সময়ে বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু ধার করা রাইফেলই শেষ পর্যন্ত ঠিক করে দিল তাঁর জীবনের লক্ষ্য। পনেরো বছর বয়সের মধ্যেই শুটিংকে গুরুত্ব দিয়ে নিতে শুরু করেন তিনি। জেলা প্রতিযোগিতায় এক দিন যাঁর স্কোর ছিল ৪০০-র মধ্যে মাত্র ১২৮, সেই মেয়েই পরে জুনিয়র বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হন, দু’বার অলিম্পিকে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

২৭ বছরের এলাভেনিলই এই দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ সদস্য। অলিম্পিক, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ—বড় মঞ্চের অভিজ্ঞতা যেমন তাঁর রয়েছে, তেমনই জানেন প্রত্যাশার চাপ সামলাতে হয় কী ভাবে। রবিবার ৬৩৩.৫ স্কোর করে তিনিই ভারতের রুপো নিশ্চিত করেন। আয়োজক জাপানের থেকে অল্প ব্যবধানে এগিয়ে শেষ করে ভারত।

এলাভেনিলের আগে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজটি করেছিলেন সোনম। ৬৩৪.১ স্কোর করে তিন ভারতীয়ের মধ্যে তিনিই সেরা। চব্বিশ বছরের সোনমের শুটিংয়ে আসাটাও নেহাত শখের বশে।

২০১৮ সালে মুম্বইয়ের একটি কলেজে বাণিজ্য নিয়ে পড়ার সময়ে নতুন কিছু করতে চাইছিলেন তিনি। দাবা খেলতেন, খেলাধুলোর প্রতি টানও ছিল। ঠিক করলেন, শুটিংয়ে হাতেখড়ি হোক। সেই শখই এক সময়ে হয়ে উঠল পেশা।

তবে তার জন্য বড় মূল্য দিতে হয়েছে পরিবারকে। সোনমের যখন উন্নত মানের রাইফেল ও সরঞ্জাম প্রয়োজন, ঠিক তখনই অতিমারির ধাক্কায় পরিবারের আর্থিক অবস্থা নড়বড়ে। মেয়ের স্বপ্ন যাতে থেমে না যায়, সে জন্য পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রি করে দেন বাবা উত্তম মাস্কর। সেই টাকায় কেনা হয় রাইফেল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

সোনম বলেন, “বাবা ওই সিদ্ধান্ত না নিলে এত দূর পৌঁছনোর কথা ভাবতেই পারতাম না। ওটা বিরাট ত্যাগ ছিল। তার পর আর থামিনি।”

২০২১ সালে কোলহাপুরের রেঞ্জে পুরোদমে অনুশীলন শুরু করেন সোনম। কয়েক বছরের মধ্যেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের পরিচয় গড়ে তোলেন। আন্তর্জাতিক শুটিং সংস্থার বিশ্বকাপেও পদক জিতেছেন তিনি।

তৃতীয় সদস্য বিদর্শার পথটি সম্ভবত সবচেয়ে ব্যতিক্রমী।

কোঝিকোড়ের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছেন বিদর্শা। ২০১৮ সালে এনসিসি-র মাধ্যমে প্রথম রাইফেল হাতে নেন। খেলাটি ভাল লেগেছিল। পাশাপাশি, শুটিংয়ের সূত্রে সরকারি চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনাও মাথায় ছিল। কিন্তু কেরলের রাজ্য চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরেও নিজের রাইফেল কেনার সামর্থ্য ছিল না পরিবারের। ধার করা সরঞ্জামেই চলত অনুশীলন। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালে ঋণ নিয়ে তাঁর প্রথম রাইফেলটি কিনে দেয় পরিবার।

এর পর আরও এক বড় সিদ্ধান্ত। কেরল ও পরিবারকে ছেড়ে দিল্লিতে চলে আসেন বিদর্শা। লক্ষ্য, ডক্টর কর্ণি সিং শুটিং রেঞ্জে অনুশীলন। হিন্দি পর্যন্ত বলতে পারতেন না তখন। নিজে রান্না করতেন, ঘরের কাজ সামলাতেন, আর দিনে দু’বেলা অনুশীলনে যেতেন।

২০২৪ সালের গোড়ায় চাপ প্রায় অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। দলে ঢোকার জন্য প্রয়োজনীয় নম্বরে পৌঁছতে পারছিলেন না। অথচ তাঁর জন্য পরিবার এত ত্যাগ করেছে। খেলা ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবতে শুরু করেছিলেন। সেই সময়ে তাঁকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছেন স্বামী তথা প্রাক্তন শুটার মনু এস রবি এবং কোচ মনোজ কুমার।

শেষ পর্যন্ত ভারতীয় ক্রীড়া কর্তৃপক্ষের জাতীয় উৎকর্ষ কেন্দ্রে জায়গা পান বিদর্শা। সেখানে সরঞ্জাম, পুষ্টি ও প্রশিক্ষণের সহায়তা মেলায় কিছুটা কমে আর্থিক দুশ্চিন্তা—যে দুশ্চিন্তা এত দিন তাঁর শুটিংজীবনের সঙ্গী হয়ে ছিল।

সেই বিদর্শাই এ বার এশিয়ান গেমসে দাঁড়ালেন এক অলিম্পিয়ান ও এক বিশ্বকাপ পদকজয়ীর পাশে। মনোজের কথায়, “ওর কাছে যা প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ করেছে। ওর বেশি দখল তিন ভঙ্গিতে রাইফেল শুটিংয়ে। ফলে আরও একটি পদক জেতার সুযোগ রয়েছে।”

রবিবারের রুপো তাই শুধু তিন জনের স্কোরের যোগফল নয়। তিনটি ভিন্ন পটভূমি, তিনটি আলাদা পথ পেরিয়ে নাগোয়ায় ভারতের প্রথম পদক।