রাশিয়ার তেল কিনলে ভারতের জন্য শাস্তির হুমকি, অথচ নিজেদের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে রুশ ইউরেনিয়াম কেনার দরজা খোলা রাখছে আমেরিকা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন নিষেধাজ্ঞা আইন ঘিরে এই দ্বিচারিতাই সামনে এসেছে। দিল্লিতে আইনটিকে দেখা হচ্ছে বাণিজ্য আলোচনার মধ্যে ভারতের উপর চাপ বাড়ানোর আর একটি হাতিয়ার হিসেবে।

১৮ সেপ্টেম্বর ট্রাম্পের স্বাক্ষরিত ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট, ২০২৬’ রুশ তেল ও গ্যাসের প্রধান ক্রেতাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে। ফলে ভারত ও চিনের মতো দেশ ঝুঁকিতে পড়েছে। তবে আইন তৈরি হওয়া মানেই ভারতের সমস্ত পণ্যে এখনই ওই হারে শুল্ক বসে যাওয়া নয়। প্রয়োগের ধরন, হার এবং ছাড়ের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের হাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা রয়েছে।

এই আইনেই আমেরিকার স্বল্পসমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমদানিকে সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রির আয় কমানোর ঘোষিত লক্ষ্যের মধ্যেও নিজেদের প্রয়োজনের জন্য ব্যতিক্রম রেখেছে ওয়াশিংটন। রাশিয়া থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমদানির মূল্য ২০২২ সালের প্রায় ৮৩ কোটি ডলার থেকে ২০২৫ সালে প্রায় ১০৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বৃদ্ধি ২৩.৭৫ শতাংশ।

ভারত সরকারের প্রকাশ্য অবস্থান অবশ্য অনড়। বিদেশ প্রতিমন্ত্রী কীর্তিবর্ধন সিংহ জানিয়েছেন, দেশের মানুষের স্বার্থ এবং স্বাধীন বিদেশনীতি অনুসারেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। জ্বালানি যেখানে বাণিজ্যিকভাবে সাশ্রয়ী, ভারত সেখান থেকেই কিনবে। অন্য দেশের চাপে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্ন নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।

আমেরিকার সমস্যাটি বুঝতে তার পরমাণু জ্বালানির জোগান দেখতে হবে। সম্ভাব্য ঘাটতি এড়াতে মার্কিন জ্বালানি দফতর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষমতা দ্রুত বাড়াতে দেশি ও বিদেশি সংস্থাগুলিকে তাগিদ দিচ্ছে। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারও সেই চাহিদা বৃদ্ধির একটি কারণ।

তবে ইউরেনিয়ামের ক্ষেত্রে আমেরিকায় কোনও বিধিনিষেধই নেই, এমন দাবি ঠিক হবে না। রুশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের উপর আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সঙ্গে সাময়িক ছাড়ের ব্যবস্থা। সেই ছাড়ের মেয়াদ ২০২৮ সালে শেষ হওয়ার কথা। নতুন আইনের ব্যতিক্রম এবং আগের নিষেধাজ্ঞার এই কাঠামো আলাদা করে বোঝা প্রয়োজন।

ভারতের অসুবিধাও বাস্তব। জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা কেপলারের হিসাবে, অগস্টে ভারত প্রতিদিন ২০.৮ লক্ষ ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করেছে, যা মোট তেল আমদানির ৪৫ শতাংশ। পশ্চিম এশিয়ার সংকটে সরবরাহ এমনিতেই চাপে। এই অবস্থায় বিপুল পরিমাণ রুশ তেলের বিকল্প দ্রুত খুঁজে পাওয়া কঠিন।

দিল্লির উদ্বেগের আর একটি কারণ অতীত অভিজ্ঞতা। ২০২৫ সালের অগস্টে রুশ তেল কেনার জন্য ভারতীয় পণ্যে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছিল আমেরিকা; চিনের ক্ষেত্রে একই ব্যবস্থা নেয়নি। ভারতের উপর সেই বাড়তি শুল্ক উঠেছিল ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ফলে এবারও প্রয়োগে বৈষম্য থাকবে কি না, প্রশ্ন উঠছে।

ভারত ও আমেরিকার বাণিজ্যচুক্তির আলোচনা শেষ পর্যায়ে। চিনের সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপের আশঙ্কায় ওয়াশিংটন দিল্লির উপর তুলনায় বেশি চাপ দিতে পারে, এমন ধারণাও রয়েছে ভারতের বাণিজ্যনীতি মহলে। তবে এটি সংশ্লিষ্ট মহলের মূল্যায়ন; ভারতের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তার এখনও পর্যন্ত নিশ্চিত ঘোষণা নয়।

এই তথ্যগুলি থেকে স্পষ্ট, বিরোধের কেন্দ্রে শুধু রাশিয়াকে শাস্তি দেওয়ার নীতি নেই; রয়েছে কার জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা গুরুত্ব পাবে, সেই প্রশ্নও। নিজের প্রয়োজন মেটাতে ব্যতিক্রম রাখলে অন্য দেশের একই যুক্তি অগ্রাহ্য করার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়। ভারতের সামনে তাই দ্বিমুখী পরীক্ষা: সাশ্রয়ী তেলের জোগান বজায় রাখা এবং মার্কিন বাজারে রফতানির স্বার্থ রক্ষা করা। শুল্কের হুমকি বাণিজ্য আলোচনায় কতটা ছাড় আদায় করতে ব্যবহৃত হয়, নজর থাকবে সেখানেই।

রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা আইনে ট্রাম্পের সই, ভারতের সামনে ১০০ শতাংশ শুল্কের খাঁড়া