বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

ল্যাবে নামল অ্যানথ্রপিক

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • প্রতিবেদন কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তা সংস্থা অ্যানথ্রপিক সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকায় একটি জীববিজ্ঞানের পরীক্ষাগার তৈরি করেছে।
  • ১৮ সেপ্টেম্বর সংস্থার জীবনবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান এরিক কাউডেরার-আব্রামস পরীক্ষাগারটির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেন।
  • এত দিন জীববিজ্ঞানে বড় ভাষা-মডেলের ব্যবহার মূলত গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ, প্রোটিনের সম্ভাব্য গঠন নির্ণয় বা পরীক্ষার পরিকল্পনা তৈরিতে সীমাবদ্ধ ছিল।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

প্রতিবেদন

কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তা সংস্থা অ্যানথ্রপিক সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকায় একটি জীববিজ্ঞানের পরীক্ষাগার তৈরি করেছে। ১৮ সেপ্টেম্বর সংস্থার জীবনবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান এরিক কাউডেরার-আব্রামস পরীক্ষাগারটির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেন। এত দিন জীববিজ্ঞানে বড় ভাষা-মডেলের ব্যবহার মূলত গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ, প্রোটিনের সম্ভাব্য গঠন নির্ণয় বা পরীক্ষার পরিকল্পনা তৈরিতে সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন উদ্যোগে সেই কম্পিউটার-নির্ভর পরামর্শকে বাস্তব কোষ, প্রোটিন ও রাসায়নিক পরীক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তবে অ্যানথ্রপিকের বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমারেখা রয়েছে। সংস্থার মুখপাত্র জানিয়েছেন, নিজস্ব পরীক্ষাগারটি সরাসরি ওষুধ আবিষ্কারের কেন্দ্র নয়। অন্যদিকে কাউডেরার-আব্রামস বিরল ও বাণিজ্যিকভাবে উপেক্ষিত রোগ নিয়ে প্রাক্‌-ক্লিনিক্যাল গবেষণা চালানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কোন রোগ, অণু বা পরীক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং কাজ কত দূর এগিয়েছে, তা এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

পরিকল্পনার একটি অংশ হল ক্লড মডেলকে পরীক্ষাগারের যন্ত্র ও রোবট পরিচালনায় ব্যবহার করা। অ্যানথ্রপিক আগস্টে এমন একটি প্রযুক্তিগত মান প্রকাশ করেছে, যার সাহায্যে কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষাগারের যন্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। পরীক্ষার পরিকল্পনা, যন্ত্র চালানো, ফলাফল বিশ্লেষণ এবং পরবর্তী ধাপ নির্ধারণের কিছু কাজ দ্রুত করাই লক্ষ্য। সংস্থার দাবি, পুরো প্রক্রিয়ায় মানুষের তত্ত্বাবধান বজায় থাকবে।

কিন্তু ওষুধ তৈরির বাস্তব পথ কোনওভাবেই এত সরল নয়। পরীক্ষাগারে কোনও অণু আশাব্যঞ্জক ফল দিলেও প্রাণী-পরীক্ষা, বিষক্রিয়া যাচাই এবং একাধিক পর্যায়ের মানব-পরীক্ষায় অধিকাংশ সম্ভাব্য ওষুধ ব্যর্থ হয়। অ্যানথ্রপিক এখনও মানুষের উপর পরীক্ষা চালাচ্ছে না। ফলে পরীক্ষাগার স্থাপনকে নতুন চিকিৎসা আবিষ্কারের সমতুল্য বলা যাবে না।

সংস্থাটি কোয়েফিশিয়েন্ট বায়ো অধিগ্রহণ করেছে এবং রোশের জেনেনটেক, ব্রিস্টল মায়ার্স স্কুইব ও নভো নর্ডিস্কের মতো ওষুধ প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে কাজ করছে। এখানেই উঠছে আরেকটি প্রশ্ন: একই কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তা সরবরাহকারী যখন একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থার গবেষণায় যুক্ত, তখন তাদের গোপন তথ্য কীভাবে আলাদা রাখা হবে? অ্যানথ্রপিকের দাবি, গ্রাহকের উপাত্ত পৃথক ও সুরক্ষিত থাকবে। তবে স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষার বিস্তারিত এখনও প্রকাশিত হয়নি।

জীববিজ্ঞানে কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তার দ্বৈত ব্যবহারও উদ্বেগের বিষয়। রোগের লক্ষ্য শনাক্ত করা বা প্রোটিন নকশার কাজে ব্যবহৃত একই জ্ঞান ক্ষতিকর জীবাণুর ক্ষমতা বাড়াতেও অপব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যানথ্রপিক নিজেই আগে জানিয়েছে, উন্নত মডেল কিছু ক্ষেত্রে জৈবিক হুমকি তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। তাই পরীক্ষাগারে প্রবেশাধিকার, মডেলের অনুমতি এবং সন্দেহজনক নির্দেশ আটকে দেওয়ার নিয়মের প্রকাশ্য মূল্যায়ন জরুরি।

বিশ্লেষণ

অ্যানথ্রপিকের উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক কোনও ঘোষিত ওষুধ নয়। বরং কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তা সংস্থার ভূমিকা সফটওয়্যার সরবরাহকারী থেকে পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান পরিচালনার দিকে এগোচ্ছে। স্বয়ংক্রিয়তা একসঙ্গে বেশি পরীক্ষা চালানোর সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু ভুল অনুমানও একই গতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মডেল কোনও পরীক্ষাকে যুক্তিসঙ্গত বলেছে—এটি নিজে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়।

অ্যানথ্রপিক যদি বিরল রোগের মতো কম লাভজনক ক্ষেত্রে যাচাইযোগ্য ফল প্রকাশ করে, উদ্যোগটির সামাজিক গুরুত্ব থাকতে পারে। কিন্তু রোগের নাম, পরীক্ষার নকশা, নেতিবাচক ফল এবং নিরাপত্তা-নিরীক্ষা গোপন রেখে শুধু ‘দশ গুণ দ্রুত বিজ্ঞান’-এর ভাষা ব্যবহার করলে তা বৈজ্ঞানিক সাফল্যের বদলে বাণিজ্যিক দাবি হয়। প্রকৃত মাপকাঠি হবে সহকর্মী-পর্যালোচিত গবেষণা, স্বাধীন পুনরাবৃত্তি এবং শেষ পর্যন্ত রোগীর নিরাপত্তা।


রোবটের দেহ, বুদ্ধি কাঁচা

প্রতিবেদন

মানুষের কথা শুনে একাধিক ধাপের শারীরিক কাজ করতে পারা রোবট ২০২৭ সালের মাঝামাঝি তৈরি হতে পারে বলে দাবি করেছেন চীনা স্টার্টআপ স্পিরিট এআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিজ্ঞানী গাও ইয়াং। ১৮ সেপ্টেম্বর বেজিংয়ে সংস্থার কার্যালয়ে তিনি এই সময়সীমার কথা জানান। তাঁর মতে, দৌড়ানো, নাচা বা প্রদর্শনীমূলক কসরতের হার্ডওয়্যার দ্রুত উন্নত হলেও রোবটের আসল দুর্বলতা তার ‘মস্তিষ্ক’—অপরিচিত পরিস্থিতি বুঝে উপযুক্ত কাজ বেছে নেওয়ার সফটওয়্যার।

স্পিরিট এআইয়ের কর্মীসংখ্যা প্রায় ৩০০। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর সংস্থাটি ৬৭ কোটি ডলারের বেশি মূলধন তুলেছে এবং ঘোষিত মূল্যায়ন ২৯০ কোটি ডলার। ব্যাটারি নির্মাতা সিএটিএল ও খুচরো বিক্রেতা জেডি ডটকমের উৎপাদনকেন্দ্রে তাদের কয়েক ডজন চাকাযুক্ত মোজ-১ মানবাকৃতি রোবট কাজ করছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। জেডি ডটকম একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীও।

রোবটকে বাস্তব কাজ শেখাতে প্রায় এক হাজার চুক্তিভিত্তিক কর্মী শরীরে সংবেদক পরে বাড়ি ও কারখানায় মানুষের নড়াচড়ার উপাত্ত সংগ্রহ করছেন। বেজিংয়ের প্রশিক্ষণকেন্দ্রে দরজা খোলা, ফ্রিজ ব্যবহার, তালা খোলা এবং ছুরি দিয়ে সবজি কাটার মতো কাজ বারবার রেকর্ড করা হচ্ছে। মানুষের হাতের অবস্থান, প্রয়োগ করা বল এবং কাজের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করে মডেল সম্ভাব্য পদক্ষেপ শেখে।

গাওয়ের দাবি, সাজানো বসার ঘরের মতো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সাধারণ কাজের সাফল্যের হার ৯০ শতাংশ। তবে এটি সংস্থার নিজস্ব পরিমাপ। কাজের তালিকা, ব্যর্থতার সংজ্ঞা এবং স্বাধীন পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়নি। নতুন বস্তু, বদলে যাওয়া আলো বা হঠাৎ সামনে আসা মানুষের ক্ষেত্রে একই সাফল্যের হার বজায় থাকবে, এমন প্রমাণও নেই।

বাস্তব উপাত্ত ব্যবহারের সুবিধা হল নমনীয় তার, কাপড় বা খাবারের মতো জটিল বস্তু সম্পর্কে তথ্য পাওয়া। কম্পিউটার-অনুকরণ শক্ত বস্তু ও পূর্বনির্ধারিত সংঘর্ষ ভালোভাবে দেখাতে পারলেও ভাঁজ হওয়া কাপড় বা পিছলে যাওয়া পাত্রের আচরণ নিখুঁতভাবে অনুকরণ করা কঠিন। আবার মানুষের প্রদর্শন সংগ্রহ ব্যয়বহুল। ব্যক্তিগত বাড়িতে রেকর্ড করা উপাত্তের গোপনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন থাকে।

সংস্থার অনুমান, আগামী এক থেকে দুই বছরে কিছু শিল্পে রোবটের ব্যবহার বাড়তে পারে। কিন্তু ঘরের রোবট তৈরি করতে অন্তত আট বছরও লেগে যেতে পারে বলে তারা মনে করছে। কারখানায় একই ধরনের পণ্য নির্দিষ্ট জায়গা থেকে তোলা আর শিশুর খেলনা, গরম হাঁড়ি ও পোষা প্রাণীর মধ্যে নিরাপদে চলাফেরা করা একেবারেই আলাদা সমস্যা। বোতলের ছিপি খোলার মতো সূক্ষ্ম কাজ এবং আগে না-দেখা নির্দেশ বোঝা এখনও বড় বাধা।

নিরাপত্তার জন্য স্পিরিট এআই সারা শরীরে বল নিয়ন্ত্রণ এবং অতিরিক্ত চাপ অনুভূত হলে জরুরি থামার ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। কিন্তু রোবট কোনও বস্তু ভুল চিনলে বা ধারালো সরঞ্জাম ভুল ক্রমে ব্যবহার করলে শুধু সংঘর্ষ-সংবেদক যথেষ্ট নয়। কাজের অনুমতি, মানুষের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের ক্ষমতা এবং ব্যর্থতার নথিও প্রয়োজন।

বিশ্লেষণ

‘চ্যাটজিপিটি মুহূর্ত’ আপাতত কোম্পানির আকাঙ্ক্ষা, অর্জিত বৈজ্ঞানিক মাইলফলক নয়। ভাষার উত্তর ভুল হলে লেখা সংশোধন করা যায়। কিন্তু শারীরিক রোবটের ভুলে মানুষ বা যন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রকৃত পরীক্ষা হবে স্বাধীন মানদণ্ডে অপরিচিত কাজ সম্পাদন, দীর্ঘ সময়ের নির্ভরযোগ্যতা এবং নিরাপদে ব্যর্থ হওয়ার ক্ষমতা।

চীনের বৃহৎ উৎপাদনভিত্তি রোবটের পরীক্ষা ও ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে মূলধনের পরিমাণ, নাচের ভিডিও বা নিয়ন্ত্রিত ঘরে ৯০ শতাংশ সাফল্য সাধারণ ব্যবহারের প্রমাণ নয়। কাজভিত্তিক ব্যর্থতার হার, দুর্ঘটনার নথি এবং মানব শ্রমিকের সঙ্গে উৎপাদনশীলতার তুলনা প্রকাশিত হলেই বোঝা যাবে রোবটের বুদ্ধি কতটা এগিয়েছে।


মিলিসেকেন্ডে মহাবিপর্যয়

প্রতিবেদন

ব্রিটেনের আকাশপথ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ৮ সেপ্টেম্বরের বিপর্যয়ের নেপথ্যে ছিল ফ্লাইট-উপাত্ত পরিচালনাকারী সফটওয়্যারের অজানা ত্রুটি। পরিচালন সংস্থা ন্যাটস ১৮ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক তদন্তের ফল প্রকাশ করে জানিয়েছে, দুটি নির্দেশ মাত্র এক মিলিসেকেন্ডের বিশেষ ব্যবধানে পৌঁছনোয় তথ্যের অবস্থা বিগড়ে যায়। এর ফল—প্রায় দুই হাজার উড়ান বাতিল, কয়েক দিন ধরে বিলম্ব এবং কয়েক লক্ষ যাত্রীর ভ্রমণসূচি ওলটপালট।

ত্রুটিটি বিমানের রাডার-পরিচয় সংকেত বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় দেখা দেয়। একটি বিমান পরিচিতি-কোড চাওয়ার পর উচ্চতর অগ্রাধিকারের আরেকটি কাজ এসে প্রথম অনুরোধটিকে সাময়িক থামিয়ে দেয়। দ্বিতীয় অনুরোধটি এক মিলিসেকেন্ড আগে বা পরে এলেও প্রথম হালনাগাদ স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিরল ওই সময়ক্রম সফটওয়্যারকে এমন একটি পথে নিয়ে যায়, যা আগের পরীক্ষায় ধরা পড়েনি।

সকাল দশটার দিকে প্রথম সমস্যা দেখা দিয়ে সাময়িকভাবে মিটে যায়। দুপুর সাড়ে বারোটার পরে আবার ত্রুটি ঘটে এবং দেড়টার কিছু পরে ব্যবস্থার বড় অংশ ব্যর্থ হয়। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার মধ্যে স্বাভাবিক পরিষেবা ফিরলেও ততক্ষণে বিমান, চালকদল ও যাত্রীরা বিভিন্ন বিমানবন্দরে ছড়িয়ে পড়েছেন। তাই মূল সফটওয়্যার চালু হওয়ার পরেও বাতিল ও বিলম্ব চলতে থাকে।

ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে নিরাপত্তামূলক বিকল্প প্রক্রিয়া চালু হয়। নিয়ন্ত্রকদের বিমানের দায়িত্ব হস্তান্তরের কিছু কাজ হাতে করতে হওয়ায় একই সময়ে পরিচালনযোগ্য উড়ানের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়। ন্যাটস জানিয়েছে, আকাশে থাকা কোনও বিমান ঝুঁকিতে পড়েনি। তবে নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং পরিষেবা সচল রাখা এক বিষয় নয়। ব্যর্থতাকে নিরাপদ সীমায় আটকে রাখা গেলেও এর অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষতি ছিল ব্যাপক।

ঘটনাটি ২০২৩ সালের বড় ন্যাটস বিভ্রাট থেকে আলাদা। সেবার একটি ফ্লাইট পরিকল্পনায় একই নামের পৃথক দুটি পথবিন্দু থাকায় মূল ও বিকল্প ব্যবস্থা নিরাপত্তামূলক অবস্থায় চলে গিয়েছিল। ওই ঘটনায় বিমানসংস্থাগুলির আনুমানিক দশ কোটি পাউন্ড খরচ হয়। ২০২৫ সালেও রাডার সমস্যায় ১৫০টি উড়ান বাতিল হয়েছিল। পরপর ঘটনা প্রযুক্তিগত স্থিতিস্থাপকতা ও বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন আরও বাড়িয়েছে।

বর্তমান ত্রুটির জন্য সাময়িক প্রতিরোধ বসানো হয়েছে। স্থায়ী সংশোধন নিরাপত্তা-পরীক্ষার পরে প্রয়োগ করা হবে। পরিবহণমন্ত্রী হাইডি আলেকজান্ডার অসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে ছয় মাসের মধ্যে স্বাধীন পর্যালোচনা দিতে বলেছেন। শুধু কোডের ত্রুটি নয়, উন্নয়নপদ্ধতি, পরীক্ষা, বিকল্প ব্যবস্থার ক্ষমতা এবং আগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হয়েছিল কি না—সবই পর্যালোচনার আওতায় থাকবে।

রায়ানএয়ার ন্যাটসের প্রধান মার্টিন রোলফের পদত্যাগ চেয়েছে। ইজিজেট ও অন্য সংস্থাগুলিও ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন তুলেছে। ন্যাটসের বক্তব্য, নির্দিষ্ট ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে এবং কোনও মানবিক ভুল বা সামরিক হস্তক্ষেপ ছিল না। তবে এগুলি সংস্থার নিজস্ব প্রাথমিক সিদ্ধান্ত; স্বাধীন পর্যালোচনা এখনও শেষ হয়নি।

বিশ্লেষণ

‘মাত্র এক মিলিসেকেন্ড’ ত্রুটিটির ক্ষুদ্রতা বোঝায়, দায়ের ক্ষুদ্রতা নয়। গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যারে প্রায় একই সময়ে আসা নির্দেশ, অসম্পূর্ণ হালনাগাদ এবং পুনরুদ্ধারের পরীক্ষা মৌলিক প্রকৌশল-দায়িত্বের অংশ। বিরল ঘটনা মানেই অপ্রস্তুত থাকার অনুমতি নয়, বিশেষত একই ধরনের অবকাঠামো আগেও ব্যর্থ হয়ে থাকলে।

স্থায়ী সমাধানে শুধু একটি কোডের অংশ বদলানো যথেষ্ট কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আলাদা প্রযুক্তির বিকল্প ব্যবস্থা, বাস্তবসম্মত চাপ-পরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রকদের হাতে কাজ নেওয়ার পর্যাপ্ত ক্ষমতা প্রয়োজন। বিমান নিরাপদ ছিল—এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কয়েক লক্ষ মানুষের যাত্রা নির্ভর করে এমন ব্যবস্থা কয়েক ঘণ্টা অচল থাকাও স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না।


গভীর শিকড়ে কার্বন

প্রতিবেদন

সয়াবিনের শিকড়কে আরও গভীর, খাড়া এবং কার্বনসমৃদ্ধ করার পরীক্ষা চালাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের সল্ক ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা। ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত মাঠ-প্রতিবেদনে ইলিনয়ের একটি পরীক্ষামূলক খেতে জিন-সম্পাদিত গাছের প্রথম বড় পরীক্ষার বিবরণ এসেছে। লক্ষ্য দুটি—উপরিভাগের মাটি শুকিয়ে গেলে গভীরের জল ব্যবহার করে ফলন রক্ষা করা এবং বায়ুমণ্ডল থেকে নেওয়া কার্বনের বেশি অংশ মাটির নিচে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখা।

ছয় বছরে গবেষকেরা সয়াবিন ও জোয়ারসহ প্রচলিত ফসলের কয়েকশো প্রকরণের জিনগত তথ্য সংগ্রহ করেছেন। শিকড়ের বৃদ্ধি ও কার্বন সঞ্চয়ের সঙ্গে যুক্ত ৩৪৭টি জিন চিহ্নিত করার পরে নির্বাচিত পরিবর্তন ঘটিয়ে এমন গাছ তৈরি করা হয়েছে, যার শিকড় মাটির আরও গভীরে যায়। একই সঙ্গে শিকড়ের আকার বাড়ানো এবং সুবেরিন নামের কর্কের মতো ধীরে পচা পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধির পরীক্ষাও চলছে।

গভীর শিকড়ের সম্ভাব্য সুবিধা সহজেই বোঝা যায়। খরায় উপরিভাগের আর্দ্রতা কমলেও মাটির নিচে কিছু জল থাকতে পারে। গভীরে থাকা মৃত শিকড় বা নিঃসৃত জৈব পদার্থ চাষের সময় বাতাসের সংস্পর্শে কম এলে কার্বন দ্রুত কার্বন ডাই-অক্সাইড হয়ে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা কমতে পারে। বড় শিকড় সার থেকে নাইট্রোজেন বেশি ধরে রাখতে পারলে নদী ও হ্রদে পুষ্টিদূষণও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে প্রতিটি সুবিধাই এখনও অনুমান বা প্রাথমিক পরীক্ষার স্তরে। শিকড়ে বেশি শক্তি ব্যয় হলে বীজের ফলন কমতে পারে। শিকড় গভীরে গেলেও মাটির জীবাণু কার্বন দ্রুত ভেঙে দিতে পারে। আবার মাটির গভীরে জল কম থাকলে বা শক্ত স্তর থাকলে পরিবর্তিত গাছের বাড়তি সুবিধা নাও মিলতে পারে। তাই পরীক্ষাগারের ফল দিয়ে কৃষিক্ষেত্রে সাফল্য ঘোষণা করা যায় না।

বেজোস আর্থ ফান্ডের এক কোটি ৮০ লাখ ডলার অনুদানে ইলিনয়, মিসৌরি, কানসাস ও আইওয়ায় পরীক্ষা চলছে। ইলিনয়ের একটি খেতে চলমান ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ভূগর্ভস্থ ক্যামেরা ও সংবেদকের সাহায্যে শিকড়ের বৃদ্ধি এবং মাটির কার্বন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রথম মাঠফল চলতি শরতে পাওয়ার কথা।

আগের পরীক্ষার ভিত্তিতে গবেষকদের হিসাব, এক হেক্টর পরিবর্তিত সয়াবিন বছরে অতিরিক্ত প্রায় এক মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড মাটিতে রাখতে পারে। এটি এখনও যাচাই করা মাঠফল নয়। ২০২৫ সালের একটি মডেল জানিয়েছিল, সয়াবিন, ভুট্টা, তুলা ও ক্যানোলায় এমন বৈশিষ্ট্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার হলে ২০৪০ সালের মধ্যে বছরে প্রায় এক গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ সম্ভব। তবে সেই হিসাব জমি, গ্রহণযোগ্যতা ও কার্বন সঞ্চয়ের স্থায়িত্ব সম্পর্কে একাধিক অনুমানের উপর নির্ভরশীল।

কৃষকের কাছে জলবায়ু-সুবিধার পাশাপাশি বীজের দাম, ফলন, খরা সহনশীলতা এবং বাজারে বিক্রির নিশ্চয়তাও গুরুত্বপূর্ণ। জিন-সম্পাদিত ফসলের অনুমোদন দেশে দেশে আলাদা। বড় বীজ কোম্পানিগুলি প্রযুক্তি গ্রহণ করলে দ্রুত বিস্তার সম্ভব। কিন্তু মেধাস্বত্ব ও বীজ পুনর্ব্যবহারের শর্ত কৃষকের স্বাধীনতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

বিশ্লেষণ

ফসলকে কার্বন-সংগ্রাহকে পরিণত করা জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নির্গমন কমানোর বিকল্প নয়। মাটিতে সঞ্চিত কার্বন আগুন, খরা, জমির ব্যবহার বদল বা চাষপদ্ধতির কারণে আবার বেরিয়ে যেতে পারে। তাই এক বছরের শিকড়ের ওজন নয়, বহু বছরের সম্পূর্ণ কার্বন-হিসাবই গুরুত্বপূর্ণ।

তবু খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু—দুই সমস্যাকে একসঙ্গে মোকাবিলার সম্ভাবনা রয়েছে। গভীর শিকড় যদি সত্যিই খরায় ফলন ধরে রাখতে এবং সারদূষণ কমাতে পারে, কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। প্রকল্পটির বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে ইতিবাচক ফলের পাশাপাশি ফলন-ক্ষতি, ব্যর্থ ক্ষেত্র এবং কার্বন কত দিন মাটিতে থাকে, সেই তথ্য প্রকাশের উপর।


বরফ গলল, সমুদ্র উঠল

প্রতিবেদন

গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বরফস্তর ১৯৭৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মোট প্রায় ১১.৩ ট্রিলিয়ন মেট্রিক টন বরফ হারিয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক আইস শিট মাস ব্যালান্স ইন্টার-কম্পারিজন এক্সারসাইজ বা আইএমবিআইই-র নতুন মূল্যায়নে ৪৫টি স্বাধীন সমীক্ষা ও ২৭টি উপগ্রহের তথ্য একত্র করা হয়েছে। গলে যাওয়া বরফ একাই বিশ্ব সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা প্রায় ৩.১ সেন্টিমিটার বাড়িয়েছে।

অঙ্কটি কল্পনা করা কঠিন। এই পরিমাণ বরফ গলে প্রায় ১১.৩ কোয়াড্রিলিয়ন লিটার জল তৈরি হয়েছে। সমুদ্রের বিশাল আয়তনের তুলনায় তিন সেন্টিমিটার সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু গবেষকদের হিসাবে, প্রতি এক সেন্টিমিটার সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধিতে বছরে অন্তত একবার প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা আরও ২০ থেকে ৩০ লাখ বাড়তে পারে। স্থানীয় ভূমি বসে যাওয়া, জোয়ার এবং ঝড়ের সঙ্গে মিললে বিপদ আরও বাড়ে।

নতুন মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ ফল হল, মোট ক্ষয়ের প্রায় পাঁচ-ষষ্ঠাংশ কেবল উষ্ণ বাতাসে পৃষ্ঠ গলার কারণে হয়নি। উষ্ণ সমুদ্রজল বরফের প্রান্ত ও নিচে পৌঁছে হিমবাহকে পাতলা করে। ফলে স্থলভাগের বরফ দ্রুত সমুদ্রে সরে যায়। এই গতিশীল ক্ষয় হঠাৎ ত্বরান্বিত হতে পারে এবং ভবিষ্যৎ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অনুমানের অন্যতম কঠিন বিষয়।

গ্রিনল্যান্ডের ইয়াকব্‌সহাভন হিমবাহ কোনও কোনও সময়ে দিনে ৫০ মিটার পর্যন্ত পিছোচ্ছে। অ্যান্টার্কটিকার পশ্চিমাংশে ক্ষয় বেশি, কারণ অনেক বরফের ভিত্তি সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অবস্থিত। পূর্ব অ্যান্টার্কটিকায় অতিরিক্ত তুষারপাত সাম্প্রতিক কিছু ক্ষতি পুষিয়ে দিয়েছে। তবে তা মহাদেশটির দুর্বল অঞ্চলগুলির দীর্ঘমেয়াদি পশ্চাদপসরণ বন্ধ করেছে, এমন প্রমাণ নেই।

১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশক এবং ১৯৯০-এর শুরুর দিকে সম্মিলিত বরফস্তর তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। পরে ক্ষয় বাড়ে এবং ২০১০-এর দশকে তাতে স্পষ্ট ত্বরণ দেখা যায়। ২০২০ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত হারে সাময়িক শ্লথতা থাকলেও গবেষকেরা একে স্বল্পমেয়াদি আবহাওয়ার ওঠানামা হিসেবে দেখেছেন। পরবর্তী পর্যবেক্ষণে ক্ষয় ফের বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

উপগ্রহের তিন ধরনের পদ্ধতি মিলিয়ে হিসাব করা হয়েছে। উচ্চতা-মাপনী বরফপৃষ্ঠের পরিবর্তন দেখে, মহাকর্ষ-মাপনী মোট ভরের পরিবর্তন শনাক্ত করে এবং ইনপুট–আউটপুট পদ্ধতি তুষার জমা ও সমুদ্রে বরফ বেরিয়ে যাওয়ার পার্থক্য গণনা করে। প্রতিটি পদ্ধতির আলাদা অনিশ্চয়তা রয়েছে। স্বাধীন ফলাফল এক জায়গায় মেলায় সামগ্রিক প্রবণতার প্রতি আস্থা বাড়ে।

তবে ২১০০ সালে সমুদ্র ঠিক কতটা উঠবে, এই গবেষণা একা তা বলে না। ভবিষ্যৎ নির্গমন, বরফের গতিশীল প্রতিক্রিয়া, তুষারপাত এবং হিমবাহের ভিত্তির ভূপ্রকৃতি ফল বদলাতে পারে। একই বৈশ্বিক গড়ও সব উপকূলে সমান হবে না। সমুদ্রস্রোত, মহাকর্ষ এবং ভূমির ওঠানামায় স্থানীয় পার্থক্য তৈরি হয়।

বিশ্লেষণ

২০২০–২৩ সালের শ্লথতাকে বরফক্ষয় থেমে যাওয়া বলা পরিসংখ্যানের অপব্যবহার হবে। প্রায় অর্ধশতকের ধারায় কয়েক বছরের আবহাওয়াগত বিরতি স্বাভাবিক। বরং উদ্বেগের বিষয়, উষ্ণতা বৃদ্ধির পরে বরফস্তরের প্রতিক্রিয়া কয়েক দশক ধরে চলতে পারে। আজ নির্গমন কমলেও আগের উষ্ণতার কিছু প্রভাব অব্যাহত থাকবে।

এই হিসাব শুধু দূরের মেরু অঞ্চলের বিষয় নয়। উপকূলরক্ষা, নিকাশি, বন্দর, আবাসন ও বিমার নকশায় কয়েক সেন্টিমিটারও গুরুত্বপূর্ণ। নির্ভুল উপগ্রহ-পর্যবেক্ষণ তাই বৈজ্ঞানিক বিলাসিতা নয়। কোন শহরে কখন কত উঁচু বাঁধ বা পরিকল্পিত পশ্চাদপসরণ প্রয়োজন, তার ভিত্তি তৈরি করে এই তথ্য।


ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানুষ

প্রতিবেদন

গবেষণাগারে তৈরি মানুষের মস্তিষ্কের কর্টেক্স-সদৃশ টিস্যু বিশেষভাবে পরিবর্তিত ইঁদুরের মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপন করে তাকে বিস্তৃত স্নায়ু-সংযোগ গড়তে দিয়েছেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। ১৬ সেপ্টেম্বর নেচার-এ প্রকাশিত গবেষণাটি মানুষের স্নায়ুবিক বিকাশ, জন্মের সময় অক্সিজেনের অভাব এবং কয়েকটি স্নায়ু ও মানসিক রোগ বোঝার নতুন প্রাণী-মডেল হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে।

গবেষকেরা মানুষের ত্বক বা রক্তের কোষকে পুনঃপ্রোগ্রাম করে বহুমুখী স্টেম কোষ তৈরি করেন। সেগুলি থেকে ত্রিমাত্রিক কর্টিক্যাল অর্গানয়েড তৈরি হয়—মানুষের কর্টেক্সের কয়েক ধরনের কোষ ও বিকাশের কিছু বৈশিষ্ট্য বহনকারী ছোট টিস্যু। এটি সম্পূর্ণ মস্তিষ্ক নয়। মানুষের চিন্তা, চেতনা বা স্বাভাবিক মস্তিষ্কের পূর্ণ স্থাপত্যও এতে পুনর্গঠিত হয় না।

ইঁদুরগুলিকে জিনগতভাবে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে তাদের নিজস্ব কর্টেক্স এবং স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হিপোক্যাম্পাসের অধিকাংশ কোষ গড়ে না ওঠে। জন্মের অল্প সময় পরে ওই ফাঁকা জায়গায় মানব অর্গানয়েড বসানো হয়। টিস্যুটি বেড়ে বিভিন্ন ধরনের কর্টিক্যাল কোষ তৈরি করে এবং ইঁদুরের স্নায়ুতন্ত্র ও মেরুদণ্ডের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করে।

গবেষণায় ভন ইকোনোমো নিউরন নামের বিরল মানব স্নায়ুকোষও পাওয়া গেছে। ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়ার কিছু ক্ষেত্রে এই কোষ প্রথম দিকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জীবিত মানুষের বিকাশমান মস্তিষ্ক থেকে এমন কোষ নিয়মিত সংগ্রহ করা নৈতিকভাবে সম্ভব নয়। ফলে রোগের পরিবর্তন ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণের একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি হয়েছে।

প্রাথমিক প্রয়োগে কিছু ইঁদুরকে পাঁচ ঘণ্টা কম অক্সিজেনের পরিবেশে রাখা হয়। সাধারণ ইঁদুরের স্নায়ুকোষ যে মাত্রার অক্সিজেন-স্বল্পতা তুলনামূলকভাবে সহ্য করেছিল, প্রতিস্থাপিত মানব কর্টিক্যাল কোষ সেখানে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির লক্ষণ দেখায়। সংশ্লিষ্ট ইঁদুরগুলির হাঁটা ও সূক্ষ্ম চলনেও সমস্যা দেখা যায়। জন্মকালীন অক্সিজেন-স্বল্পতায় মানুষের মস্তিষ্কের বিশেষ দুর্বলতা বোঝার কাজে ফলটি ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে মডেলটির কৃত্রিমতা বড় সীমাবদ্ধতা। মানব টিস্যু একটি ইঁদুরের রক্তপ্রবাহ, হরমোন ও সংবেদন ব্যবস্থার মধ্যে বেড়েছে। ভ্রূণের মানুষের মস্তিষ্কে যেমন স্তর ও সংযোগ গড়ে ওঠে, এখানে তা হয়নি। কোনও চিকিৎসায় ইঁদুরের লক্ষণ বদলালেও মানুষের রোগীর ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

নৈতিক প্রশ্ন দুটি স্তরে। প্রথমটি প্রাণীর কল্যাণ—গবেষণার প্রয়োজন কি কষ্টকে ন্যায্য করে এবং কোষের পাত্রে বিকল্প পরীক্ষা সম্ভব কি না। দ্বিতীয়টি আরও জটিল: মানব স্নায়ুটিস্যু প্রাণীর মস্তিষ্কে বসালে অপ্রত্যাশিত উপলব্ধি বা আচরণ তৈরি হতে পারে কি না। বর্তমান পরীক্ষায় উন্নত বুদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং সূক্ষ্ম চলন ও স্মৃতিতে ঘাটতি ছিল। তবে ভবিষ্যতে টিস্যু আরও জটিল হলে আলাদা নৈতিক পর্যালোচনা প্রয়োজন হবে।

বিশ্লেষণ

‘মানুষের মস্তিষ্কওয়ালা ইঁদুর’ আকর্ষণীয় শিরোনাম হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে বিভ্রান্তিকর। প্রাণীগুলির স্নায়ুতন্ত্র ইঁদুরেরই। তার মধ্যে মানব কর্টেক্স-উৎপন্ন টিস্যু বেড়ে সংযোগ তৈরি করেছে। সঠিক পরিভাষা ব্যবহার না করলে চিকিৎসার সম্ভাবনা ও নৈতিক উদ্বেগ—দুটিই অযথা অতিরঞ্জিত হয়।

এই পদ্ধতির মূল্য নির্ভর করবে এমন নির্দিষ্ট গবেষণাপ্রশ্নের উপর, যেখানে শুধু কোষের পাত্র যথেষ্ট নয়। প্রতিটি পরীক্ষায় কেন জীবন্ত প্রাণী প্রয়োজন, কী লক্ষণে পরীক্ষা থামবে এবং মানব টিস্যুর জটিলতার সীমা কোথায়, তা আগেই নির্ধারণ করা উচিত। নতুন মডেলটি রোগ বোঝার একটি গবেষণাযন্ত্র, মানুষের মস্তিষ্ক বা চিকিৎসার প্রস্তুত প্রতিলিপি নয়।


মঙ্গলে ইস্টের ইট

প্রতিবেদন

জিন-সম্পাদিত ইস্ট, জেলাটিন এবং পাথুরে গুঁড়ো মিশিয়ে মঙ্গলের অতি নিম্নচাপ ও ঠান্ডায় ব্যবহারযোগ্য নির্মাণসামগ্রী তৈরির প্রাথমিক পরীক্ষা করেছেন হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষকেরা। কাজটি কেম সার্কুলারিটি সাময়িকীতে প্রকাশিত হওয়ার পরে ১৭ সেপ্টেম্বর বিস্তারিত সামনে আসে। গবেষণাগারে ছোট গম্বুজ ছাপিয়ে উপাদানটির শক্তি মাপা হয়েছে। মঙ্গলে কোনও নির্মাণ হয়নি।

সাধারণ কংক্রিটে বালি বা ভাঙা পাথরকে সিমেন্টের আঠালো বন্ধনে আটকে রাখা হয়। নতুন উপাদানে সেই বন্ধনের কাজ করছে শূকরের জেলাটিন এবং পরিবর্তিত স্যাকারোমাইসিস সেরিভিসিয়ে—রুটি ও মদ তৈরিতে পরিচিত ইস্টের একটি প্রকৌশলীকৃত রূপ। গবেষকেরা ইস্টে এমন জিন যোগ করেছেন, যা কোষগুলিকে পরস্পরের সঙ্গে ভালোভাবে যুক্ত করে এবং ঝিনুকের পাথর আঁকড়ে থাকার আঠালো প্রোটিন তৈরি করে।

মঙ্গলের মাটি সরাসরি ব্যবহার করা হয়নি। তার অনুরূপ পাথুরে গুঁড়ো দিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়েছে। মিশ্রণটি ত্রিমাত্রিকভাবে ছাপা এবং ছাঁচে ঢালা—দুই পদ্ধতিতেই গড়া হয়। প্রায় মাইনাস ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও অতি নিম্নচাপে ৪৮ ঘণ্টা রাখার পরে জল জমে সরাসরি বাষ্প হয়ে বেরিয়ে যায়। পেছনে থেকে যায় হালকা ও ছিদ্রযুক্ত জেলাটিন–পাথর–প্রোটিন কাঠামো।

মাত্র সাড়ে চার সেন্টিমিটার উঁচু গম্বুজের চাপ সহনশীলতা ছিল প্রায় ১২ মেগাপাস্কাল, যা নিম্নমানের কিছু কংক্রিটের সমতুল্য। বাঁকানোর চাপও প্রায় ছয় মেগাপাস্কাল পর্যন্ত সহ্য করেছে। গবেষক দলের মতে, মঙ্গলের পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অভিকর্ষে এই শক্তি বহুতল কাঠামোর ভার বহনের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। তবে ছোট নমুনার ফল বড় ভবনের নিশ্চয়তা নয়।

সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হল, উপাদানটি নিজে বাসযোগ্য আবরণ নয়। এটি বাতাস আটকে রাখা, প্রায়-শূন্য বাইরের চাপের বিরুদ্ধে ভেতরের চাপ ধরে রাখা বা মহাজাগতিক বিকিরণ ঠেকানোর জন্য তৈরি হয়নি। বাস্তব আবাসনে পূর্বনির্মিত চাপকক্ষ, বায়ুরোধী আবরণ, সংযোগের সিল এবং সম্ভবত জলভরা বিকিরণ-ঢালসহ একাধিক স্তর প্রয়োজন হবে।

গবেষকেরা হিসাব করেছেন, পাথর গলিয়ে ইট তৈরির কয়েকটি প্রস্তাবের তুলনায় এই পদ্ধতিতে প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ শক্তি লাগতে পারে। ইস্ট পুনরুৎপাদন করা যায় এবং পুরনো কাঠামো ভেঙে উপাদান পুনর্ব্যবহারের সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু জেলাটিনসহ প্রাথমিক উপকরণের বড় অংশ পৃথিবী থেকে নিতে হলে উৎক্ষেপণের ভর ও খরচ দ্রুত বাড়বে।

মঙ্গলের বিকিরণ, ঠান্ডা ও শুষ্ক পরিবেশে ইস্ট কত দিন সক্রিয় থাকবে, তা পরীক্ষা করা হয়নি। আরও সহনশীল জীবাণু তৈরি করলে গ্রহ-সুরক্ষার বিপরীত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পৃথিবীর অণুজীব ছড়িয়ে পড়লে ভবিষ্যতে মঙ্গলের নিজস্ব জীবনের চিহ্ন খোঁজা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই জৈব-নিয়ন্ত্রণ নির্মাণশক্তির মতোই মৌলিক শর্ত।

বিশ্লেষণ

ক্ষুদ্র গম্বুজ দেখে মঙ্গলের বাড়ির নকশা প্রস্তুত—এমন সিদ্ধান্ত ভুল। পরীক্ষাটি একটি সম্ভাব্য কাঠামোগত উপাদানের ধারণা দিয়েছে, সম্পূর্ণ আবাসনের নয়। বড় আকারে ছাপা, তাপমাত্রার পুনরাবৃত্ত পরিবর্তন, বিকিরণ, ধূলিঝড় এবং বহু বছরের ক্লান্তি-পরীক্ষা এখনও বাকি।

তবু ধারণাটির মৌলিক মূল্য রয়েছে। মহাকাশ নির্মাণে কেবল ধাতু ও সিমেন্ট নয়, বেড়ে ওঠা ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য জীববস্তু ব্যবহার করা যেতে পারে। শেষ বিচারে সফলতা নির্ধারণ করবে উপাদানটির শক্তির পাশাপাশি কতটা ভর পৃথিবী থেকে নিতে হবে এবং কোনও জীবাণুকে বাইরে না ছড়িয়ে বন্ধ ব্যবস্থায় রাখা সম্ভব কি না।


চাঁদে নতুন ক্ষত

প্রতিবেদন

২০২৪ সালে একটি গ্রহাণু বা ধূমকেতুর খণ্ড চাঁদে আঘাত করে ২২২ মিটার চওড়া ও সর্বোচ্চ ৪৩ মিটার গভীর গহ্বর তৈরি করেছিল। ঘটনাটি কোনও দূরবীক্ষণযন্ত্র তাৎক্ষণিকভাবে ধরতে পারেনি। নাসার লুনার রিকনেসান্স অরবিটারের পুরনো ও নতুন ছবি তুলনা করে ২০২৫ সালে পরিবর্তনটি শনাক্ত হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সায়েন্স অ্যাডভান্সেস-এ দুটি গবেষণায় ঘটনাটির বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে।

আঘাতটি ২০২৪ সালের ১১ এপ্রিল থেকে ২২ মের মধ্যে ঘটে। সম্ভাব্য বস্তুটির আকার তিন থেকে ছয়তলা ভবনের কাছাকাছি ছিল বলে গবেষকদের অনুমান। চাঁদের বায়ুমণ্ডল প্রায় নেই। ফলে পৃথিবীর মতো বায়ুমণ্ডলীয় ঘর্ষণে বস্তুটি পুড়ে বা ভেঙে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। সরাসরি পৃষ্ঠে আঘাত করে এটি সাম্প্রতিক সৌরজগতের পরিচিত বৃহত্তম নতুন গহ্বরগুলির একটি তৈরি করেছে।

গহ্বরটির নাম দেওয়া হয়েছে ম্যাকগেচিন, প্রয়াত চন্দ্রবিজ্ঞানী টমাস ম্যাকগেচিনের নামে। এটি এক দশক আগে লুনার অরবিটার দিয়ে চিহ্নিত আগের নতুন রেকর্ডধারীর প্রায় তিন গুণ বড়। এত বড় আঘাত চাঁদে গড়ে প্রায় ১৩২ বছরে একবার ঘটতে পারে বলে গবেষকেরা অনুমান করেছেন। এটি পরিসংখ্যানভিত্তিক হিসাব, নির্দিষ্ট সময়সূচি নয়।

লুনার অরবিটারের বিস্তৃত-কোণের ছবিতে প্রথমে উজ্জ্বল ধ্বংসাবশেষ এবং তার চারপাশে গাঢ় বলয় দেখা যায়। পরে উচ্চ-রেজোলিউশন ছবি গহ্বরের ঢাল ও গভীরতা নিশ্চিত করে। আঘাতে ছিটকে যাওয়া ধুলো ও পাথর একশো কিলোমিটারের বেশি অঞ্চলে পরিবর্তন ঘটিয়েছে। প্রত্যাশার তুলনায় অনেক উপাদান বেশি খাড়া কোণে ছিটকে বেরিয়েছিল।

তাপীয় পরিমাপে গহ্বরের চারপাশে প্রায় সাত কিলোমিটার বিস্তৃত একটি রাতের ঠান্ডা অঞ্চল পাওয়া গেছে। আঘাতে শক্ত মাটি আলগা হয়ে বেশি ছিদ্রযুক্ত হওয়ায় সূর্যের তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা কমেছে। দিনের আলো সরে গেলে অঞ্চলটি আশপাশের তুলনায় দ্রুত ঠান্ডা হয়। এমন তাপীয় চিহ্ন ব্যবহার করে দৃশ্যমানভাবে অস্পষ্ট নতুন আঘাতও খোঁজা যেতে পারে।

২০০৯ সাল থেকে লুনার অরবিটার অন্তত এক হাজার নতুন গহ্বর এবং প্রায় এক লাখ পৃষ্ঠ-পরিবর্তন শনাক্ত করেছে। এই তথ্য থেকে গবেষকেরা হিসাব করছেন, চাঁদের উপরিভাগের প্রায় দুই সেন্টিমিটার মাটি ছিটকে আসা ধ্বংসাবশেষে গড়ে ৮০ হাজার বছরে উলটে যায়। ফলে অ্যাপোলো নভোচারীদের পদচিহ্ন অনন্তকাল অক্ষত থাকবে—জনপ্রিয় ধারণাটি ঠিক নয়।

ভবিষ্যৎ চন্দ্রবসতির জন্য ঘটনাটির ব্যবহারিক গুরুত্বও রয়েছে। বড় গহ্বর খুব বিরল হলেও দূরে পড়া আঘাতের ছিটকে আসা উচ্চগতির পাথর ঘাঁটি, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা যোগাযোগযন্ত্রে আঘাত করতে পারে। ঝুঁকির মানচিত্র, দেয়ালের পুরুত্ব এবং যন্ত্র মাটির নিচে রাখা উচিত কি না—নতুন ঘটনাটি সেই হিসাব উন্নত করতে সাহায্য করবে।

বিশ্লেষণ

আবিষ্কারের সবচেয়ে শিক্ষণীয় দিক হল, বড় ঘটনাও বিপুল উপাত্তের মধ্যে এক বছরের বেশি সময় অদৃশ্য থাকতে পারে। মহাকাশযন্ত্র ছবি তুললেই আবিষ্কার সম্পূর্ণ হয় না। নিয়মিত তুলনা, স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ এবং মানুষের যাচাই—সবই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এটি আসন্ন বিপর্যয়ের সতর্কতা নয়। শতাব্দীতে একবারের বৈশ্বিক গড় কোনও নির্দিষ্ট ঘাঁটিতে সরাসরি আঘাতের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম রাখে। তবু স্থায়ী মানববসতি গড়ে উঠলে বিরল কিন্তু উচ্চ-ক্ষতির ঘটনাকে নকশায় ধরতে হবে। চাঁদের ‘নিষ্ক্রিয়’ পৃষ্ঠও ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। ম্যাকগেচিন তার দৃশ্যমান প্রমাণ।


কৃষ্ণগহ্বরের জেটের সময়

প্রতিবেদন

বৃহৎ কৃষ্ণগহ্বর কোনও তারাকে ছিন্ন করার পরে কখন শক্তিশালী জেট ও বহিঃপ্রবাহ ছোড়ে, তার একটি সাধারণ ছন্দ শনাক্ত করার দাবি করেছেন দুই জ্যোতির্বিজ্ঞানী। ১৭ সেপ্টেম্বর আলোচিত নেচার অ্যাস্ট্রোনমি-র গবেষণায় অ্যাডেল গুডউইন ও অ্যান্ড্রু মামারি ২০টি জোয়ারীয়-বিচ্ছেদ ঘটনা বিশ্লেষণ করেছেন। ফল অনুযায়ী, কৃষ্ণগহ্বরের খাদ্যগ্রহণের দুটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে রেডিয়ো-উজ্জ্বল বহিঃপ্রবাহ দেখা যায়।

কোনও তারা অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরের খুব কাছে গেলে তার সামনের ও পেছনের অংশের উপর মহাকর্ষীয় টানের পার্থক্যে সেটি লম্বা হয়ে ছিঁড়ে যায়। এই প্রক্রিয়াকে জোয়ারীয় বিচ্ছেদ বলা হয়। পদার্থের প্রায় অর্ধেক কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে চাকতি তৈরি করে ধীরে ভিতরে পড়ে। বাকি অংশ মহাকাশে ছিটকে যেতে পারে। সব পদার্থ ঘটনা-দিগন্ত পার হয় না।

জেট বা বহিঃপ্রবাহকে রেডিয়ো তরঙ্গে অনুসরণ করা সুবিধাজনক। বাইরে এগোনো উচ্চগতির পদার্থ চারপাশের গ্যাসের সঙ্গে সংঘর্ষে রেডিয়ো বিকিরণ তৈরি করে। অতীতে কিছু ঘটনায় তারা ছিন্ন হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে, আবার কিছু ঘটনায় এক, তিন বা পাঁচ বছর পরে বিকিরণ দেখা গেছে। এই অমিলের কারণে কখন দূরবীক্ষণযন্ত্র তাক করানো উচিত, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল।

গবেষণায় প্রথম পর্যায়টি পাওয়া গেছে কৃষ্ণগহ্বর যখন অত্যন্ত দ্রুত পদার্থ গ্রহণ করছে। দ্বিতীয় পর্যায়টি আসে কয়েকশো থেকে কয়েক হাজার দিন পরে, যখন গ্রহণের হার তার তাত্ত্বিক সর্বোচ্চ স্থিতিশীল হারের প্রায় দুই শতাংশে নেমে যায়। ছোট, নক্ষত্র-ভরের কৃষ্ণগহ্বরেও প্রায় একই নিম্ন সীমায় জেটের আচরণ বদলানোর নজির রয়েছে।

এই মিল গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষিত অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরের ভর সূর্যের কয়েক লক্ষ থেকে কয়েকশো কোটি গুণ। অন্যদিকে নক্ষত্র-ভরের কৃষ্ণগহ্বর সাধারণত সূর্যের দশ থেকে পঞ্চাশ গুণ। দুই প্রান্তে একই আপেক্ষিক গ্রহণহারে পরিবর্তন দেখা গেলে পদার্থ-চাকতি ও চৌম্বকক্ষেত্রের মৌলিক প্রক্রিয়া ভরের সঙ্গে মোটামুটি একই নিয়মে বদলায়, এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

জেট শুধু কৃষ্ণগহ্বরের আশপাশের ঘটনা নয়। শক্তিশালী বহিঃপ্রবাহ ছায়াপথের গ্যাস গরম বা সরিয়ে দিতে পারে। ফলে নতুন তারা তৈরির হার বদলাতে পারে। তবে একটি সাধারণ জোয়ারীয়-বিচ্ছেদের জেট পুরো ছায়াপথের বিবর্তন কতটা প্রভাবিত করে, তা ঘটনা ও পরিবেশভেদে আলাদা। নতুন গবেষণা মূলত সময় নির্ধারণ করেছে, মোট শক্তি বা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নয়।

কুড়িটি ঘটনা জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতো বিরল বিষয়ের জন্য মূল্যবান নমুনা। তবে সার্বজনীন নিয়ম ঘোষণার জন্য তা এখনও ছোট। সব ঘটনা একই রেডিয়ো সংবেদনশীলতায় পর্যবেক্ষিত হয়নি। কোনও জেট পৃথিবীর দিকে না থাকলে তার উজ্জ্বলতা কম দেখা যেতে পারে। পর্যবেক্ষণের ফাঁকে প্রথম জেট বাদ পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

বিশ্লেষণ

গবেষণাটি কৃষ্ণগহ্বরের ‘ঢেঁকুর’ কখন ওঠে, তার একটি সম্ভাব্য ঘড়ি দিয়েছে। তবে ঘড়িটি এখনও পরীক্ষাধীন। গ্রহণহারের অনুমান নিজেই মডেলনির্ভর, কারণ দূরের ঘটনার আলো থেকে সরাসরি কত পদার্থ কৃষ্ণগহ্বরে পড়ছে, তা মাপা যায় না। আরও বড় নমুনা এবং ধারাবাহিক বহু-তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

ব্যবহারিক লাভ স্পষ্ট। দ্বিতীয় পর্যায় কখন আসতে পারে জানা থাকলে মূল্যবান রেডিয়ো দূরবীক্ষণ সময় বছরের পর বছর এলোমেলোভাবে খরচ না করে নির্দিষ্ট সময়ের জানালায় ব্যবহার করা যাবে। আগামী ঘটনাগুলিতে পূর্বাভাস সঠিক হলে ছোট ও অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে একটি অভিন্ন পদার্থবিজ্ঞানের পক্ষে আরও শক্ত প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে।


অন্ধকারে ৪৭ ছায়াপথ

প্রতিবেদন

কাছাকাছি তিনটি বড় ছায়াপথের চারপাশে প্রায় পঞ্চাশটি অত্যন্ত ক্ষীণ বামন ছায়াপথের প্রার্থী চিহ্নিত করেছেন ইতালির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের নেতৃত্বাধীন গবেষকেরা। গবেষণাটি ১১ সেপ্টেম্বর অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স-এ প্রকাশিত হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর ফলটি বিস্তৃতভাবে আলোচিত হয়েছে। গভীর ছবির বিশদ তালিকায় ৪৭টি প্রার্থী রয়েছে, যার মধ্যে চারটি আগে চিহ্নিত হয়েছিল।

তিনটি কেন্দ্রীয় ছায়াপথের প্রকৃতি ও দূরত্ব আলাদা। সর্পিল এনজিসি ৫০৬৮ পৃথিবী থেকে প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ আলোকবর্ষ দূরে। লেন্স-আকৃতির এনজিসি ৫০৮৪ প্রায় আট কোটি এবং উপবৃত্তাকার এনজিসি ৫০৮৭ প্রায় দশ কোটি আলোকবর্ষ দূরে। ভিন্ন ধরনের বড় ছায়াপথের উপগ্রহ তুলনা করলে পরিবেশ বামন ছায়াপথের সংখ্যা ও গঠনে কী প্রভাব ফেলে, তা পরীক্ষা করা যায়।

চিলিতে ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরির ভিএলটি সার্ভে টেলিস্কোপ দিয়ে ভিএসটি–স্ম্যাশ প্রকল্পে গভীর ছবি তোলা হয়। স্বয়ংক্রিয় ছায়াপথ-শনাক্তকারী ব্যবস্থার উপর পুরোপুরি নির্ভর না করে গবেষকেরা ছবিগুলি চোখে পরীক্ষা করেছেন। সামনের উজ্জ্বল তারা ও অন্যান্য উৎসের আলো বাদ দেওয়ার পরে ছড়িয়ে থাকা ক্ষীণ আলোর দাগগুলি দৃশ্যমান হয়।

প্রার্থীগুলির আনুমানিক নাক্ষত্রিক ভর সূর্যের দশ লক্ষ থেকে একশো কোটি গুণ। গোলাকার বামন, উপবৃত্তাকার, অনিয়মিত এবং সম্ভাব্য সর্পিল কাঠামোও দেখা গেছে। এত কম পৃষ্ঠ-উজ্জ্বলতায় মোট আলো বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে থাকে। ফলে বস্তুগুলিকে আকাশের পটভূমি থেকে আলাদা করা কঠিন। এ কারণেই তাদের ‘ভূতুড়ে’ বলা হচ্ছে।

আবিষ্কারটি ‘নিখোঁজ উপগ্রহ’ সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। মানক মহাজাগতিক মডেলে অন্ধকার পদার্থের ছোট ছোট গুচ্ছ বড় ছায়াপথের চারপাশে বিপুল সংখ্যায় থাকার কথা। কিন্তু মিল্কিওয়ের কাছে দৃশ্যমান বামন ছায়াপথের সংখ্যা দীর্ঘদিন মডেলের কিছু পূর্বাভাসের তুলনায় কম ছিল। অত্যন্ত ক্ষীণ বস্তু পর্যবেক্ষণে বাদ পড়লে সেই ব্যবধানের একটি অংশ ব্যাখ্যা হতে পারে।

সমস্যাটি অবশ্য এখন আরও জটিল। সাম্প্রতিক কিছু গভীর সমীক্ষায় কয়েকটি বড় ছায়াপথের চারপাশে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি উপগ্রহ পাওয়া গেছে। তাই শুধু মোট সংখ্যা নয়, কেন্দ্রীয় ছায়াপথের ভর, উপগ্রহের দূরত্ব, তারা তৈরির ইতিহাস এবং অন্ধকার পদার্থের বণ্টন একসঙ্গে তুলনা করা প্রয়োজন।

বর্তমান বস্তুগুলিকে নিশ্চিত উপগ্রহ বলা এখনও আগেভাগে হবে। শুধু ছবিতে কাছাকাছি দেখা গেলেই তারা একই দূরত্বে রয়েছে, এমন নয়। কোনওটি অনেক দূরের পটভূমি-ছায়াপথও হতে পারে। বর্ণালির সাহায্যে গতি ও দূরত্ব মাপা অথবা পৃথক উজ্জ্বল তারা শনাক্ত করা প্রয়োজন। ইউরোপীয় ইউক্লিড মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্র একই অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করবে বলে নিশ্চিতকরণের সুযোগ রয়েছে।

বিশ্লেষণ

‘৫০টি ছায়াপথ আবিষ্কার’ সরল শিরোনাম। বৈজ্ঞানিকভাবে এগুলি প্রধানত প্রার্থী। গবেষকেরা রং ও আলোর কাঠামো দিয়ে যুক্তিসঙ্গত নির্বাচন করেছেন। কিন্তু দূরত্ব নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নিখোঁজ উপগ্রহের চূড়ান্ত হিসাব বদলানো যাবে না। এই সতর্কতা ফলটির গুরুত্ব কমায় না। পরবর্তী পরীক্ষার তালিকা তৈরি করাও গভীর সমীক্ষার বড় কাজ।

বামন ছায়াপথে তারা কম হলেও অন্ধকার পদার্থের অনুপাত অনেক বেশি হতে পারে। তাই এগুলি অদৃশ্য পদার্থের প্রকৃতি, ছায়াপথ গঠন এবং মহাজাগতিক মডেলের ছোট মাপের পরীক্ষা। ইউক্লিডে প্রার্থীগুলি নিশ্চিত বা বাতিল—দুই ফলই মূল্যবান হবে। এক ক্ষেত্রে নতুন উপগ্রহের সন্ধান মিলবে, অন্য ক্ষেত্রে ক্ষীণ বস্তু শনাক্তকরণের সীমা আরও নির্ভুল হবে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles