কোবরার প্রথম মহিলা প্রধান সংযুক্তা, নতুন দায়িত্বে ‘অসমের লৌহমানবী’

যা জানা জরুরি
- জঙ্গিদমন অভিযানে নেতৃত্ব দিয়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন ‘অসমের লৌহমানবী’ হিসেবে।
- এ বার কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর বিশেষ কমান্ডো শাখা কোবরার নেতৃত্বে এলেন সংযুক্তা পরাশর।
- অরণ্যে গেরিলা মোকাবিলায় বিশেষ প্রশিক্ষিত দশটি ব্যাটালিয়নের দায়িত্ব সামলাবেন তিনি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
জঙ্গিদমন অভিযানে নেতৃত্ব দিয়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন ‘অসমের লৌহমানবী’ হিসেবে। এ বার কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর বিশেষ কমান্ডো শাখা কোবরার নেতৃত্বে এলেন সংযুক্তা পরাশর। তিনিই এই বাহিনীর প্রথম মহিলা প্রধান। অরণ্যে গেরিলা মোকাবিলায় বিশেষ প্রশিক্ষিত দশটি ব্যাটালিয়নের দায়িত্ব সামলাবেন তিনি। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীর শীর্ষপদে তাঁর নিয়োগ মহিলা পুলিশ আধিকারিকদের অগ্রযাত্রায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
অসম-মেঘালয় ক্যাডারের ২০০৬ সালের আইপিএস আধিকারিক সংযুক্তাকে কোবরার মহাপরিদর্শক বা আইজি করা হয়েছে। তিনি ১৯৯৬ সালের আইপিএস আধিকারিক দানেশ রানার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। সিআরপিএফ সদর দফতর গত সপ্তাহে নিয়োগের নির্দেশ জারি করে। নিজের রাজ্যে পুলিশি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থায় কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
সংযুক্তার পরিচিতির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে অসমের শোণিতপুরে পুলিশ সুপার হিসেবে কাজের অধ্যায়। ২০১৩-১৪ সালে বড়ো জঙ্গি সংগঠন এনডিএফবির বিরুদ্ধে অভিযানে নেতৃত্ব দেন তিনি। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর নেতৃত্বাধীন অভিযানে ১৬ জন জঙ্গি নিহত এবং ৬৪ জন গ্রেফতার হয়। একে-৪৭ হাতে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে অভিযানে যাওয়ার ছবি তাঁকে দেশজুড়ে পরিচিত করে তোলে। সেই সময় বড়ো জঙ্গিদের কাছ থেকে প্রাণনাশের হুমকিও পেয়েছিলেন তিনি।
মাঠের অভিযানের পাশাপাশি তদন্তের অভিজ্ঞতাও তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএতে উপমহাপরিদর্শক হিসেবে সন্ত্রাসবাদ ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত তদন্তে কাজ করেছেন সংযুক্তা। কোবরায় নিয়োগের আগে তিনি অসম পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের নেতৃত্বে ছিলেন। ফলে রাজ্য পুলিশের কাজ, জঙ্গিদমন এবং কেন্দ্রীয় তদন্তের অভিজ্ঞতা নিয়েই নতুন দায়িত্বে আসছেন তিনি।
পুলিশের চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে সংযুক্তার পড়াশোনার বিষয় ছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্দ্রপ্রস্থ মহিলা কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়েন তিনি। পরে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নেন। মার্কিন বিদেশনীতি নিয়ে এমফিল ও পিএইচডি করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা থেকে সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে পুলিশি দায়িত্ব—তাঁর কর্মজীবনে দুই ভিন্ন জগতের অভিজ্ঞতা মিলেছে।
কোবরার পুরো নাম ‘কমান্ডো ব্যাটালিয়ন ফর রেজলিউট অ্যাকশন’। মাওবাদী সশস্ত্র তৎপরতা মোকাবিলায় অরণ্যের উপযোগী বিশেষ বাহিনী তৈরির উদ্দেশ্যে এর সূচনা। সিআরপিএফের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে দশটি ব্যাটালিয়ন গড়ে তোলা হয়। মূল বাহিনী থেকে বাছাই করা জওয়ানদের কঠোর কমান্ডো প্রশিক্ষণ এবং জঙ্গলে লড়াইয়ের কৌশল শেখানোর পরে কোবরায় দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে ২০০৮-০৯ সালে দুটি, পরের বছরে চারটি এবং ২০১০-১১ সালে আরও চারটি ব্যাটালিয়ন তৈরি হয়। বাহিনীর সদর দফতর দিল্লিতে। প্রতিটি সদস্যকে অরণ্যে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকা এবং লড়াই চালানোর উপযোগী করে গড়ে তোলাই এই প্রশিক্ষণের অন্যতম লক্ষ্য।
ছত্তীসগঢ়, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, মহারাষ্ট্রের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও এই বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ঘন জঙ্গলে দীর্ঘ পথ টহল দেওয়া, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো, অতর্কিত হামলা মোকাবিলা এবং বিস্ফোরকের বিপদ এড়িয়ে এগোনো কোবরার কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বের তুলনায় এই ধরনের অভিযানে ভূপ্রকৃতি ও প্রতিপক্ষের কৌশল বোঝার প্রয়োজন অনেক বেশি।
সম্প্রতি মণিপুরে সশস্ত্র হিংসা নিয়ন্ত্রণে কোবরার দুটি ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করা হয়েছে। ফলে সংযুক্তার নতুন দায়িত্বের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতার সরাসরি যোগ রয়েছে। অশান্ত অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের অভিজ্ঞতা এই বাহিনীর নেতৃত্বে বিশেষ প্রাসঙ্গিক।
সিআরপিএফের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শাখার নেতৃত্বেও এখন মহিলা আধিকারিকেরা রয়েছেন। জম্মুতে এ বিজয়লক্ষ্মী, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কবিতা জালান এবং রাজস্থানে অর্চনা শিবহরে আইজি পদে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের নেতৃত্বে রয়েছেন সীমা ধুন্দিয়া। সেই ধারায় সংযুক্তার নিয়োগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ কোবরার দায়িত্বের কেন্দ্রে রয়েছে সরাসরি সশস্ত্র অভিযান। অসমের জঙ্গিদমন অভিযানের অভিজ্ঞতা এ বার তাঁকে নিয়ে এল জাতীয় স্তরে বিশেষায়িত কমান্ডো বাহিনীর নেতৃত্বে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



