নন্দীগ্রামে নিহত সহকারীর মা, রেজিনগরে বহুমুখী লড়াই: উপনির্বাচনে প্রতীকও প্রশ্নে

যা জানা জরুরি
- নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনের মনোনয়নপর্ব শেষ হওয়ার মুখে বিজেপি ১৫ সেপ্টেম্বর দুই প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
- নন্দীগ্রামে প্রার্থী হাসিরানি রথ, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নিহত সহকারী চন্দ্রনাথ রথের মা।
- রেজিনগরে প্রার্থী হয়েছেন বিজেপির প্রাক্তন মুর্শিদাবাদ জেলা সভাপতি শাখারভ সরকার।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনের মনোনয়নপর্ব শেষ হওয়ার মুখে বিজেপি ১৫ সেপ্টেম্বর দুই প্রার্থী ঘোষণা করেছে। নন্দীগ্রামে প্রার্থী হাসিরানি রথ, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নিহত সহকারী চন্দ্রনাথ রথের মা। রেজিনগরে প্রার্থী হয়েছেন বিজেপির প্রাক্তন মুর্শিদাবাদ জেলা সভাপতি শাখারভ সরকার। ভোট ৬ অক্টোবর, গণনা ৯ অক্টোবর। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ফল শুধু দুই আসনের প্রতিনিধি বাছবে না; মে মাসের ক্ষমতাবদলের পরে নতুন সরকার ও বিভক্ত বিরোধীদের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী পরীক্ষা হবে।
নন্দীগ্রাম আসনটি খালি হয়েছে শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর—দুই কেন্দ্র থেকে জিতে একটি ছেড়ে দেওয়ায়। রেজিনগরে হুমায়ুন কবীর দুই কেন্দ্র জয়ের পরে আসনটি ছেড়েছেন। নন্দীগ্রামে হাসিরানির মনোনয়ন একটি ব্যক্তিগত শোককে নির্বাচনী কাহিনির কেন্দ্রে এনেছে। চন্দ্রনাথকে ৬ মে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে গুলি করে হত্যা করা হয়; তদন্ত এখন সিবিআইয়ের হাতে। কে নির্দেশ দিয়েছিল বা রাজনৈতিক যোগ ছিল কি না, তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
মুখ্যমন্ত্রী ১৫ সেপ্টেম্বর মনোনয়ন জমার অনুষ্ঠানে হত্যার পিছনে ‘ভাইপো গ্যাং’ এবং দু’কোটি টাকার সুপারির অভিযোগ করেছেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি কারও নাম বলেননি এবং দাবিটির সমর্থনে আদালতে গৃহীত প্রমাণ সামনে আসেনি। ফলে এটি রাজনৈতিক অভিযোগ, তদন্তের সিদ্ধান্ত নয়। নিহতের মাকে প্রার্থী করা সহমর্মিতা তৈরি করতে পারে; কিন্তু ভোটারকে একই সঙ্গে এলাকার কাজ, প্রার্থীর নিজস্ব অবস্থান এবং মামলার নিরপেক্ষ অগ্রগতি আলাদা করে বিচার করতে হবে।
প্রতিদ্বন্দ্বীর তালিকাও দীর্ঘ। নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-নেতৃত্বাধীন তৃণমূল গোষ্ঠী সঞ্চিতা প্রধান দে, কংগ্রেস মিলন প্রধান এবং সিপিআই শান্তিগোপাল গিরিকে প্রার্থী করেছে। আইএসএফও আলাদাভাবে লড়ার কথা জানিয়েছে। রেজিনগরে রবিুল আলম চৌধুরী, আবদুল্লাহিল কাফি, সিপিএমের সৈয়দ আসাদ আলি এবং আরএসপির বিকাশচন্দ্র মিশ্রসহ একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। হুমায়ুন কবীরের ছেলে গোলাম নবী আজাদও লড়ছেন। চূড়ান্ত বৈধ তালিকা মনোনয়ন যাচাই ও প্রত্যাহারের পরে স্থির হবে।
জটিলতার আর একটি স্তর তৃণমূলের ‘জোড়া ফুল’ প্রতীক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-নেতৃত্বাধীন দুই গোষ্ঠী নিজেদের বৈধ দল দাবি করেছে। নির্বাচন কমিশন ১৫ সেপ্টেম্বর রাত পর্যন্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি; ১৬ সেপ্টেম্বর অতিরিক্ত নথি দেওয়ার সময়সীমা ছিল। কমিশনের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোন গোষ্ঠী পরিচিত নাম ও প্রতীক পাবে, তা নিশ্চিত বলা যাবে না। পরিচিত প্রতীক না পেলে প্রচার, ইভিএমে পরিচয় এবং বুথকর্মীদের প্রশিক্ষণ বদলাতে হবে।
প্রতীক-বিতর্কের নিষ্পত্তিতে কমিশন সাধারণত দলের সংবিধান, সাংগঠনিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমর্থনের মতো উপাদান দেখে। অন্তর্বর্তী সময়ে দুই পক্ষকেই আলাদা নাম বা প্রতীক দেওয়ার পথও থাকে। কিন্তু এখানে মনোনয়ন ও প্রচারের সময় খুব কম। তাই সিদ্ধান্তের যুক্তি দ্রুত প্রকাশ না হলে ভোটারের বিভ্রান্তি এবং পরে আদালতে চ্যালেঞ্জ—দু’টিরই ঝুঁকি বাড়বে। প্রশাসনের উচিত বুথে প্রার্থীর নাম ও ছবি স্পষ্টভাবে প্রচার করা।
নন্দীগ্রামে শোকের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং রেজিনগরে সংখ্যালঘু ভোটের হিসাব সংবাদে প্রাধান্য পাবে। কিন্তু উপনির্বাচনের বৈধতা নির্ভর করবে নিরাপদ প্রচার, ব্যয়ের হিসাব, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটারের স্বাধীনতার উপর। সিবিআই তদন্তকে প্রচারের অস্ত্র করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনই তদন্তাধীন হত্যাকে নিছক নির্বাচনী নাটক বলা নিহত পরিবারের প্রতি অন্যায়।
দুই কেন্দ্রেই বহু গোষ্ঠী ও দলের উপস্থিতি ভোট ভাগ করতে পারে; কে লাভবান হবে, এখনই নিশ্চিত নয়। মে মাসের ফল পুনরাবৃত্তি হবে ধরে নেওয়ার কারণও নেই। প্রার্থী ঘোষণার খবরের পরের ধাপ হল হলফনামা, সম্পদ, অপরাধমূলক মামলা এবং স্থানীয় প্রতিশ্রুতির প্রকাশ্য তুলনা। ভোটারের জন্য আবেগ প্রাসঙ্গিক, কিন্তু প্রমাণ ও কর্মসূচিই হওয়া উচিত শেষ মানদণ্ড। নির্বাচন কমিশনকে প্রতীক-সিদ্ধান্তের পাশাপাশি প্রচারে সরকারি পদ, নিরাপত্তা ও জনসম্পদের ব্যবহারের উপর সমান নজর রাখতে হবে। দুই আসনেই সংবেদনশীল বুথের যুক্তি এবং বাহিনী মোতায়েনের নীতি ভোটের আগেই পরিষ্কার করলে পক্ষপাতের অভিযোগ কমবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



