লন্ডনের কংক্রিট-জঙ্গলের গাছেরা পেল পাঁচশো নতুন পরিবার

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: ফর্মে লিখতে হয়েছে নতুন গাছটিকে কোথায় রাখা হবে, কতটা আলো পৌঁছবে, এমনকি তার নাম কী হবে।
- তারপর বিশাল কাচঘরের ভিতরে খুঁজে বার করতে হয়েছে তার ‘মা’ গাছটিকে।
- লন্ডনের বারবিকান কনজারভেটরিতে গাছের চারা বিলির অনুষ্ঠানটি তাই নিছক বিনামূল্যে টব নেওয়ার সুযোগ নয়; আয়োজকেরা একে সাজিয়েছেন দত্তক নেওয়ার রীতিতে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: ফর্মে লিখতে হয়েছে নতুন গাছটিকে কোথায় রাখা হবে, কতটা আলো পৌঁছবে, এমনকি তার নাম কী হবে। তারপর বিশাল কাচঘরের ভিতরে খুঁজে বার করতে হয়েছে তার ‘মা’ গাছটিকে। লন্ডনের বারবিকান কনজারভেটরিতে গাছের চারা বিলির অনুষ্ঠানটি তাই নিছক বিনামূল্যে টব নেওয়ার সুযোগ নয়; আয়োজকেরা একে সাজিয়েছেন দত্তক নেওয়ার রীতিতে। ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, শহরের পাঁচশো মানুষ এই অভিনব প্রক্রিয়ায় ইতিহাসের একটি জীবন্ত টুকরো ঘরে নিয়ে গিয়েছেন।
মধ্য লন্ডনের বারবিকান আবাসন ও শিল্পকেন্দ্র মূলত তার কঠোর কংক্রিট স্থাপত্যের জন্য পরিচিত। তার ভিতরেই কনজারভেটরিটি এক বিপরীত জগৎ—কাচের ছাদের নিচে প্রায় আটশো প্রজাতির গাছ, লতা ও গুল্ম। বিরল ও বিপন্ন উদ্ভিদও রয়েছে। বছরের শেষে বড় সংস্কারের জন্য জায়গাটি সাময়িক ভাবে বন্ধ হবে। পুরনো গাছগুলির যত বেশি সম্ভব বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি নতুন পরিবেশের উপযোগী সংগ্রহ তৈরির পরিকল্পনা চলছে।
তার আগে সুস্থ গাছগুলি থেকে হাজার হাজার চারা তৈরি করেছে উদ্যানকর্মীদের দল। বারবিকান ও নগর-বাগান নিয়ে কাজ করা ওয়েওয়ার্ড প্ল্যান্টসের যৌথ উদ্যোগে সেগুলির পাঁচশোটি দেওয়া হয়েছে সাধারণ মানুষের হাতে। দত্তকের তালিকায় ছিল সুইস চিজ প্ল্যান্ট, স্পাইডার প্ল্যান্ট, অ্যারোহেড লতা, পার্পল হার্ট, সুইডিশ আইভি ও পেপেরোমিয়া। প্রতিটি চারার সঙ্গে দেওয়া হয়েছে আলো, জল ও আর্দ্রতার নির্দেশিকা।
বারবিকান এলাকার বাসিন্দা লিডিয়া গোল্ডবার্গ তাঁর সুইডিশ আইভির নাম রেখেছেন ‘নিকো’। অন্য আবেদনকারীরাও গাছটির সম্ভাব্য বাসস্থানের ছবি এঁকেছেন বা লিখে বুঝিয়েছেন কী ভাবে তার যত্ন নেবেন। শুনতে খানিকটা বাড়াবাড়ি মনে হলেও এর মধ্যে একটি গুরুতর বার্তা রয়েছে। শহরে ঘরের গাছ প্রায়ই সাজসজ্জার পণ্য হয়ে আসে এবং অবহেলায় মারা যায়। দত্তকের ভাষা মালিকানার বদলে পরিচর্যার দায়িত্বটিকে সামনে আনে।
কনজারভেটরিটির বর্তমান পরিকাঠামোয় পুরনো হয়ে যাওয়া কাচ, সীমিত প্রবেশগম্যতা এবং আধুনিক জলবায়ু-নিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে। উদ্যানটি সংস্কারের পরে ২০৩০ সালে আবার খোলার পরিকল্পনা। তখন চলাচলে অসুবিধা থাকা দর্শকদের প্রবেশ সহজ হবে এবং সপ্তাহের প্রতিদিন খোলা রাখার লক্ষ্য রয়েছে। প্রধান উদ্যানপালক মার্তা লোভচেভিচের দল মূল সংগ্রহ সংরক্ষণের সঙ্গে ক্রমশ উষ্ণ হয়ে ওঠা আবহাওয়ার উপযোগী গাছও বাছবে।
এখানে বিদায়ের মধ্যেও পুনর্মিলনের পরিকল্পনা রয়েছে। চারাগুলি কনজারভেটরির বাইরে বড় হবে, অথচ তাদের মূল গাছ থেকে যাবে বারবিকানের ভিতরে। সংস্কার শেষ হলে কোনও কোনও দত্তকগ্রহীতা হয়তো বহু বছরের বড় হয়ে ওঠা নিজের গাছ নিয়ে আবার ফিরবেন। তখন একটি সরকারি উদ্যানের ইতিহাস বহু ব্যক্তিগত বসার ঘর, জানলার ধাপ ও বারান্দার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে।
বিশ্লেষণ: শহরের প্রকৃতি নিয়ে আলোচনায় সাধারণত নতুন পার্ক, গাছের সংখ্যা বা দূষণের পরিমাপ আসে। বারবিকানের উদ্যোগটি সম্পর্কের একটি ক্ষুদ্রতর মাপকাঠি সামনে এনেছে। একটি চারা জল চাইলে তাকে নিয়মিত দেখতে হয়; তার নতুন পাতা শহুরে মানুষের কাছে ঋতু ও সময়ের দৃশ্যমান চিহ্ন হয়ে ওঠে। পাঁচশো গাছ লন্ডনের পরিবেশ বদলে দেবে না, কিন্তু পাঁচশো পরিবারকে পরিচর্যার দৈনন্দিন অনুশীলনে যুক্ত করতে পারে।
এই অনুষ্ঠানের রসটুকুও তাই নিষ্পাপ। মানুষ গাছের অভিভাবক হওয়ার যোগ্যতা লিখে দিচ্ছেন, গাছের বংশপরিচয় খুঁজছেন, তারপর নামকরণ করছেন। কিন্তু সেই খেলার আড়ালে শহরের একটি ঐতিহাসিক সবুজ ভাণ্ডার বন্ধ থাকার বছরগুলিতেও ছড়িয়ে বেঁচে থাকবে। কংক্রিটের বারবিকান তার গাছগুলিকে বিদায় দেয়নি; সাময়িক ভাবে প্রতিবেশীদের কাছে রেখে দিয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



