ব্রিকস সম্মেলনের তিন দিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ১৫টি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। চিন, রাশিয়া ও ইরানের পাশাপাশি মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ইথিওপিয়া, মিশর, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর নেতৃত্বের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বৃহৎ বহুপাক্ষিক সম্মেলনের একটি অদৃশ্য সুবিধা হল, বহু নেতাকে আলাদা সফর ছাড়াই একই শহরে পাওয়া যায়। আনুষ্ঠানিক অধিবেশনের ফাঁকে ২০ বা ৩০ মিনিটের বৈঠকেও আটকে থাকা প্রকল্প, ভবিষ্যৎ মন্ত্রীপর্যায়ের আলোচনা এবং রাজনৈতিক বার্তা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। তবে বৈঠকের সংখ্যা দিয়ে ফল মাপা যায় না।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, অর্ধপরিবাহী, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, পরিচ্ছন্ন শক্তি, পরিকাঠামো এবং দক্ষ কর্মীর চলাচল নিয়ে কথা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী অর্ধপরিবাহী সরবরাহে মালয়েশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভারতের লক্ষ্য উৎপাদন ও নকশা-ব্যবস্থায় নিজের অংশ বাড়ানো।

ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, খনিজ, স্বাস্থ্য ও ভারতীয় বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে চিনের পরিকাঠামো বিনিয়োগের তুলনায় দিল্লি পিছিয়ে পড়েছে। ইথিওপিয়ায় বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রস্তাব সেই ব্যবধান কমানোর অংশ।

ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী লে মিন হুংয়ের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বিরল মৃত্তিকা ও মহাকাশ সহযোগিতা এসেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২৫ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য এবং বিদেশ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের ‘দুই যোগ দুই’ বৈঠক প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। দক্ষিণ চিন সাগরের প্রেক্ষাপটে সম্পর্কটির কৌশলগত গুরুত্বও রয়েছে।

রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা, ইরানের সঙ্গে চাবাহার ও আঞ্চলিক স্থিতি, এবং চিনের সঙ্গে সীমান্ত ও বাণিজ্য—প্রতিটি সম্পর্কের আলাদা ঝুঁকি। একই সম্মেলনে সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ভারতের বহু-মুখী পররাষ্ট্রনীতির পরিচয়। কিন্তু পরস্পরবিরোধী অংশীদারদের প্রত্যাশা সামলানোও কঠিন।

সরকারি বিবৃতিতে প্রায় সব বৈঠকেই ‘সম্পর্ক গভীর করা’ বা ‘সহযোগিতা বাড়ানো’র ভাষা থাকে। পাঠকের জন্য প্রয়োজন পরবর্তী নির্দিষ্ট ফল: চুক্তির মূল্য, প্রকল্পের সময়সীমা, বাজারে প্রবেশ এবং নিরাপত্তা-সহযোগিতার বাস্তব কাঠামো। এগুলি ছাড়া পনেরো বৈঠক মূলত কূটনৈতিক পরিশ্রমের সংখ্যা।

দিল্লি ব্রিকসকে শুধু যৌথ ঘোষণা তৈরির মঞ্চ রাখেনি; ভারতীয় স্বার্থের বহু পৃথক দরজা খোলার চেষ্টা করেছে। এখন বিদেশমন্ত্রক ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিকে প্রতিটি দরজার পিছনের কাজ এগিয়ে নিতে হবে। ছয় মাস পরে কতগুলি চুক্তি কার্যকর হল, সেই হিসাবই এই কূটনৈতিক দৌড়ের প্রকৃত ফলাফল।