সুমাত্রার গভীর অরণ্য থেকে পাঁচটি অবোধ ওরাংওটাং শাবক উদ্ধার—আপাতদৃষ্টিতে একটি উদ্ধারকাণ্ড হলেও, এর নেপথ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে অনেক বড় চক্রান্ত। ইন্দোনেশিয়ার এক সরকারি আধিকারিকের কথায়, ঘটনার সুতো ধরে টান দিলে বেরিয়ে আসতে পারে একটি ‘‘সংগঠিত আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণ পাচারচক্রʼʼ-এর অস্তিত্ব, আর সেই সম্ভাবনাকেই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

ইন্দোনেশিয়ার বন মন্ত্রকের অধীন প্রজাতি ও জিনগত সংরক্ষণ অধিদফতর বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে ভারতের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের বন বিভাগের মহাপরিচালক ও বিশেষ সচিব এবং সাইটিস পরিচালন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত সুশীলকুমার অবস্থীকে চিঠি দিয়েছে।

অবস্থী ইন্দোনেশিয়ার চিঠি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বন কর্তৃপক্ষকে প্রথমে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষ করতে হবে। প্রাণীগুলিকে কার হেফাজতে রাখা হবে, কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে কিংবা হস্তান্তর করা হবে কি না—এই সংক্রান্ত যে কোনও সিদ্ধান্তের জন্য উপযুক্ত আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন।

বিপন্ন বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত সনদ বা সাইটিসের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রিত হয়। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি পুরনো এই বহুপাক্ষিক চুক্তির উদ্দেশ্য হল, ওই বাণিজ্য যাতে বৈধ ও দীর্ঘমেয়াদে সহনীয় হয়, প্রাণী ও উদ্ভিদের উৎস ও লেনদেনের গতিপথ শনাক্ত করা যায় এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে কোনও প্রজাতির অস্তিত্ব বিপন্ন না হয়, তা নিশ্চিত করা। চুক্তির প্রথম পরিশিষ্টে অন্তর্ভুক্ত বিপন্ন প্রজাতিগুলির বাণিজ্য নিষিদ্ধ। ওরাংওটাংও সেই তালিকায় রয়েছে।

ওরাংওটাংয়ের প্রাকৃতিক আবাস ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার বোর্নিও এবং সুমাত্রার বৃষ্টিবন। প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের লাল তালিকা অনুযায়ী, প্রাণীটি ‘মহাবিপন্ন’।

চিঠিতে ইন্দোনেশিয়া উদ্ধার হওয়ার ঘটনাটি, প্রাণীগুলির প্রজাতি ও স্বাস্থ্যের অবস্থা, চলতি তদন্ত এবং জিনগত নমুনা সংগ্রহ-সহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য চেয়েছে। প্রজাতি ও উৎস যাচাইয়ে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা করতেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। প্রাণীগুলি সে দেশ থেকেই এসেছে বলে নিশ্চিত হলে, তাদের ফিরিয়ে নিতে সাইটিস এবং সংশ্লিষ্ট জাতীয় আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বন্যপ্রাণ পাচারচক্রের আশঙ্কার মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার বন আইন প্রয়োগের মহাপরিদফতরকেও যুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রিবাদী। সম্ভাব্য পাচারপথ, ভারতে প্রবেশের স্থান, মাঝপথে কোন কোন দেশ দিয়ে প্রাণীগুলিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং তদন্তের প্রাথমিক ফলাফল সম্পর্কে তথ্য চেয়েছে ইন্দোনেশিয়া।

তিনি বলেন, ‘‘প্রমাণে যদি ইন্দোনেশিয়ার বিচারিক এক্তিয়ারের মধ্যে কোনও ব্যক্তি, লেনদেন, প্রাণী সংগ্রহের কেন্দ্র কিংবা অন্য কোনও যোগসূত্র উঠে আসে, তবে সংশ্লিষ্ট ইন্দোনেশীয় কর্তৃপক্ষ জাতীয় আইন এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির সহযোগিতার মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ করবে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে, এই পর্যায়ে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা চক্রকে চিহ্নিত করা অপরিণত পদক্ষেপ হবে।’’

প্রাণীগুলির শারীরিক গঠন ও বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ থেকে সন্দেহ করা হচ্ছে, সেগুলি সুমাত্রা থেকে এসেছে। তবে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য, ওই পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের প্রজাতি ও ভৌগোলিক উৎস নির্ধারণের পাশাপাশি জানা যাবে, তারা সরাসরি প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে এসেছে, নাকি আগে বন্দিদশায় ছিল।

এদিকে, ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার প্রধান নির্বাহী জোস লুইস বলেন, ‘‘প্রকৃতপক্ষে প্রাণীগুলি ঠিক কোথা থেকে এসেছে, তা আমরা জানি না। তবে আমরা জানি, সেগুলি ইন্দোনেশিয়া অথবা মালয়েশিয়ার হতে পারে। একমাত্র ডিএনএ নমুনা পরীক্ষাই নির্ধারণ করতে পারে, তারা কোন অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ভারতের সামনে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। সঠিক পদক্ষেপ করা এবং প্রাণীগুলিকে তাদের সম্ভাব্য উৎসের দেশে ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’’