‘আন্তর্জাতিক আইন ভাঙলে সরব হোক ভারত’: প্যালেস্তাইন

যা জানা জরুরি
- আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ভারতকে আরও স্পষ্ট ও জোরালো অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানাল প্যালেস্তাইন।
- প্যালেস্তাইনের বিদেশমন্ত্রী ভারসেন আগাবেকিয়ান শাহিনের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের বাড়তে থাকা প্রভাব, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্য এবং একই সঙ্গে ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইনের সঙ্গে সম্পর্ক নয়াদিল্লিকে…
- সেই কূটনৈতিক ওজন কাজে লাগিয়ে প্যালেস্তাইনি জনগণের অধিকার রক্ষায় ভারত আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ভারতকে আরও স্পষ্ট ও জোরালো অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানাল প্যালেস্তাইন। প্যালেস্তাইনের বিদেশমন্ত্রী ভারসেন আগাবেকিয়ান শাহিনের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের বাড়তে থাকা প্রভাব, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্য এবং একই সঙ্গে ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইনের সঙ্গে সম্পর্ক নয়াদিল্লিকে একটি অনন্য অবস্থানে রেখেছে। সেই কূটনৈতিক ওজন কাজে লাগিয়ে প্যালেস্তাইনি জনগণের অধিকার রক্ষায় ভারত আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।
‘দ্য হিন্দু’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শাহিন বলেন, প্যালেস্তাইন প্রশ্নে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই ন্যায়, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু নীতিগত সমর্থন যথেষ্ট নয়। অধিকৃত ভূখণ্ডে আন্তর্জাতিক আইন বা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘিত হলে ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের প্রকাশ্য প্রতিবাদ জরুরি।
ইজরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেও ভারত প্যালেস্তাইনের পাশে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করেন শাহিন। তাঁর বক্তব্য, প্যালেস্তাইন ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ইজরায়েলের সঙ্গে তার সম্পর্কের বাস্তবতা বোঝে। কিন্তু কোনও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার দায়কে আড়াল করতে পারে না। গাজা ও পশ্চিম তীরে যা ঘটছে, তা শুধু প্যালেস্তাইনি জনগণের সংকট নয়; এর সঙ্গে গোটা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও জড়িত।
গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা নিয়েও সতর্ক আশাবাদী শাহিন। তাঁর মতে, ট্রাম্প পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে আন্তরিক ভাবে এগোচ্ছেন। তবে সাফল্য নির্ভর করবে তার কার্যকর প্রয়োগ, ইজরায়েলের উপর প্রয়োজনীয় চাপ এবং প্যালেস্তিনীয় জনগণের রাজনৈতিক অধিকার স্বীকার করার উপর।
শাহিনের মতে, যুদ্ধবিরতি শান্তির সূচনা হতে পারে, শেষ নয়। গাজায় নির্বিঘ্নে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো, বাস্তুচ্যুত মানুষকে ঘরে ফেরানো, ধ্বংসস্তূপ পুনর্গঠন এবং গাজা ও পশ্চিম তীরের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক ঐক্য বজায় রাখা জরুরি। কোনও অস্থায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা সীমিত পুনর্গঠন প্রকল্প স্বাধীন প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রের বিকল্প হতে পারে না।
গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে তাই তিনি সতর্ক করেছেন। এমন কোনও ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়, যা দীর্ঘমেয়াদে গাজাকে পশ্চিম তীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় কিংবা নতুন কোনও কাঠামোর আড়ালে ইজরায়েলি দখলকে স্থায়ী করে। প্যালেস্তিনীয় কর্তৃপক্ষের সংস্কার এবং নির্বাচন প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই সংস্কারের শর্তে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া যায় না।
ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পর্ষদে ভারতের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও ইতিবাচক শাহিন। তাঁর বক্তব্য, ভারত নিজের জাতীয় স্বার্থ, আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে তার অবস্থান এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বিচার করেই সিদ্ধান্ত নেবে। তবে গাজার পুনর্গঠনে ভারতের বড় ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা তৈরিতে ভারতের অভিজ্ঞতা প্যালেস্তাইনের কাজে লাগতে পারে।
ভারত-প্যালেস্তাইন সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাসও তুলে ধরেছেন শাহিন। উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন, জোটনিরপেক্ষতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের আদর্শগত সম্পর্ক রয়েছে। ভারত ১৯৭৪ সালে প্যালেস্তাইন মুক্তি সংস্থাকে প্যালেস্তাইনি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ১৯৮৮ সালে প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দিকের দেশগুলির অন্যতম ছিল।
অন্যদিকে, গত কয়েক দশকে ভারত-ইজরায়েল প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতাও উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি প্যালেস্তাইনি কর্তৃপক্ষকে উন্নয়ন সহায়তা এবং রাষ্ট্রপুঞ্জে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে সমর্থন অব্যাহত রেখেছে নয়াদিল্লি। শাহিনের আবেদন, এই ভারসাম্য যেন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নীরব থাকার কারণ না হয়ে ওঠে।
প্যালেস্তাইনের বিদেশমন্ত্রীর বার্তা তাই স্পষ্ট—ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগ নিয়ে আশাবাদ থাকলেও আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় শক্তিধর দেশগুলির আরও সক্রিয় হওয়া দরকার। তাঁর মতে, ভারত যদি নিজের ঐতিহাসিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও দৃঢ় ভাষায় কথা বলে, তবে তা শুধু প্যালেস্তাইনের জন্য নয়, নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



