শ্চিমবঙ্গে বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগ টানতে এ বার মুম্বইয়ে মুকেশ আম্বানির সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পাশাপাশি, ২৪ সেপ্টেম্বর রাজ্যে আসার কথা গৌতম আদানির। শুক্রবার কলকাতায় এই কর্মসূচির কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। গণেশ উৎসবের পরে মুকেশ ও তাঁর পুত্র অনন্ত আম্বানির সঙ্গে দেখা করতে যাবেন তিনি।

এর আগে শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত নৈশভোজে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন শুভেন্দু। অনন্ত আম্বানি তাঁকে ফোন করে পরিবারের গণেশপুজোয় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নে দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলির অংশগ্রহণ বাড়ানোই তাঁর লক্ষ্য। তবে মুম্বইয়ের বৈঠকের নির্দিষ্ট দিন কিংবা রিলায়্যান্সের কোনও নতুন প্রকল্পের চূড়ান্ত ঘোষণা এখনও এই প্রতিবেদনে নেই।

কলকাতায় আগরওয়াল গোষ্ঠীর পোশাকের বিপণি উদ্বোধনে শুভেন্দু দাবি করেন, চার মাসেই তাঁর সরকার শিল্পের অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলেছে। আগের তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ করে তাঁর অভিযোগ, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও বেআইনি অর্থ আদায়ের কারণে রাজ্যের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি বদলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

আদানিদের সঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নিউ টাউন এলাকায় প্রস্তাবিত দুই হাজার শয্যার হাসপাতাল। ২৪ সেপ্টেম্বর তার শিলান্যাসে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে গৌতম আদানিরও উপস্থিত থাকার কথা। শুভেন্দু আগে বলেছিলেন, হাসপাতালের অর্ধেক শয্যা আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের জন্য রাখা হবে। পাশাপাশি তাঁর দাবি, হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের ছয় হাজার কোটি টাকার সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। দুর্গাপুজোর আগেই সেটির উদ্বোধন করতে চান তিনি।

বিনিয়োগের প্রস্তুতিতে জমি দেওয়ার প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে বলে সরকারের দাবি। দুর্গাপুজোর আগে ৩৩টি শিল্পসংস্থার হাতে জমি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে আমুলের দু’টি আইসক্রিম কারখানার জন্য জমি চিহ্নিত হয়েছে। এল অ্যান্ড টি প্রায় ৭.৪৫ লক্ষ বর্গফুটের তথ্যকেন্দ্র গড়ছে। গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্সেও চারটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, জমি দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থার আর্থিক সামর্থ্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনও সংস্থা ব্যাঙ্ক জালিয়াতিতে জড়িত কি না, তাও যাচাইয়ের কথা বলেছেন তিনি। জমির ব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিশ্রুতি এবং পরিবেশের বিষয়গুলি বিবেচনা করেই শিল্পপ্রস্তাব নিয়ে এগোনোর কথা জানিয়েছে সরকার।

প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও বিনিয়োগের চেষ্টা চলছে। পূর্ব মেদিনীপুরের জুনপুটে প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার প্রকল্প নিয়ে আগের সরকার চিঠির উত্তর দেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন শুভেন্দু। তাঁর সরকার উত্তর দিয়েছে। সেখানে অস্ত্রব্যবস্থা পরীক্ষার কেন্দ্র গড়ার পরিকল্পনার উল্লেখ রয়েছে। তবে মুখ্যমন্ত্রী প্রকল্পটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।

জাপানের মিৎসুবিশি রাজ্যে অর্ধপরিবাহী তৈরির কারখানায় আগ্রহ দেখিয়েছে। শুভেন্দুর বক্তব্য অনুযায়ী, আগরওয়াল গোষ্ঠী আগামী তিন বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। পুরুলিয়ায় সংস্থাটি একশো একর জমি কিনেছে; সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য এক হাজার একর জমি কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগরওয়াল গোষ্ঠীর বিপণির সংখ্যা ১১০ থেকে বাড়িয়ে ২৫০ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে কাজের সুযোগ বাড়বে বলে তাঁর আশা। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের শিলান্যাসে নিজে উপস্থিত থাকার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

আম্বানির সঙ্গে প্রস্তাবিত বৈঠককে অবশ্য রিলায়্যান্সের প্রথম বঙ্গমুখী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যাবে না। ২০২৫ সালের বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনে মুকেশ আম্বানি দশকের শেষের মধ্যে আরও পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা জানিয়েছিলেন। তার ফলে রাজ্যে গোষ্ঠীর মোট প্রস্তাবিত বিনিয়োগ এক লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছনোর কথা। ডিজিটাল পরিষেবা, পরিবেশবান্ধব শক্তি ও খুচরো ব্যবসা ছিল সেই পরিকল্পনার ক্ষেত্র। ফলে আসন্ন আলোচনায় আগের প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি এবং নতুন প্রস্তাবের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

এই উদ্যোগের পটভূমিতে রয়েছে জমি ও অনুমোদন সংক্রান্ত নীতি বদলের ঘোষণা। শিল্পের প্রয়োজনে সরাসরি জমি কিনে বিনিয়োগকারীদের দেওয়ার কথা বলেছেন শুভেন্দু। একশো কোটি টাকা বা তার বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাবের জন্য এক জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও ঘোষণা করেছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত জানিয়েছিলেন, ছোট ছোট জমি একত্র করে শিল্পের উপযোগী বড় জমি তৈরির বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে। শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়ের দাবি ছিল, নতুন সরকারের প্রথম তিন মাসে আটাশ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে। ওই প্রতিবেদনে আদানি গোষ্ঠীর স্বাস্থ্যনগরীর প্রাথমিক বিনিয়োগ আড়াই হাজার কোটি টাকা বলে উল্লেখ ছিল। কলকাতার অ্যাডভেন্টজ গোষ্ঠীর পণ্য পরিবহণ, গুদাম এবং ট্যাঙ্কার তৈরির পরিকাঠামোয় সতেরোশো কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণার কথাও জানানো

বড় শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্যও নতুন নীতির কথা বলেছে সরকার। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি আলোচনাসভায় মন্ত্রী দীপক বর্মণ জানান, নতুন উদ্যোক্তাদের পরামর্শ, বাজারে পৌঁছনোর সুযোগ এবং বিনিয়োগ পেতে সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা গড়া হচ্ছে। স্থানীয় দুষ্কৃতীদের বেআইনি দাবি ও হস্তক্ষেপ থেকে শিল্পকে রক্ষার জন্য আইন আনার কথাও বলেন তিনি। তাঁর দাবি অনুযায়ী, রাজ্যের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পে দুই কোটির বেশি মানুষ কাজ করেন। কর্মসংস্থানের বিচারে এই ক্ষেত্রের গুরুত্ব তাই সরকারি বক্তব্যেও স্বীকৃত

সব মিলিয়ে ঘোষণাগুলি থেকে বোঝা যাচ্ছে, শিল্পপতিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং প্রশাসনিক সহায়তাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে চাইছে সরকার। সাফল্যের মূল্যায়নে অবশ্য বিনিয়োগের প্রস্তাব, জমি বরাদ্দ, নির্মাণ শুরু এবং উৎপাদন চালু হওয়ার হিসাব আলাদা করে দেখা দরকার। কত টাকা বাস্তবে এল, কত স্থায়ী কাজ তৈরি হল, স্থানীয় মানুষ কতটা সুযোগ পেলেন—এই তথ্যগুলিই শেষ পর্যন্ত নতুন শিল্পনীতির কার্যকারিতা বুঝতে সাহায্য করবে। প্রকল্পভিত্তিক সময়সীমা প্রকাশিত হলে অগ্রগতি যাচাই করাও সহজ হবে।