বিবাহিত সম্পর্কে স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনসংসর্গ হলে তিনি অবশ্যই নির্যাতনের শিকার। কিন্তু রাষ্ট্রের আইন সেই কাজকে ‘ধর্ষণ’ বলে সংজ্ঞায়িত না করলে আদালত কি ধর্ষণের অভিযোগে বিচারের অনুমতি দিতে পারে? বৈবাহিক ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এই প্রশ্ন তুলল সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করেছে, বিয়ে কোনও নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা মুছে দিতে পারে না। ফলে নির্যাতিতার সুরক্ষা এবং প্রচলিত আইনের সাংবিধানিক বৈধতা—দু’টিই বিচার্য।

বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনার বেঞ্চে বিষয়টি ওঠে। কেন্দ্রের তরফে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত আইনসভা ও সরকারের এক্তিয়ারভুক্ত; আদালতের নয়। বেঞ্চ জানিয়েছে, তিন সপ্তাহ পরে আবেদনগুলির চূড়ান্ত শুনানি শুরু হবে। বুধবার ও বৃহস্পতিবার শুনানির জন্য বিষয়টি তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৬৩ ধারার দ্বিতীয় ব্যতিক্রম। সেখানে বলা হয়েছে, স্ত্রীর বয়স আঠারো বছরের কম না হলে স্বামীর সঙ্গে তাঁর যৌনসংসর্গ বা যৌনক্রিয়া ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে না। আগের ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারাতেও বৈবাহিক সম্পর্কের জন্য এই ধরনের ছাড় ছিল। নতুন অপরাধবিধিতেও সেই মূল ছাড় বজায় রয়েছে। আবেদনকারীরা এই সুরক্ষার সাংবিধানিক বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ করেছেন।

বিচারপতি বাগচীর বক্তব্যে নির্যাতনের বাস্তবতা এবং তার আইনি শ্রেণিবিভাগের ফারাক উঠে আসে। অনিচ্ছাকৃত যৌনসংসর্গের শিকার ব্যক্তিকে নির্যাতিত হিসেবে স্বীকার করেও তিনি প্রশ্ন করেন, রাষ্ট্র বিষয়টিকে ধর্ষণ বলে সংজ্ঞায়িত করেছে কি না। তাঁর পর্যবেক্ষণের তাৎপর্য, কোনও আচরণ গুরুতর অন্যায় হলেই বিদ্যমান ফৌজদারি আইনের নির্দিষ্ট অপরাধের সংজ্ঞা উপেক্ষা করে বিচার চালানো যায় কি না, আদালতকে সেই সমস্যারও উত্তর দিতে হবে।

বেঞ্চের সামনে তাই দু’টি পৃথক প্রশ্ন। প্রথমত, বৈবাহিক ধর্ষণের ছাড়টি বহাল থাকা অবস্থাতেই স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা চালানো সম্ভব কি না। দ্বিতীয়ত, ওই ছাড় সংবিধানসম্মত কি না। বিচারপতি বাগচী অপরাধের অভিপ্রায়, দায়বদ্ধতা এবং সাংবিধানিক ব্যাখ্যার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যের মর্ম, ফৌজদারি দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে নাগরিকের কাছে আইনের অবস্থান স্পষ্ট থাকার বিষয়টিও আদালতের বিবেচনায় রাখতে হবে।

আবেদনকারীদের এক পক্ষের আইনজীবী করুণা নন্দী যুক্তি দেন, বৈবাহিক সম্পর্ক স্ত্রীকে গুরুতর আঘাত করার দায় থেকে স্বামীকে রক্ষা করতে পারে না। স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনক্রিয়া বা মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি করার অনুমতি বিয়ের মাধ্যমে পাওয়া যায় না। এর জবাবে বিচারপতি বাগচী বলেন, গুরুতর আঘাত বা মৃত্যু ঘটলে অন্য আইনি বিধান রয়েছে; বৈবাহিক ধর্ষণের ব্যতিক্রম অপরাধীকে সেই দায় থেকে সুরক্ষা দেয় না।

কেন্দ্র অবশ্য বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার বিরোধিতায় নিজের অবস্থান বজায় রেখেছে। সরকারের যুক্তি, বিষয়টির সঙ্গে বিবাহপ্রতিষ্ঠান এবং দাম্পত্য স্থিতির মতো সামাজিক প্রশ্ন জড়িত। আগের হলফনামায় কেন্দ্র বলেছিল, বিবাহের মধ্যে যৌন নির্যাতনের প্রতিকারের জন্য বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থাগুলি রয়েছে। তাকে বিবাহের বাইরের ধর্ষণের সঙ্গে একইভাবে বিবেচনা করলে গুরুতর সামাজিক প্রভাব পড়তে পারে। এগুলি কেন্দ্রের যুক্তি; আদালতের সিদ্ধান্ত নয়।

বর্তমান আইনের অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে আরও একটি বিধান প্রাসঙ্গিক। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৬৭ ধারা অনুযায়ী, আলাদা থাকা স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া যৌনসংসর্গ করলে স্বামীর দুই থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে। আলাদা থাকার জন্য আদালতের বিচ্ছেদসংক্রান্ত নির্দেশ থাকতেই হবে, এমন শর্তও নেই। ফলে বিবাহিত সম্পর্কে সম্মতিহীন যৌনসংসর্গের সব পরিস্থিতিকেই আইন একইভাবে ছাড় দেয়—এমন ধারণা সঠিক নয়।

সম্মতির প্রশ্নটিও আইনের ভাষায় নির্দিষ্ট। ৬৩ ধারায় সম্মতি বলতে কোনও নির্দিষ্ট যৌনক্রিয়ায় অংশগ্রহণের দ্ব্যর্থহীন, স্বেচ্ছামূলক সম্মতিকে বোঝানো হয়েছে। শুধু শারীরিক প্রতিরোধ না করার অর্থ সম্মতি নয়। অথচ একই ধারার বৈবাহিক ব্যতিক্রম প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীর ক্ষেত্রে স্বামীকে ধর্ষণের অভিযোগ থেকে ছাড় দেয়। এই দুটি বিধানের পাশাপাশি অবস্থানই সম্মতি এবং বৈবাহিক পরিচয়ের সম্পর্ক নিয়ে মামলাটিকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে।

এই আইনি লড়াইয়ের উল্লেখযোগ্য পূর্বপর্ব দিল্লি হাই কোর্টের ২০২২ সালের বিভক্ত রায়। বিচারপতি রাজীব শকধের বৈবাহিক ধর্ষণের ছাড়কে অসাংবিধানিক মনে করেছিলেন। তাঁর মতে, এটি বৈষম্যমূলক এবং নারীর নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করে। অন্যদিকে বিচারপতি সি. হরি শঙ্কর ছাড়টির বৈধতা বজায় রাখার পক্ষে মত দেন। দুই বিচারপতিই সুপ্রিম কোর্টে আবেদনের অনুমতি দেওয়ায় বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতে পৌঁছয়।

একই সঙ্গে রয়েছে কর্নাটকের একটি মামলাও। সেখানে হাই কোর্ট স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে বিচার চলার পথ খুলেছিল। অভিযুক্ত সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যান। ২০২২ সালের জুলাইয়ে সর্বোচ্চ আদালত হাই কোর্টের রায়ে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেয়। ফলে বিতর্কটি শুধু ভবিষ্যতের আইন বদলের দাবি নয়; দায়ের হওয়া মামলায় বিচার কত দূর এগোবে, সেটিও বিচার্য।

বৃহত্তর সাংবিধানিক বিতর্কে আবেদনকারীদের প্রশ্ন, বিবাহিত হওয়ার কারণে কোনও নারী কেন যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে কম আইনি সুরক্ষা পাবেন? নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্তের অধিকার, সমান আইনি সুরক্ষা এবং মর্যাদার সঙ্গে এই ছাড়ের সামঞ্জস্য কোথায়? এই অবস্থানের বিপরীতে কেন্দ্র বিবাহপ্রতিষ্ঠানের বিশেষ সামাজিক চরিত্র এবং আইনসভার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে সামনে রাখছে। আদালতের বিচার তাই একটি ব্যতিক্রমী বিধানের ভবিষ্যতের সঙ্গে মৌলিক অধিকারের পরিসরও নির্ধারণ করবে।

তবে বুধবারের পর্যবেক্ষণকে বৈবাহিক ধর্ষণের পক্ষে অনুমোদন কিংবা অপরাধীকরণের চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যান হিসেবে পড়ার সুযোগ নেই। আদালত এখনও ব্যতিক্রমটি বাতিল করেনি, তার বৈধতা নিয়েও চূড়ান্ত রায় দেয়নি। পরবর্তী শুনানিতে নজর থাকবে, নির্যাতিতার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক বিচার কোন পথ নেয় এবং বিদ্যমান ফৌজদারি বিধানের সীমা কীভাবে নির্ধারণ করে। আপাতত প্রশ্নগুলি উন্মুক্ত রেখেই পূর্ণাঙ্গ শুনানির পথে এগিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।