মেয়াদ বৃদ্ধি ‘বেআইনি’, যাদবপুরে বদল রেজিস্ট্রার ও অর্থ আধিকারিক

যা জানা জরুরি
- কলকাতা: অস্থায়ী নিয়োগের মেয়াদ বৃদ্ধি ‘বেআইনি’ বলে আপত্তির জেরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বদল হল।
- ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সেলিম বক্স মণ্ডলের জায়গায় দায়িত্ব পেয়েছেন ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক দেবজিৎ দত্ত।
- অর্থ আধিকারিক শিলাদিত্য চট্টোপাধ্যায়ের পরিবর্তে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কলা অনুষদের সচিব ইন্দ্রজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কলকাতা: অস্থায়ী নিয়োগের মেয়াদ বৃদ্ধি ‘বেআইনি’ বলে আপত্তির জেরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বদল হল। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সেলিম বক্স মণ্ডলের জায়গায় দায়িত্ব পেয়েছেন ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক দেবজিৎ দত্ত। অর্থ আধিকারিক শিলাদিত্য চট্টোপাধ্যায়ের পরিবর্তে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কলা অনুষদের সচিব ইন্দ্রজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বুধবার প্রচারিত উচ্চশিক্ষা দফতরের চিঠি অনুযায়ী, আচার্য তথা রাজ্যপাল আর এন রবির এই নিয়োগ ছয় মাস অথবা পরবর্তী নির্দেশ পর্যন্ত বহাল থাকবে।
আচার্যের ২৬ অগস্টের নির্দেশে অভিযোগ, স্থায়ী নিয়োগের বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া শুরু করতে ব্যর্থ হয়েছে কর্মসমিতি। ১৯৮১ সালের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ১১(৩) এবং ১৩(৩) ধারার সীমা ছাড়িয়ে অস্থায়ী ব্যবস্থা চালানোয় প্রশাসন, শিক্ষাপরিচালনা ও আর্থিক শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যের পাল্টা বক্তব্য, স্থায়ী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। মেয়াদ বৃদ্ধির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের সময়ে সরকার ও আচার্যের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষক সংগঠন জুটার সহকারী সাধারণ সম্পাদক অরিন্দম শীলের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নেওয়া আইনি পরামর্শ অনুযায়ী, স্থায়ী পদাধিকারী সাময়িকভাবে কাজ করতে না পারলেই ছয় মাসের সীমা প্রযোজ্য; শূন্যপদে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নয়। তিনি এই পদক্ষেপকে স্বাধিকারে আঘাত বলেছেন। অন্যদিকে, আরএসএস-সমর্থিত শিক্ষক সংগঠনের সভাপতি ভাস্কর সর্দার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। উপাচার্য জানিয়েছেন, বাছাই কমিটিতে সরকার ও আচার্যের প্রতিনিধি প্রয়োজন। কর্মসমিতির প্রতিনিধি বাছাই হয়েছে; অনুমোদন পেলে নিয়োগের পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু হবে।
স্থায়ী নিয়োগের প্রস্তুতি নিয়েও সম্প্রতি মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছিল। ৩ সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেজিস্ট্রার ও অর্থ আধিকারিক বাছাইয়ের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচনের উদ্দেশ্যে ভার্চুয়াল কর্মসমিতির বৈঠক ডাকা হয়েছিল। বৈঠক আয়োজনের আগে উপাচার্য উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ও আচার্যের পরামর্শ চেয়েছিলেন। আরএসএস-সমর্থিত অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘ ওই বৈঠকের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। জুটার সদস্যদের পাল্টা যুক্তি ছিল, রাজ্য সরকারের অনুমোদনই বৈঠকের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে। ফলে রদবদলের আগেই নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি ঘিরে দুই শিক্ষক সংগঠনের অবস্থান আলাদা হয়ে গিয়েছিল। এখন পদে নতুন মুখ এলেও স্থায়ী নিয়োগের বিষয়টি সেই প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গেই যুক্ত থাকছে।
প্রশাসনিক শূন্যপদ পূরণের প্রয়োজন অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে স্থায়ী উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার পর চিরঞ্জীববাবু রেজিস্ট্রার, অর্থ আধিকারিক এবং ছাত্রকল্যাণ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ পূরণকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখেছিলেন। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর ঘাটতির কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। সেই সময়ের হিসাব অনুযায়ী, অনুমোদিত ৮৯০টি শিক্ষকপদের বিপরীতে কর্মরত ছিলেন ৫৮০ জন। অশিক্ষক কর্মীদের অনুমোদিত ১,৫৫১টি পদের মধ্যে পূর্ণ ছিল ৯১০টি। ফলে প্রশাসনিক স্থিতি ফেরানোর সঙ্গে কর্মী নিয়োগের প্রশ্নও যুক্ত ছিল।
এমন সময়ে এই রদবদল ঘটল, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধিকার নিয়ে রাজ্যে বৃহত্তর বিতর্ক চলছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের বিশেষ বিধানসভা অধিবেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীদের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলির ক্ষমতা দিতে সংশোধনী বিল আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর যুক্তি, অভিজ্ঞ অধ্যাপকদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠালে সেখানে পরিকাঠামো ও শিক্ষার মান উন্নত করতে সুবিধা হবে।
জুটা অবশ্য ওই প্রস্তাবেরও বিরোধিতা করেছে। সংগঠনের বক্তব্য, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নিয়োগবিধি ও কাজের শর্ত রয়েছে। কর্মীদের অন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ক্ষমতা সরকারের হাতে কেন্দ্রীভূত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসন এবং কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ হবে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠনও বিল আনার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার আবেদন জানিয়েছে।
এই ঘটনাক্রমের তাৎপর্য হল, প্রশাসনিক পদ পূরণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা এখন একই বিতর্কের অংশ। দৈনন্দিন কাজ সচল রাখতে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক প্রয়োজন। পাশাপাশি নিয়োগের নিয়ম, সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মতামতও গুরুত্বপূর্ণ। সাময়িক ব্যবস্থা বারবার বিতর্কে জড়ালে প্রতিষ্ঠানের কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং স্থায়ী সমাধানে পৌঁছনো—দুই ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



