নাৎসি জমানার পর কোনও রাজ্যের নির্বাচনে অতি দক্ষিণপন্থীদের সবচেয়ে বড় জয়ে প্রবল আলোড়ন তৈরি হয়েছে জার্মানিতে। একদা কমিউনিস্ট শাসিত পূর্ব জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে অভিবাসনবিরোধী ও ক্রেমলিনপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফ্যুর ডয়েচল্যান্ড বা এএফডি ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে বিপুল ব্যবধানে প্রথম হয়েছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে তারা।

কী ঘটেছে? কেন এই ফল এত গুরুত্বপূর্ণ?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম জার্মানির কোনও রাজ্য অতি দক্ষিণপন্থী সরকার নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির এই বিরাট জয়কে সংবাদপত্রিকা ডের স্পিগেল অভিহিত করেছে ৯.০ মাত্রার এক ‘রাজনৈতিক ভূমিকম্প’ বলে।

চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের রক্ষণশীল দল এবং রাজ্যের শাসক জোটের শরিক ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটদের বা সিডিইউকে প্রায় ২৭ শতাংশ পয়েন্ট পিছনে ফেলে দিয়েছে এএফডি। এই সাফল্যের অভিঘাত শুধু জার্মানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, পৌঁছবে দেশের সীমানার বাইরেও।

রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে পারলে শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যাপক কর্তৃত্ব পাবে এএফডি। তাদের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো ও বহিষ্কারের অভিযান শুরু করা, স্কুলে রামধনু পতাকা নিষিদ্ধ করা এবং নতুন বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ বন্ধ করা। চলতি মাসে বাকি দুই রাজ্যের নির্বাচনের আগে এই জয় তাদের পালে প্রবল হাওয়া জুগিয়েছে।

অন্যদিকে, ক্ষমতায় আসার মাত্র ১৬ মাসের মাথায় নিজের নীতি ও নেতৃত্বের এমন প্রত্যাখ্যানের পর জনপ্রিয়তা হারানো মের্ৎস টিকে থাকতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

বার্লিনে সাংবাদিকদের এএফডির যুগ্ম নেত্রী আলিস ভাইডেল জানিয়েছেন, ২০২৯ সালে নির্ধারিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে তাঁদের লক্ষ্য ৪০ শতাংশ ভোট পাওয়া। বর্তমানে জনমত সমীক্ষায় ২৮ শতাংশ সমর্থন নিয়ে দলটি প্রথম স্থানে রয়েছে।

এর পর কী হতে পারে?

এএফডির জাতীয় নেতৃত্ব এবং স্যাক্সনি-আনহাল্টে দলের প্রধান মুখ উলরিখ সিগমুন্ডের দাবি, রাজ্যের ভোটাররা তাঁদের সরকার গড়ার স্পষ্ট জনাদেশ দিয়েছেন। একসময় সুগন্ধি বিক্রি করতেন সিগমুন্ড; সংবাদমাধ্যমকে নিজের পক্ষে কাজে লাগানোর কৌশলেও তিনি দক্ষ।

তবে রাজ্য আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সরকার গড়তে এএফডির সঙ্গী বা সমর্থক প্রয়োজন হবে। অন্য কোনও দলকে হয় তাদের সঙ্গে জোটে যোগ দিতে হবে, অথবা বাইরে থেকে সংখ্যালঘু সরকারকে টিকে থাকতে দিতে হবে। ভোটের আগে সিগমুন্ড বারবার বলেছিলেন, স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হলেই তিনি রাজ্যপ্রধান নির্বাচনের লড়াইয়ে নামবেন।

বাকি দলগুলি আনুষ্ঠানিক সমর্থন দিয়ে সিগমুন্ডকে ক্ষমতায় বসানোর সম্ভাবনা নাকচ করেছে। তবে পাঁচ শতাংশ ভোটের বাধা অল্পের জন্য পেরিয়ে আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব পাওয়া ছোট ‘বাম-রক্ষণশীল’ জনতুষ্টিবাদী দল বিএসডব্লিউ পরোক্ষ সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়েছে।

নির্বাচনের আগেই রাজ্যের কয়েক জন ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট নেতা এএফডিকে ক্ষমতার বাইরে রাখার রাজনৈতিক বেষ্টনী বা ‘ফায়ারওয়াল’ নীতি নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

সিগমুন্ড জানিয়েছেন, আগামী দিন ও সপ্তাহগুলিতে তিনি সহযোগিতার ‘হাত বাড়িয়ে’ রাখবেন। এএফডিকে ক্ষমতায় পৌঁছতে সাহায্য করার বিরুদ্ধে অন্য দলগুলির এত দিনের দৃঢ় অবস্থান কতটা অটুট থাকে, তা পরখ করবেন তিনি।

জোট গড়তে ব্যর্থ হলে নতুন করে নির্বাচনের প্রস্তাবও দিয়েছেন সিগমুন্ড। তবে তার জন্য রাজ্য আইনসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন।

এই ফল ‘ফায়ারওয়াল’ নীতি সম্পর্কে কী বলছে?

এএফডিকে ক্ষমতার বাইরে রাখার জন্য মূলধারার দলগুলি যে নীতি অনুসরণ করে এসেছে, তা কতটা কার্যকর রাখা সম্ভব—স্যাক্সনি-আনহাল্টের চমকপ্রদ ফল সেই সংশয় আরও বাড়িয়েছে।

এর আগে এএফডি মাত্র একবারই কোনও রাজ্যের নির্বাচনে প্রথম হয়েছিল। ২০২৪ সালে প্রতিবেশী থুরিঙ্গিয়ায়। কিন্তু সেই জয় এতটা নির্ণায়ক ছিল না। ফলে বাকি দলগুলি মতাদর্শের বিস্তর ফারাক সত্ত্বেও জোড়াতালি দিয়ে একটি জোট গড়তে পেরেছিল।

স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির জয়ের ব্যবধান এতটাই বড় যে, পর্যুদস্ত সিডিইউ এবার কীভাবে বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী দলকে নিয়ে তেমন একটি ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ জোট তৈরি করবে, তা কল্পনা করা কঠিন।

রাজ্যের প্রধান স্বেন শুলৎসেও স্বীকার করেছেন, সেই চেষ্টা করার মতো জনাদেশ তাঁদের দলের আর নেই।

সিডিইউ এবং ফ্রিডরিখ মের্ৎসের জন্য এই ফলের অর্থ কী?

রবিবারের নির্বাচন মের্ৎস ও তাঁর দল সিডিইউয়ের জন্য তীব্র ভর্ৎসনার শামিল। গম্ভীর মুখে চ্যান্সেলর স্বীকার করেছেন, ফল দেখে তিনি ‘গভীরভাবে স্তম্ভিত’।

বুথফেরত সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং সরকারি আয়ব্যয়ে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় ভোটাররা ক্ষুব্ধ। মূল্যস্ফীতি ও ইরান যুদ্ধের জেরে বেড়ে যাওয়া জ্বালানির দাম জার্মানির দরিদ্রতম রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের ভোটারদের কঠিন চাপে ফেলেছে।

ভোটারদের সক্রিয় করে তোলার প্রশ্নে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির বিষয়টি অভিবাসনের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছে বলেই মনে হচ্ছে। অথচ অভিবাসনবিরোধিতাই এএফডির জনসমর্থন সংগঠিত করার প্রধান পরিচিত হাতিয়ার।

একদা কমিউনিস্ট শাসিত পূর্বাঞ্চলে এএফডির সমর্থন সবচেয়ে বেশি হলেও, শিল্পক্ষয়ের আশঙ্কার মধ্যে চলতি বছরের গোড়ায় পশ্চিমাঞ্চলের দুই রাজ্যের নির্বাচনেও দলটি উল্লেখযোগ্য শক্তি বাড়িয়েছে।

মের্ৎসের জোটের ছোট শরিক সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বা এসপিডি সোমবার ইঙ্গিত দিয়েছে, ক্ষুব্ধ ভোটারদের শান্ত করতে জার্মানির ব্যয়বহুল ও ক্রমশ চাপের মুখে পড়া সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থায় প্রস্তাবিত পরিবর্তন কিছুটা শিথিল করতে তারা রাজি।

তবে মের্ৎসের বক্তব্য, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও পেনশনব্যবস্থাকে মজবুত করতে এই পদক্ষেপগুলি প্রয়োজন। ‘আমাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের স্বার্থে’ পদে থেকে এই পরিবর্তনের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন তিনি।

পরবর্তী দুই রাজ্যের নির্বাচনে কী হতে পারে?

জার্মানির ১৬টি রাজ্যের মধ্যে রাজধানী বার্লিন এবং বাল্টিক উপকূলের মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়ায় ভোট হবে ২০ সেপ্টেম্বর।

এএফডির পক্ষে তৈরি হওয়া স্পষ্ট গতি এবং মের্ৎস ও এসপিডিকে নিয়ে তাঁর ডান-বাম জোট সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক অসন্তোষ—এই দুই কারণে ওই নির্বাচনগুলিও কেন্দ্রীয় শাসক জোটের দলগুলির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়ায় বর্তমানে শাসক জোটের শরিক এসপিডির চেয়ে সামান্য এগিয়ে রয়েছে এএফডি। তবে আপাতত সেখানে তাদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে হচ্ছে।

একসময় পূর্ব ও পশ্চিমে বিভক্ত বার্লিনের পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত। সেখানে প্রথম স্থান দখলের লড়াইয়ে রয়েছে সিডিইউ, অতি বামপন্থী ডি লিঙ্কে এবং এএফডি।

ভোটের দিন সিডিইউ শেষ পর্যন্ত নিজের অগ্রগতি ধরে রাখতে পারলেও, মতাদর্শগত সামঞ্জস্য রয়েছে এমন একটি জোট সরকার গড়া তাদের পক্ষে কঠিন হবে। তা মের্ৎস ও তাঁর দলের জন্য আরও একটি বড় আঘাত হয়ে উঠতে পারে এবং তাঁর সরকারকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে।