সরকারি বিজ্ঞাপনে একাদশভূজা দুর্গা, ক্ষমা চাইলেন শুভেন্দু

যা জানা জরুরি
- দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি নিয়ে সমন্বয় বৈঠকের সরকারি বিজ্ঞাপনে দেবীর এগারো হাতের ছবি প্রকাশিত হওয়ায় বিতর্কের মুখে পড়ল পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
- সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, কলকাতার মিলনমেলা প্রাঙ্গণে সেই বৈঠকেই প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
- জানালেন, বিজ্ঞাপন তৈরির দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কড়া সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
দশভূজার বদলে একাদশভূজা দুর্গা! দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি নিয়ে সমন্বয় বৈঠকের সরকারি বিজ্ঞাপনে দেবীর এগারো হাতের ছবি প্রকাশিত হওয়ায় বিতর্কের মুখে পড়ল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, কলকাতার মিলনমেলা প্রাঙ্গণে সেই বৈঠকেই প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। জানালেন, বিজ্ঞাপন তৈরির দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কড়া সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে সরকার আরও সতর্ক থাকবে।
রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পরে এটিই বিজেপি সরকারের প্রথম দুর্গাপুজো। তার প্রস্তুতি এবং পুজো কমিটিগুলির সঙ্গে প্রশাসনিক সমন্বয়ের জন্য বৈঠকটি ডাকা হয়েছিল। কলকাতা পুলিশ ও কলকাতা পুরসভার উদ্যোগে, রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের সহযোগিতায় আয়োজিত এই বৈঠকের বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয় সংবাদপত্রে। সেখানে দুর্গার ছবির পাশাপাশি ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছবিও।
বিজ্ঞাপনে দেবীর হাতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর সমালোচনায় সরব হয় তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের অভিযোগ, বাংলার সংস্কৃতি এবং দুর্গাপুজোর আবেগ সম্পর্কে বিজেপির বোঝাপড়ার অভাবই এই ঘটনায় প্রকাশ পেয়েছে। পুজোর আচার, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় ভাবাবেগ নিয়ে সরকার যখন নানা নির্দেশ দিচ্ছে, তখন তার নিজের বিজ্ঞাপনে এমন ভুল কেন, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বৈঠকে বক্তব্যের শুরুতেই শুভেন্দু ভুল স্বীকার করেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি সকলের কাছে ক্ষমা চান। সকালে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে ত্রুটি ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট নির্মাতাদের কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। এই ধরনের বিষয়ে ভবিষ্যতে সরকার আরও যত্নবান হবে বলেও আশ্বাস দেন। তাঁর বক্তব্যে ভুলটির পক্ষে কোনও যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা ছিল না; বরং সরাসরি দায় স্বীকারের সুর ছিল।
তবে সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন এবং বৈঠকস্থলের সাজসজ্জায় একটি পার্থক্য দেখা যায়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিলনমেলার সভামঞ্চের পিছনের বড় প্রচারপটে দুর্গার যে ছবি ছিল, সেখানে দেবীর দশটি হাতই দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ, সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের এগারো হাতের ছবিটি বৈঠকের মঞ্চে ব্যবহৃত হয়নি।
তৃণমূল তাদের সামাজিক মাধ্যমের বক্তব্যে দুর্গাপুজোর সঙ্গে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সম্পর্ক তুলে ধরে। দলের বক্তব্য, পুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বাংলার মানুষের গভীর আবেগের বিষয়। লক্ষ লক্ষ বাঙালির কাছে মায়ের আগমন পবিত্র ও আপনজনের ঘরে ফেরার মতো। অথচ বাংলার প্রতিনিধিত্বের দাবি করা সরকার সেই ঐতিহ্য থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ তাদের।
কটাক্ষ করেন তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষও। মুখ্যমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, সরকারি বিজ্ঞাপনে দশভূজা একাদশভূজা হয়ে গিয়েছেন। শাস্ত্রের উল্লেখ করে একটি হাত কমানোর কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি তাঁর বিদ্রুপ, প্রতিদিন এত আচরণবিধির কথা শোনা যাচ্ছে; তার মধ্যে ২০২৬ সালে এসে দেবীর হাতের সংখ্যাও বেড়ে গেলে জটিলতা বাড়বে। সংশ্লিষ্ট দফতরকে দ্রুত ভুল সংশোধনের নির্দেশ দেওয়ার দাবি জানান কুণাল।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য বিতর্ককে হালকা করেই দেখাতে চান। বাড়তি হাতের প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, মা আরও শক্তিশালী হয়ে গিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, বিজ্ঞাপনটি নিজে দেখেননি। তাঁর ধারণা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার ভুল হয়েছে এবং সেই ভুল সংশোধন করা হবে। বিষয়টিকে রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত করার প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আপত্তি জানিয়েছেন তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়ক মদন মিত্রও। বাঙালি হিসেবে দেবীর এগারো হাতের ছবি তিনি মেনে নিতে পারছেন না বলে জানান। তাঁর প্রশ্ন, মা কি আরও একটি হাতে আরেকটি অস্ত্র চাইছেন? সরকারি বিজ্ঞাপনে এই ধরনের উপস্থাপন গ্রহণযোগ্য নয় বলেই মন্তব্য করেন মদন।
সমালোচনায় যোগ দেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তাঁর অভিযোগ, সরকার এমন সংস্থাগুলিকে কাজ দিচ্ছে, যাদের বাংলার রীতিনীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা নেই। শিক্ষা, মূল্যবৃদ্ধি, নারীসুরক্ষা এবং দুর্নীতির মতো বিষয় থেকে নজর ঘোরাতে ধর্মকে সামনে আনা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এর আগেই বিশ্ব হিন্দু পরিষদ পুজোমণ্ডপের ভিতরে আমিষ খাবার নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, মাছ-মাংস পবিত্র পরিসরের বাইরে রাখতে হবে। পুজোর খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সেই বিতর্কের মধ্যেই সরকারি বিজ্ঞাপনের এই ত্রুটি সামনে আসায় উৎসবের রীতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক বাদানুবাদ আরও বিষয় পেল।
বিতর্কের পটভূমিতে রয়েছে পুজোর চরিত্র নিয়ে চলতি রাজনৈতিক চাপানউতোর। সোমবারের বৈঠকেও শুভেন্দু পুজো উদ্যোক্তাদের সনাতন ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সতর্ক থাকার কথা বলেন। বিষয়ভিত্তিক পুজো আয়োজন করা যাবে বলে জানালেও তাঁর নির্দেশ, প্রতিমা, মণ্ডপ বা ভাবনার উপস্থাপনায় যেন ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত না লাগে।
সেই বৈঠক থেকে পুজো আয়োজনের একাধিক নতুন সিদ্ধান্তও ঘোষণা করা হয়। মহাষ্টমীতে রাজ্যজুড়ে মদের দোকান ও পানশালায় মদ বিক্রি বন্ধ থাকবে। পুজো এবং বিসর্জনের শোভাযাত্রায় ডিজে বাজানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাতীয় সড়ক বা রাস্তা আটকে পুজো করা যাবে না বলেও জানানো হয়।
দেবীপক্ষ শুরু হওয়ার আগে পুজোমণ্ডপ উদ্বোধন করা যাবে না। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আগের দিনের মধ্যে বিসর্জন শেষ করতে হবে। ভয় দেখিয়ে বিসর্জনের দিন বদলানো যাবে না বলেও জানান তিনি।
আগের সরকারের চালু করা পুজো কার্নিভালও এবার হবে না। পরিবর্তে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ড্রোন এবং আতশবাজির প্রদর্শনীর পরিকল্পনা জানিয়েছে সরকার। ছোট পুজো কমিটিগুলিকে শর্তসাপেক্ষে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর্থিকভাবে সচ্ছল বড় পুজোগুলিকে সরকারি অনুদান না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এই ঘটনাক্রম থেকে স্পষ্ট, বিজ্ঞাপনের ভুলটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন সরকার নিজেই উৎসবের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা নিয়ে মানদণ্ড নির্ধারণ করছে। ফলে বিরোধীরা বিষয়টিকে প্রশাসনিক অসতর্কতার পাশাপাশি সরকারের সাংস্কৃতিক দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলার সুযোগ হিসেবে দেখছে। মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমাপ্রার্থনা এবং শমীকের হালকা মন্তব্যে আবার একই বিতর্ক সামলানোর দুটি আলাদা রাজনৈতিক ভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



