অষ্টমীতে মদ বিক্রি বন্ধ, বাতিল কার্নিভ্যাল! দুর্গাপুজোর অনুদান নিয়ে বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

যা জানা জরুরি
- মহাষ্টমীতে রাজ্যজুড়ে মদ বিক্রি বন্ধ, পুজো ও বিসর্জনের শোভাযাত্রায় ডিজে নিষিদ্ধ, দেবীপক্ষের আগে মণ্ডপ উদ্বোধনে নিষেধাজ্ঞা।
- পাশাপাশি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে চালু হওয়া দুর্গাপুজোর কার্নিভ্যালও এ বছর হবে না।
- পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দুর্গোৎসবের আগে এই নির্দেশগুলি ঘোষণা করল বিজেপি সরকার।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মহাষ্টমীতে রাজ্যজুড়ে মদ বিক্রি বন্ধ, পুজো ও বিসর্জনের শোভাযাত্রায় ডিজে নিষিদ্ধ, দেবীপক্ষের আগে মণ্ডপ উদ্বোধনে নিষেধাজ্ঞা। পাশাপাশি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে চালু হওয়া দুর্গাপুজোর কার্নিভ্যালও এ বছর হবে না। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দুর্গোৎসবের আগে এই নির্দেশগুলি ঘোষণা করল বিজেপি সরকার। তবে পুজো কমিটিগুলিকে সরকারি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা বহাল থাকছে। ছোট ও আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজন রয়েছে এমন পুজোগুলিকে এক লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে।
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর কলকাতার মিলনমেলা প্রাঙ্গণে পুজোর প্রস্তুতি ও সমন্বয় বৈঠকের পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই সিদ্ধান্ত জানান। উৎসবে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষার উপরে জোর দিয়েছেন তিনি। প্রতিমা, মণ্ডপ বা থিমের মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া কিংবা সনাতন ঐতিহ্যকে ক্ষুণ্ণ করা চলবে না বলে উদ্যোক্তাদের সতর্ক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে থিমের পুজো বন্ধ হচ্ছে না; বিষয় নির্বাচনে সতর্ক থাকতে বলেছেন তিনি।
মহাষ্টমীতে মদ বিক্রির নিষেধাজ্ঞা গোটা রাজ্যেই কার্যকর হবে। ওই দিন শুধু মদের দোকান নয়, পানশালাতেও মদ পাওয়া যাবে না। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, দুর্গাকে অঞ্জলি দেওয়ার দিনে এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুজোর আয়োজন এবং প্রতিমা নিরঞ্জনের শোভাযাত্রায় ডিজে বাজানোও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে মণ্ডপ থেকে বিসর্জনের পথ—উৎসবের বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্যোক্তাদের শব্দযন্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা নতুন নির্দেশের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।
অনুদানের ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী বড় বাজেটের এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পুজো কমিটিগুলিকে স্বেচ্ছায় সরকারি সাহায্য ছেড়ে দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। যাঁরা নিজেরাই আয়োজনের খরচ বহন করতে পারেন, তাঁরা যেন আবেদন না করেন। সাহায্য ছাড়া পুজো আয়োজন কঠিন, এমন কমিটিগুলিকে এক লক্ষ টাকা দেওয়া হবে। অনুদান নেওয়া সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক বলে জানিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ, বড় পুজোর সাহায্য গ্রহণে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার বদলে আপাতত স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর কথাই বলা হয়েছে।
আবেদন জমা পড়ার পরে তা পরীক্ষা করে অর্থ দফতর টাকা পাঠাবে। ষষ্ঠীর আগেই অনুদান পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, কলকাতায় মোটামুটি ভালভাবে পুজো করতে প্রায় দশ লক্ষ টাকা লাগে; গ্রামাঞ্চলেও প্রয়োজন পাঁচ থেকে সাত লক্ষ। এই খরচের প্রেক্ষিতে ছোট পুজোর পাশে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন তিনি। যাঁরা স্বেচ্ছায় অনুদান নেবেন না, তাঁদের ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ জানাবেন বলেও জানিয়েছেন শুভেন্দু।
বিভিন্ন দফতরের ছাড়পত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে ‘সহজ’ নামে একক অনলাইন আবেদনব্যবস্থা চালু করেছে সরকার। সেখানে পুজোর প্রয়োজনীয় অনুমতির জন্য আবেদন করা যাবে। মিলনমেলার বৈঠকে কলকাতার ১,৩৫৫টি পুজো কমিটির প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সল্টলেক, রাজারহাট ও সংলগ্ন এলাকার ৭৮টি এবং হাওড়ার ২০টি কমিটির প্রতিনিধিরাও যোগ দেন। প্রশাসনের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের সমন্বয় এবং উৎসবের প্রস্তুতি নিয়েই এই বৈঠক হয়।
পুজো কমিটিগুলির জন্য বিনামূল্যে বিদ্যুতের ঘোষণাও করা হয়েছে। রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা এবং সিইএসসি উৎসবের জন্য বিনামাশুলে বিদ্যুৎ দেবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বাধ্যতামূলক অগ্নিসুরক্ষা অনুমতির ফি-ও মকুব করা হচ্ছে। পাশাপাশি, পাড়ার মানুষের স্বেচ্ছা চাঁদায় বারোয়ারি পুজো আয়োজনের পুরনো প্রথার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি। আর্থিকভাবে সক্ষম উদ্যোক্তাদের বিজ্ঞাপন থেকে অর্থ সংগ্রহের পরামর্শও দিয়েছেন, যাতে সরকারি অনুদানের উপরে নির্ভরতা কমে।
রাস্তাঘাট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। পুজো আয়োজনের নামে জাতীয় সড়ক আটকে রাখা যাবে না। কলকাতায় রেড রোড ও ক্যাথিড্রাল রোড-সহ ১৩টি প্রধান রাস্তা বন্ধ করে পুজোসংক্রান্ত আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হবে না। সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত না করার দায়িত্ব উদ্যোক্তাদের নিতে হবে। ফলে মণ্ডপের অবস্থান, দর্শনার্থীদের প্রবেশপথ এবং উৎসবের অন্যান্য আয়োজনের সঙ্গে সড়ক খোলা রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
উদ্বোধন এবং বিসর্জনের সময় নিয়েও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন শুভেন্দু। দেবীপক্ষ শুরু হওয়ার আগে পুজোমণ্ডপ উদ্বোধন করা যাবে না। অন্যদিকে, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আগের দিনের মধ্যেই প্রতিমা বিসর্জন শেষ করতে হবে। চাপ সৃষ্টি করে বা ভয় দেখিয়ে নিরঞ্জনের নির্ধারিত সময়সীমা বদলানো যাবে না বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। আগাম উদ্বোধন থেকে বিসর্জন পর্যন্ত উৎসবের সময়সূচি নির্ধারণে এই নির্দেশগুলি উদ্যোক্তাদের মানতে হবে।
কার্নিভ্যাল বাতিল হলেও সরকারি উদ্যোগে সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকছে। পর্যটন এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর যৌথভাবে ইডেন গার্ডেন্সে উৎসবের সূচনাপর্বের বড় অনুষ্ঠান করবে। সেখানে ড্রোন ও আতশবাজির প্রদর্শনী-সহ চার ঘণ্টার আয়োজনের কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। অর্থাৎ, নির্বাচিত প্রতিমার শোভাযাত্রাভিত্তিক কার্নিভ্যালের পরিবর্তে অন্য ধরনের সরকারি অনুষ্ঠান সামনে আনছে নতুন সরকার। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গাতেও পুজোর আগে সাংস্কৃতিক কর্মসূচি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
মহালয়ার পরে দিঘায় বিশেষ অনুষ্ঠান হবে। রাজ্যের ছয়টি শহরে দু’দিন ধরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে বলেও জানিয়েছেন শুভেন্দু। চারটি ঘাট সাজিয়ে সেখানেও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্য, বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মেনেই উৎসব উদ্যাপনের ব্যবস্থা করবে সরকার। পুজোর অনুমতির জন্য উদ্যোক্তাদের আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে না বলেও আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী; এই প্রসঙ্গে আগের তৃণমূল সরকারের সমালোচনা করেছেন তিনি।
শারদ সম্মান পুরস্কারও চালু থাকছে। সেরা প্রতিমা, সেরা মণ্ডপ, পরিবেশবান্ধব পুজো, ভিড় সামলানোর ব্যবস্থা এবং শিল্পনৈপুণ্যের মতো বিভাগে পুরস্কার দেওয়া হবে। স্বাধীন বিচারকমণ্ডলী বিজয়ীদের বেছে নেবে। ফলে পুজোর সৃজনশীলতা ও আয়োজনের মান বিচারের সরকারি ব্যবস্থাটি থাকছে, যদিও উৎসব পরিচালনার নিয়মে পরিবর্তন আসছে।
এই ঘোষণাগুলিতে আর্থিক সহায়তার ধারাবাহিকতার সঙ্গে উৎসব পরিচালনায় বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। অনুদানের জন্য প্রয়োজনভিত্তিক আবেদন, বিনামূল্যে বিদ্যুৎ, মদ বিক্রি ও ডিজেতে নিষেধাজ্ঞা, থিম নিয়ে সতর্কবার্তা এবং কার্নিভ্যাল বাতিল—সব মিলিয়ে নতুন সরকারের প্রথম দুর্গাপুজোর প্রশাসনিক কাঠামো সামনে এল। এখন উদ্যোক্তাদের প্রস্তুতিতে এই সিদ্ধান্তগুলির বাস্তব প্রয়োগই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



