ধর্মগ্রন্থ কি অপরিবর্তনীয় বিধান, না সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া পাঠ?

যা জানা জরুরি
- প্রা চীন ধর্মীয় গ্রন্থে নারী সম্পর্কে যা লেখা রয়েছে, আধুনিক সমাজ কি তা আক্ষরিক অর্থে মেনে চলবে?
- নাকি যে ঐতিহাসিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে ওই সব বিধান রচিত হয়েছিল, তার আলোকে সেগুলির পুনর্ব্যাখ্যা প্রয়োজন?
- মনুস্মৃতি ও কোরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক দুই বিতর্কের সূত্র ধরে এই মৌলিক প্রশ্নই এখন সামনে উঠে এসেছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রা চীন ধর্মীয় গ্রন্থে নারী সম্পর্কে যা লেখা রয়েছে, আধুনিক সমাজ কি তা আক্ষরিক অর্থে মেনে চলবে? নাকি যে ঐতিহাসিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে ওই সব বিধান রচিত হয়েছিল, তার আলোকে সেগুলির পুনর্ব্যাখ্যা প্রয়োজন? মনুস্মৃতি ও কোরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক দুই বিতর্কের সূত্র ধরে এই মৌলিক প্রশ্নই এখন সামনে উঠে এসেছে।
সম্প্রতি পুণেতে মহিলা শিক্ষার্থীদের এক অনুষ্ঠানে রাহুল গান্ধী মনুস্মৃতির একটি বহুল আলোচিত শ্লোক উদ্ধৃত করেন। সেখানে বলা হয়েছে, শৈশবে নারী পিতার, যৌবনে স্বামীর এবং বার্ধক্যে পুত্রের অধীনে থাকবেন; নারী কখনও স্বাধীনতার যোগ্য নন। রাহুলের বক্তব্য ছিল, এই দৃষ্টিভঙ্গিই ভারতীয় সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার অন্যতম প্রাচীন ভিত্তি। তিনি তরুণীদের উদ্দেশে বলেন, একজন নারী অন্য কারও সম্পত্তি নন, তিনি কেবল নিজেরই অধিকারভুক্ত। বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সামাজিক দর্শন নারীদের স্বাধীন না করে কার্যত খাঁচায় বন্দি রাখতে চায় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
বিজেপি নেতারা পাল্টা অভিযোগ করেন, নারী-স্বাধীনতাকে উপলক্ষ করে রাহুল আসলে হিন্দুধর্মকে আক্রমণ করছেন। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা তাঁকে ‘হিন্দু-বিদ্বেষী’ বলে আখ্যা দিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তিনি যদি সত্যিই নারী-পুরুষের সমতায় বিশ্বাস করেন, তা হলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন জানাচ্ছেন না কেন? উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও রাহুলের মন্তব্যকে ভারতীয় সংস্কৃতির অবমাননা বলে বর্ণনা করেন।
কিন্তু নিবন্ধটির বক্তব্য, মনুস্মৃতিকে হিন্দুধর্মের একমাত্র, অভ্রান্ত কিংবা অপরিবর্তনীয় ধর্মগ্রন্থ বলে ধরে নেওয়াই ঐতিহাসিকভাবে প্রশ্নসাপেক্ষ। হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরা কোনও একটি গ্রন্থনির্ভর ব্যবস্থা নয়। বেদ, উপনিষদ, স্মৃতি, পুরাণ, মহাকাব্য, আঞ্চলিক ধর্মাচরণ এবং অসংখ্য দার্শনিক ধারার মধ্যে বহু ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী মতও রয়েছে। মনুস্মৃতি সেই বৃহৎ পরম্পরার একটি ধর্মশাস্ত্র মাত্র। তার রচনাকাল, বিভিন্ন পাণ্ডুলিপির পার্থক্য এবং পরবর্তী কালের সংযোজন নিয়েও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
মনুস্মৃতিতেই নারী সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী কথা পাওয়া যায়। এক দিকে বলা হয়েছে, যেখানে নারীরা সম্মানিত হন, সেখানে দেবতারা আনন্দ করেন। অন্য দিকে নারীর স্বাধীনতা অস্বীকার করে তাঁকে সারাজীবন পুরুষ অভিভাবকের অধীন রাখার বিধান রয়েছে। অতএব সুবিধামতো একটি শ্লোক তুলে ধরে গোটা গ্রন্থকে নারীমুক্তির দলিল বানানো যেমন অনৈতিহাসিক, তেমনই তার বৈষম্যমূলক বক্তব্যগুলি সম্পূর্ণ অস্বীকার করাও অসততা।
প্রায় একই সময়ে কেরলে সুন্নি ধর্মীয় নেতা এ পি আবুবকর মুসলিয়ার বা কান্থাপুরমের একটি নির্দেশ ঘিরে আর একটি বিতর্ক তৈরি হয়। তিনি বিভিন্ন মসজিদ কমিটিকে বলেন, ইসলামি উৎসবে অপরিচিত পুরুষদের সামনে নারীদের হাজির করা কিংবা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ধর্মসম্মত নয়। ঈদে মিলাদুন্নবী ও ওনামের প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে মুসলিম নারীদের অংশগ্রহণের পরে তিনি এই বক্তব্য দেন। কেরলের মুসলিম মহিলা নেত্রীদের পাশাপাশি বামপন্থী নেতারাও তার প্রতিবাদ করেন। বিতর্কের মুখে মুসলিয়ার পরে সংযমের আহ্বান জানালেও নারীর প্রকাশ্য উপস্থিতি সম্পর্কে তাঁর মূল রক্ষণশীল অবস্থান প্রত্যাহার করেননি। ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যা শুধু বিশ্বাসের বিষয় নয়, তা সামাজিক ক্ষমতার প্রশ্নও।
এখানেই দুটি বিতর্ক সম্ভাব্য দুই ভিন্ন পথের সন্ধান দেয়। একটি পথ হল ধর্মগ্রন্থকে আক্ষরিক, চিরন্তন এবং প্রশ্নাতীত বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এই পথে পুরোহিত, ধর্মগুরু বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের সুবিধামতো কয়েকটি বাক্য বেছে নিয়ে মানুষের বর্তমান জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। নারী, দলিত কিংবা সংখ্যালঘু—সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয় তাঁদেরই।
অন্য পথটি হল ঐতিহাসিক বিচার, মুক্ত আলোচনা এবং পুনর্ব্যাখ্যার। এ ক্ষেত্রে প্রাচীন গ্রন্থকে ধ্বংস বা নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন নেই; কিন্তু তাকে সংবিধানের ঊর্ধ্বে রাখাও চলে না। কোনও ধর্মীয় নির্দেশ যদি ব্যক্তিস্বাধীনতা, সাম্য ও মর্যাদার আধুনিক ধারণার বিরোধী হয়, তা হলে রাষ্ট্র ও সমাজের মানদণ্ড হবে সংবিধান, প্রাচীন বিধান নয়।
নিবন্ধটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত এখানেই। হিন্দু ও মুসলমান পরস্পরের ধর্মগ্রন্থের অন্ধকার অংশ দেখিয়ে নিজেদের দায় এড়াতে পারেন। মনুস্মৃতির সমালোচনার জবাবে কোরানের প্রসঙ্গ তোলা কিংবা মুসলিম রক্ষণশীলতার প্রতিবাদে হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের বৈষম্য আড়াল করা খুব সহজ। কিন্তু এই প্রতিযোগিতায় নারীর মুক্তি ঘটে না। বরং দুই সম্প্রদায়ের পুরুষতন্ত্রই পরস্পরকে ব্যবহার করে আরও শক্তিশালী হয়।
ধর্মগ্রন্থের প্রতি শ্রদ্ধা আর তার প্রতিটি বাক্যকে সমকালীন আইনে পরিণত করা এক কথা নয়। ভারতীয় গণতন্ত্রের সামনে প্রকৃত নির্বাচন তাই ধর্ম বনাম অধর্মের নয়; নির্বাচনটি হল—অতীতকে আমরা ইতিহাস হিসেবে বুঝব, নাকি বর্তমানের উপর তার নিঃশর্ত কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেব। নারীকে স্বাধীন নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে হলে মনুস্মৃতি হোক বা কোরান—প্রতিটি প্রাচীন পাঠকেই প্রশ্ন, বিচার এবং পুনর্ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



