নতুন উদ্বেগ উপেক্ষা করেই ব্রহ্মপুত্রে ‘শতাব্দীর প্রকল্প’ এগিয়ে নেবে চীন

যা জানা জরুরি
- সাম্প্রতিক নেপাল–চীন সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা হিমালয় অঞ্চলে বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুললেও ব্রহ্মপুত্রের উজানে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে…
- ইয়ারলুং সাংপো নদীর নিম্ন অববাহিকায় নির্মীয়মাণ এই প্রকল্পটিকে চীনের পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
- ফলে পরিবেশগত ও ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের আপত্তি সত্ত্বেও ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত কার্যত…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সাম্প্রতিক নেপাল–চীন সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা হিমালয় অঞ্চলে বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুললেও ব্রহ্মপুত্রের উজানে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরছে না বেজিং। ইয়ারলুং সাংপো নদীর নিম্ন অববাহিকায় নির্মীয়মাণ এই প্রকল্পটিকে চীনের পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে পরিবেশগত ও ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের আপত্তি সত্ত্বেও ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত কার্যত পাকা।
তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র ইয়ারলুং সাংপো নামে পরিচিত। মেদোগ বা মোটুও অঞ্চলের কাছে নদীটি বিশাল বাঁক নিয়ে অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করে সিয়াং নাম ধারণ করেছে। পরে দিবাং ও লোহিতের সঙ্গে মিশে তা ব্রহ্মপুত্র হয়েছে। এই ‘গ্রেট বেন্ড’ অঞ্চলে প্রায় ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে নদী প্রায় ২,০০০ মিটার নেমে এসেছে। প্রবল জলপ্রবাহ ও খাড়া উচ্চতার এই সমন্বয়কে কাজে লাগিয়েই চীন পাঁচটি ধারাবাহিক জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে।
প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ১.২ লক্ষ কোটি ইউয়ান। বার্ষিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৩০ হাজার কোটি কিলোওয়াট ঘণ্টা—চীনের থ্রি গর্জেস বাঁধের প্রায় তিন গুণ। মোট উৎপাদনক্ষমতা ৬০ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা করে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং একে ‘শতাব্দীর প্রকল্প’ বলে অভিহিত করেছিলেন। চীনের দাবি, এটি দেশের পরিচ্ছন্ন শক্তি উৎপাদন বৃদ্ধি, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং তিব্বতের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। ২০৩০ সালের মধ্যে পুনর্নবীকরণযোগ্য উৎস থেকে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়ানো হবে।
ভারতের উদ্বেগ অবশ্য শুধু জলপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রকল্পটি পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে নির্মিত হচ্ছে। এখানে ভারতীয় ও ইউরেশীয় ভূত্বকীয় পাতের সংঘর্ষের কারণে নিয়মিত ভূমিকম্প, ভূমিধস এবং পাহাড়ি হ্রদ ভেঙে বন্যা দেখা যায়। নেপাল–চীন সীমান্তের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে বরফ, শিলা ও মাটির ধস নদীর গতিপথ সাময়িকভাবে আটকে দিয়েছিল বলে প্রাথমিক ধারণা। পরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে নেমে আসে বিপুল জলরাশি। তবে ওই বন্যার সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র প্রকল্পের কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই; ঘটনাটি কেবল সমগ্র হিমালয় অঞ্চলের ভঙ্গুরতা নতুন করে সামনে এনেছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এত বড় নির্মাণকাজ পাহাড়ের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। কোনও ভূমিকম্প, ভূমিধস অথবা নির্মাণগত ত্রুটিতে জলাধার ক্ষতিগ্রস্ত হলে অরুণাচল ও অসমে বিপর্যয়কর বন্যা নেমে আসার সম্ভাবনা থাকবে। আবার স্বাভাবিক সময়ে জল আটকে রাখা বা হঠাৎ ছেড়ে দেওয়ার ফলে সিয়াং ও ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহের ঋতুভিত্তিক চরিত্র বদলে যেতে পারে। নদীর সঙ্গে নেমে আসা পলির পরিমাণ কমলে অসম ও বাংলাদেশের কৃষি, চরাঞ্চল, জলাভূমি এবং জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রকল্পটির স্বচ্ছতা ও ভাটির দেশগুলির সঙ্গে পরামর্শের অভাব উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। এই তথ্যের ঘাটতিকেই ভারত ও বাংলাদেশের আশঙ্কার অন্যতম কারণ বলা হয়েছে।
চীন অবশ্য জানিয়েছে, এটি মূলত নদীর প্রবাহনির্ভর প্রকল্প; ব্রহ্মপুত্রের জল অন্যত্র সরানো হবে না এবং ভাটির দেশগুলির স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে না। নির্মাণের আগে কয়েক দশক ধরে ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা চালানো হয়েছে বলেও বেজিংয়ের দাবি। কিন্তু প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ নকশা, জলাধারের ধারণক্ষমতা, জল ছাড়ার পদ্ধতি কিংবা পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা প্রকাশ্যে না আসায় সেই আশ্বাসে ভারত সন্তুষ্ট নয়।
নয়াদিল্লি ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক স্তরে বেজিংকে জানিয়েছে, উজানের কোনও কার্যকলাপে ভাটির দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া চলবে না। ভারত প্রকল্পটির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ সংক্রান্ত আগাম জলতাত্ত্বিক তথ্য নিয়মিত ভাগ করে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। জাতীয় স্বার্থরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এর পাল্টা প্রস্তুতি হিসেবে অরুণাচলে প্রায় ১১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার সিয়াং উচ্চ বহুমুখী প্রকল্প গড়ার পরিকল্পনা করেছে ভারত। উদ্দেশ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি চীন হঠাৎ অতিরিক্ত জল ছাড়লে তা ধরে রাখা। কিন্তু স্থানীয় আদি জনগোষ্ঠীর একাংশ জমি হারানো, বাস্তুচ্যুতি এবং পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কায় এই প্রকল্পের বিরোধিতা করছে।
ফলে ব্রহ্মপুত্র এখন শুধু একটি আন্তঃসীমান্ত নদী নয়; তা শক্তি, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির মিলিত ক্ষেত্র। চীনের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রকল্পটির অন্তর্ভুক্তি স্পষ্ট করে দিয়েছে—নতুন বিপর্যয় বা প্রতিবেশীদের উদ্বেগ কোনওটিই আপাতত বেজিংয়ের গতিপথ বদলাতে পারছে না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



