নজরে ‘জেন জি’, কিন্তু ভোটবাক্সে যুবশক্তি এখনও নির্মীয়মাণ

যা জানা জরুরি
- কোনও সরকারি ঘোষণা বা বিশেষ দিবসের কারণে নয়—দেশের তরুণ প্রজন্ম আচমকাই রাজনৈতিক দল, সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের মনোযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
- প্রধানমন্ত্রী থেকে বিরোধী নেতা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থেকে আঞ্চলিক দলের মুখ—প্রত্যেকেই তরুণদের ভাষায় কথা বলতে চাইছেন।
- কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের সঙ্গে আলোচনায় বসছেন, কেউ আবার সমাজমাধ্যমে নিজের বহু দিনের ভাবমূর্তি ঝেড়ে ফেলে সহজ-স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভারতের রাজনীতিতে এখন যেন যৌবনের মরসুম। কোনও সরকারি ঘোষণা বা বিশেষ দিবসের কারণে নয়—দেশের তরুণ প্রজন্ম আচমকাই রাজনৈতিক দল, সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের মনোযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী থেকে বিরোধী নেতা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থেকে আঞ্চলিক দলের মুখ—প্রত্যেকেই তরুণদের ভাষায় কথা বলতে চাইছেন। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের সঙ্গে আলোচনায় বসছেন, কেউ আবার সমাজমাধ্যমে নিজের বহু দিনের ভাবমূর্তি ঝেড়ে ফেলে সহজ-স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন।
রাজনীতির এই নতুন আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে ‘জেনারেশন জেড’ বা ‘জেন জি’। মোটামুটি ১৪ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের এই প্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত বলে ধরা হয়। তাঁদের একটি অংশ এখনও ভোটদানের বয়সে পৌঁছয়নি। কিন্তু যাঁরা পৌঁছেছেন, তাঁদের সংখ্যা বিপুল। আগামী কয়েকটি নির্বাচনে আরও কয়েক কোটি তরুণ ভোটার তালিকায় নাম তুলবেন। ফলে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে কোনও দলই তাঁদের উপেক্ষা করার ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
এই প্রজন্মের রাজনৈতিক উপস্থিতি অবশ্য শুধু সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। বেকারত্ব, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম, শিক্ষার ব্যয়বৃদ্ধি, মূল্যবৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—একাধিক বিষয়ে তরুণদের ক্ষোভ ক্রমশ প্রকাশ্যে এসেছে। সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনগুলিতে তার পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। পথের আন্দোলনের পাশাপাশি সমাজমাধ্যমেও তৈরি হয়েছে ব্যঙ্গ, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক বিদ্রূপের নতুন ভাষা। প্রচলিত রাজনৈতিক বক্তৃতার তুলনায় ছোট ভিডিয়ো, মিম এবং ধারালো এক বাক্যের মন্তব্য অনেক বেশি দ্রুত তরুণদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’র মতো ব্যঙ্গাত্মক সমাজমাধ্যমভিত্তিক উদ্যোগ অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল অনুসরণকারী সংগ্রহ করে দেখিয়েছে, তরুণদের ক্ষোভকে আর নিছক সাময়িক অসন্তোষ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বেকারত্ব ও পরীক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতির মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ওই মঞ্চ প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলিকেও নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছে। তার পর থেকেই রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি দপ্তরগুলির সমাজমাধ্যম ব্যবহারের ধরনে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন এসেছে। সুপরিকল্পিত বক্তৃতার বদলে সহজ ভিডিয়ো, জনপ্রিয় সংস্কৃতির উল্লেখ এবং তরুণদের ব্যবহৃত শব্দবন্ধের প্রয়োগ বেড়েছে।
কিন্তু সমাজমাধ্যমে জনপ্রিয়তা এবং ভোটবাক্সে শক্তি এক বিষয় নয়। কয়েক লক্ষ মন্তব্য, কোটি অনুসরণকারী কিংবা একটি প্রতিবাদে বিপুল জমায়েত—এর কোনওটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থায়ী ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করে না। ভারতের তরুণরা বয়সের পরিচয়ে কাছাকাছি হলেও তাঁদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান এক নয়। মহানগরের উচ্চশিক্ষিত চাকরিপ্রার্থী এবং গ্রামের ভূমিহীন পরিবারের প্রথম প্রজন্মের কলেজপড়ুয়ার উদ্বেগে যেমন মিল রয়েছে, তেমনই রয়েছে বিস্তর ফারাক। জাত, ধর্ম, ভাষা, অঞ্চল, শ্রেণি ও লিঙ্গ তাঁদের রাজনৈতিক পছন্দকে পৃথক পথে পরিচালিত করে।
এই কারণেই ভারতে এখনও অভিন্ন ‘যুব ভোট’ দেখা যায়নি। লোকনীতি–সিএসডিএস-এর বিভিন্ন নির্বাচন-পরবর্তী সমীক্ষা দেখিয়েছে, বয়স এক হলেও তরুণদের ভোটদানের প্রবণতা রাজ্য ও সামাজিক গোষ্ঠী অনুযায়ী বদলে যায়। কোথাও জাতীয়তাবাদ এবং শক্তিশালী নেতৃত্ব তাঁদের আকর্ষণ করে, কোথাও চাকরি বা স্থানীয় দুর্নীতি প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। আবার পরিবারের রাজনৈতিক আনুগত্য, জাতিগত সমীকরণ এবং স্থানীয় প্রার্থীর পরিচিতিও তরুণ ভোটারের সিদ্ধান্তে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। লোকনীতি-র গবেষণার মূল ইঙ্গিত—সংখ্যায় বড় হলেও ভারতের তরুণেরা এখনও একরৈখিক রাজনৈতিক গোষ্ঠী নন।
এর অর্থ এই নয় যে তরুণদের কোনও নির্বাচনী প্রভাব নেই। ২০১৪ সালের পর বিজেপির উত্থানে নতুন ও তরুণ ভোটারদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। নরেন্দ্র মোদীর উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শক্তিশালী ভারত এবং ব্যক্তিগত সাফল্যের বার্তা বহু তরুণকে আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু দশ বছরের বেশি সময় পরে সেই প্রজন্মের একাংশ এখন চাকরির বাজারের কঠিন বাস্তবতা, আয়বৈষম্য এবং পরীক্ষার অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হলে যে একই ভোটার দ্রুত হতাশ হয়ে উঠতে পারেন, সাম্প্রতিক আন্দোলন তার আভাস দিয়েছে।
বিরোধী দলগুলিও এই সুযোগ ধরতে আগ্রহী। তরুণদের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ, চাকরি ও পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে প্রতিশ্রুতি—সবই তাদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু কেবল ক্ষোভকে ভাষা দেওয়া যথেষ্ট নয়। তরুণ ভোটার জানতে চান, ক্ষমতায় এলে কত চাকরি তৈরি হবে, নিয়োগ কত দিনে সম্পন্ন হবে, প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং উচ্চশিক্ষা কতটা সুলভ হবে। বিশ্বাসযোগ্য কর্মসূচি এবং সাংগঠনিক উপস্থিতি ছাড়া ক্ষোভকে ভোটে রূপান্তর করা কঠিন।
প্রতিবেশী বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও সতর্ক করার মতো। তরুণদের নেতৃত্বে শক্তিশালী আন্দোলন ক্ষমতার পালাবদলের পথ তৈরি করলেও, পরে সেই আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া দল নির্বাচনে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। রাস্তার ঐক্য ভোটের সময় ধরে রাখা যায়নি; সাংগঠনিক দুর্বলতা, অস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান এবং বিতর্কিত জোট তার সম্ভাবনা সীমিত করে দেয়। অর্থাৎ পুরনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ থাকলেই নতুন শক্তির নির্বাচনী সাফল্য নিশ্চিত হয় না।
নির্বাচন শেষ পর্যন্ত একটি দীর্ঘ সাংগঠনিক প্রক্রিয়া। প্রার্থী নির্বাচন, বুথ কমিটি, ভোটার তালিকা পরীক্ষা, স্থানীয় কর্মী, বাড়ি বাড়ি প্রচার এবং ভোটের দিন সমর্থকদের কেন্দ্রে নিয়ে আসা—এসব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত দলগুলি এখনও অনেক এগিয়ে। সমাজমাধ্যমের কোনও আন্দোলন এই পরিকাঠামো তৈরি না করলে তার রাজনৈতিক আবেদন পর্দার মধ্যেই আটকে যেতে পারে। অনলাইনের আলোড়নকে পাড়ায়, গ্রামে এবং ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আরও একটি সমস্যা হল, তরুণদের ক্ষোভ সব সময় একই রাজনৈতিক অভিমুখ নেয় না। বেকারত্বে অসন্তুষ্ট দুই তরুণের একজন সরকারবিরোধী হতে পারেন, অন্যজন মনে করতে পারেন শক্তিশালী সরকারই সমস্যার সমাধান করবে। কেউ সামাজিক ন্যায়কে অগ্রাধিকার দেন, কেউ ধর্মীয় পরিচয়কে; কারও কাছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা জরুরি, কারও কাছে জাতীয় নিরাপত্তা। ফলে চাকরি বা পরীক্ষা নিয়ে অভিন্ন উদ্বেগ থাকলেও ভোটের সিদ্ধান্তে তাঁদের মধ্যে বিভাজন থেকে যায়।
ভারতের জেন জি তাই এখনই সুসংবদ্ধ ভোটব্যাঙ্ক নয়; বরং প্রবল সম্ভাবনাময়, পরিবর্তনশীল একটি নির্বাচনী ক্ষেত্র। তাদের কোনও স্থায়ী আনুগত্য নেই—এটিই রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষে একই সঙ্গে সুযোগ এবং বিপদ। তরুণদের আকর্ষণ করতে শুধু তাঁদের পোশাক, শব্দ বা সমাজমাধ্যমের ভঙ্গি অনুকরণ করলে চলবে না। তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের অনিশ্চয়তার বাস্তব উত্তর দিতে হবে।
সংখ্যা তরুণদের শক্তি দিয়েছে, প্রযুক্তি দিয়েছে নিজস্ব কণ্ঠস্বর। কিন্তু সেই কণ্ঠকে স্থায়ী নির্বাচনী শক্তিতে রূপান্তর করতে প্রয়োজন অভিন্ন দাবি, নেতৃত্ব, সংগঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। ভারতের যুবশক্তি দরজায় কড়া নাড়ছে—তবে ভোটের ময়দানে স্বতন্ত্র ও নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে তার নির্মাণ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



