সন্ন জনগণনায় জাতি গণনার জন্য কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির বিদ্যমান অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি বা ওবিসি তালিকা ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে একাধিক ওবিসি সংগঠন। তাদের বক্তব্য, তালিকা ব্যবহারের ফলে সরকার জাতিগত পরিচয়ের বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে—কেন্দ্রের এই যুক্তি ‘মৌলিক ভাবেই ত্রুটিপূর্ণ’। কারণ, এই তালিকাগুলি কোনও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তৈরি নয়; কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারই দীর্ঘ প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেগুলিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রয়োজন হলে জনগণনার আগে তালিকাগুলির অসঙ্গতি দূর করে একটি সুসংহত কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।

২০২৭ সালের জনগণনার জনসংখ্যা গণনা পর্বে জাতিগত পরিচয় নথিবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। তবে পূর্বনির্ধারিত কোনও তালিকা থেকে জাতির নাম বেছে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে না। গণনাকারীরা প্রত্যেক ব্যক্তিকে তাঁর জাতি জিজ্ঞাসা করবেন এবং তিনি যে নাম বলবেন, সেটিই অবিকল নথিবদ্ধ করবেন। কোনও পদবি, উপজাতি বা আঞ্চলিক পরিচয়কে বৃহত্তর জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করার দায়িত্ব গণনাকারীর থাকবে না। অধিকাংশ রাজ্যে এই পর্ব শুরু হওয়ার কথা ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে; দুর্গম ও তুষারাবৃত অঞ্চলে তা আগেই শুরু হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের যুক্তি, জনগণনা পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নয়, কেবল মানুষের দেওয়া তথ্য নথিবদ্ধ করার কাজ। কেউ নিজেকে যে জাতিভুক্ত বলে জানালে গণনাকারী তাঁর কাছে জাতিগত শংসাপত্র চাইতে পারেন না। ফলে আগে থেকে তৈরি তালিকা ব্যবহার করা হলে সরকারকেই ঠিক করতে হবে, কোন পরিচয় বৈধ এবং কোনটি নয়। তাতে রাষ্ট্র জাতিগত পরিচয়ের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে। বিদ্যমান তালিকা ব্যবহারে ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি জাতপাতের কাঠামো আরও স্থায়ী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও জানিয়েছে সংঘ পরিবারের একাংশ।

ওবিসি সংগঠনগুলির পাল্টা বক্তব্য, জনগণনায় তফসিলি জাতি ও তফসিলি জনজাতির ক্ষেত্রে সরকার স্বীকৃত তালিকা ও নির্দিষ্ট সংকেত ব্যবহার করতে পারলে ওবিসিদের ক্ষেত্রে তা অসম্ভব হওয়ার কারণ নেই। জাতীয় অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনের কেন্দ্রীয় তালিকার পাশাপাশি প্রত্যেক রাজ্যের নিজস্ব ওবিসি তালিকা রয়েছে। সরকারি চাকরি, শিক্ষা এবং বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্পে সংরক্ষণের সুবিধা দেওয়ার সময় প্রশাসন এই তালিকাগুলিই ব্যবহার করে। অথচ গণনার সময়ে সেই তালিকাকে অস্বীকার করা স্ববিরোধী।

সংগঠনগুলির মতে, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য তালিকার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে ঠিকই। একই গোষ্ঠী কোনও রাজ্যে ওবিসি হিসাবে স্বীকৃত হলেও কেন্দ্রীয় তালিকায় নাও থাকতে পারে। একই জাতি আবার অঞ্চলভেদে একাধিক নামে পরিচিত। কিন্তু এই অসঙ্গতিই তালিকা পরিমার্জনের প্রয়োজন প্রমাণ করে; তালিকা সম্পূর্ণ বাতিল করার যুক্তি দেয় না। বিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানী, রাজ্য সরকার, অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গড়ে নাম, বিকল্প নাম, উপজাতি ও আঞ্চলিক পরিচয়গুলি মিলিয়ে নেওয়া সম্ভব।

‘খোলা উত্তর’-নির্ভর পদ্ধতির সবচেয়ে বড় বিপদ হিসেবে ২০১১ সালের আর্থ-সামাজিক ও জাতি সমীক্ষার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হচ্ছে। সেই সমীক্ষায় মানুষ নিজের মতো করে জাতির নাম বলেছিলেন। বানানের ভুল, পদবি, গোত্র, পেশা, ধর্মীয় পরিচয় এবং একই জাতির বিভিন্ন আঞ্চলিক নাম পৃথক পরিচয় হিসেবে নথিবদ্ধ হওয়ায় প্রায় ৪৬ লক্ষ ৭০ হাজার আলাদা নাম উঠে আসে। তুলনায় ১৯৩১ সালের শেষ পূর্ণাঙ্গ জাতিগণনায় নথিবদ্ধ জাতির সংখ্যা ছিল ৪,১৪৭। বিপুল তথ্যকে শ্রেণিবদ্ধ করতে না পারায় ২০১১ সালের কাঁচা জাতিগত তথ্য শেষ পর্যন্ত প্রকাশ করেনি কেন্দ্র।

ওবিসি প্রতিনিধিদের আশঙ্কা, একই পদ্ধতি অনুসরণ করলে আসন্ন গণনার ফলও নীতিনির্ধারণে ব্যবহারযোগ্য হবে না। যেমন একটি সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের ছুতোর, জাঙ্গিড়, খাতি, ধীমান, সুতার, তরখান, রামগঢ়িয়া অথবা বিশ্বকর্মা বলে পরিচয় দিতে পারেন। পূর্বনির্ধারিত সম্পর্কসূচক কাঠামো না থাকলে এগুলি আলাদা জাতি হিসেবে নথিবদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বানানের সামান্য হেরফের চিহ্নিত করা গেলেও সামাজিক ও আঞ্চলিক ভাবে আলাদা পরিচয়গুলিকে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে এক ছাতার নীচে আনা কঠিন।

সংগঠনগুলির প্রস্তাব, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য ওবিসি তালিকা মিলিয়ে রাজ্যভিত্তিক একটি পরিমার্জিত তালিকা তৈরি করা হোক। তার সঙ্গে প্রতিটি জাতির বিকল্প ও স্থানীয় নাম যুক্ত করা যেতে পারে। তালিকায় নাম না পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য ‘অন্যান্য’ ঘর রেখে নিজের পরিচয় লেখার সুযোগও দেওয়া যায়। পরে বিশেষজ্ঞ কমিটি সেই উত্তর যাচাই ও শ্রেণিবদ্ধ করবে।

ওবিসি গোষ্ঠীগুলির কাছে এই বিতর্ক নিছক গণনার কৌশল নিয়ে নয়; এর সঙ্গে সংরক্ষণ, প্রতিনিধিত্ব এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন জড়িত। যথার্থ তথ্য না থাকলে ওবিসিদের প্রকৃত জনসংখ্যা, শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে তাঁদের অংশীদারি কিংবা সংরক্ষণের সুবিধা বণ্টনের বৈষম্য নির্ণয় করা যাবে না। তাদের আশঙ্কা, জাতি গণনার ঘোষণা হলেও পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে শেষ পর্যন্ত যদি ব্যবহারযোগ্য তথ্যই না মেলে, তা হলে গোটা উদ্যোগটি আরও এক বার ২০১১ সালের মতো নিষ্ফল হয়ে উঠবে।