লকাতা থেকে দার্জিলিং—টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা। কোথাও রাস্তাঘাট জলমগ্ন, কোথাও পাহাড়ি ঢালে ধসের আশঙ্কা, আবার কোথাও প্রবল বৃষ্টির চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরিকাঠামো। আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আপাতত দুর্যোগ কাটার সম্ভাবনা নেই। উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও সমতলের জেলাগুলিতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি বজ্রপাত এবং ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

বুধবার সকালে দার্জিলিং রেলস্টেশনের ঐতিহাসিক ইঞ্জিনশালার একাংশ ভেঙে পড়ে। সেই সময় সেখানে কাজ করছিলেন কয়েকজন রেলকর্মী। ধ্বংসস্তূপের আঘাতে আটজন আহত হন। তাঁদের দ্রুত স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলের মুখপাত্র প্রতীক্ষা ছেত্রী জানিয়েছেন, আহতদের কারও অবস্থাই গুরুতর নয়। প্রবল বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার কারণেই কাঠামোটি ভেঙে পড়েছে বলে প্রাথমিক অনুমান।

ইঞ্জিনশালাটি পাহাড়ের গুরুত্বপূর্ণ হিল কার্ট রোডের পাশে অবস্থিত। সেটি ভেঙে পড়ার পরে প্রচুর ধ্বংসাবশেষ রাস্তায় জমে যায়। ফলে ওই পথে যান চলাচল আংশিকভাবে ব্যাহত হয়। প্রশাসন এবং রেলকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু করেছেন। একই সঙ্গে ইঞ্জিনশালার বাকি অংশ কতটা নিরাপদ, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিরাপত্তার কারণে দার্জিলিংয়ের টয় ট্রেনের আনন্দভ্রমণ পরিষেবাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।

আবহাওয়া দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বুধবার সকাল সাড়ে আটটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দার্জিলিং শহরে ৩৭ মিলিমিটার এবং কালিম্পংয়ে ৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। একটানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে পড়ায় দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলার একাধিক এলাকায় ধস নামার আশঙ্কা বেড়েছে। বিশেষ করে খাড়া ঢাল, নির্মীয়মাণ রাস্তা এবং আগে ধস নামা অঞ্চলগুলিতে বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

জলপাইগুড়ি ও কালিম্পংয়ে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। দার্জিলিং, মালদহ, আলিপুরদুয়ার এবং দক্ষিণ দিনাজপুরের কোনও কোনও জায়গাতেও ভারী বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টির তীব্রতা ধীরে ধীরে জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার এবং সংলগ্ন এলাকায় সরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিক্ষিপ্তভাবে ভারী বৃষ্টি চলতে পারে।

পরিস্থিতি উদ্বেগজনক দক্ষিণবঙ্গেও। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে বীরভূমের শ্রীনিকেতনে—২৬৩ মিলিমিটার। প্রবল বর্ষণে শ্রীনিকেতন ও সংলগ্ন শান্তিনিকেতনের বহু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। বিশ্বভারতী চত্বরের আশপাশেও জল জমার খবর পাওয়া যায়। নিচু এলাকার বাড়িঘর ও দোকানে জল ঢুকে পড়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

পশ্চিম বর্ধমানের বার্নপুরে ২১০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। কলকাতার আলিপুরে বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ১২৭ মিলিমিটার। ব্যারাকপুরে ১২০ মিলিমিটার এবং আসানসোলে ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টি নথিবদ্ধ হয়েছে। তিলপাড়া ব্যারেজ এলাকায় ৮০ মিলিমিটার এবং বাঁকুড়ায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

কলকাতায় রাত থেকে শুরু হওয়া প্রবল বৃষ্টির জেরে বুধবার সকালে শহরের বহু গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। অফিসের ব্যস্ত সময়ে যানবাহনের গতি কমে যায়। কোথাও বাস ও ছোট গাড়ি জল ঠেলে এগিয়েছে, কোথাও আবার যান চলাচল পুরোপুরি থমকে যায়। উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ কলকাতার একাধিক নিচু এলাকায় হাঁটুসমান জল জমে। নিকাশি পাম্প চালিয়ে জল নামানোর কাজ শুরু করে কলকাতা পুরসভা।

আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন, যে সুস্পষ্ট নিম্নচাপটি গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এবং উপকূলীয় ওড়িশার উপরে অবস্থান করছিল, সেটি উত্তর-পূর্ব মধ্যপ্রদেশের দিকে সরে গিয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত ঘূর্ণাবর্ত এবং দিঘার উপর দিয়ে বিস্তৃত মৌসুমি অক্ষরেখা এখনও পশ্চিমবঙ্গের দিকে প্রচুর জলীয় বাষ্প টেনে আনছে। সেই কারণেই নিম্নচাপ সরে গেলেও বৃষ্টি পুরোপুরি কমছে না।

৪ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমে হালকা থেকে মাঝারি হতে পারে। তবে ৮ সেপ্টেম্বর থেকে বীরভূম, মুর্শিদাবাদ এবং পশ্চিম বর্ধমানে ফের ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নদীর জলস্তর বৃদ্ধি, নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়া এবং ফসলের ক্ষতির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বজ্রবিদ্যুৎ শুরু হলে খোলা জায়গা, জলাশয়, গাছ এবং বিদ্যুতের খুঁটির কাছ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন আবহাওয়াবিদেরা। পাহাড়ি এলাকায় অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়াতে এবং প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলতে বলা হয়েছে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস স্পষ্ট—রাজ্যের আকাশ থেকে এখনই দুর্যোগের মেঘ সরছে না।