কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর বহু প্রতীক্ষিত স্মৃতিকথা বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ–এর ভারতীয় সংস্করণ নিয়ে পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়ার সঙ্গে মতবিরোধ কেবল তিন-চারটি অনুচ্ছেদে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রকাশনা সংস্থার আইনজীবীরা বইটির ‘একাধিক অধ্যায়ে’ পরিবর্তন ও কিছু অংশ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। অন্তত দু’মাস ধরে লেখকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা চলার পর শেষ পর্যন্ত প্রকাশনার চুক্তিই ভেস্তে যায়। আপত্তির কেন্দ্রে ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্পর্কে সোনিয়ার পর্যবেক্ষণ, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ভূমিকা, ভারত-চিন সংঘাত, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, দাঙ্গা এবং সংখ্যালঘুদের অবস্থার মতো রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়। বইটিতে মোদীর সঙ্গে সোনিয়ার বিভিন্ন সাক্ষাতের বিবরণ এবং অন্য প্রধানমন্ত্রীদের সঙ্গে তাঁর তুলনাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

সোনিয়ার ঘনিষ্ঠ এক সহযোগী হিন্দুস্তান টাইমসকে জানিয়েছেন, ২০০৪ সালে গুজরাতের একটি জনসভায় মোদীর মুখে তাঁর উদ্দেশে ব্যবহৃত ‘জার্সি গরু’ মন্তব্যের কথাও স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন সোনিয়া। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মোদীর সঙ্গে তাঁর যেসব বৈঠক হয়েছে, সেখানকার কথাবার্তা ও নিজের উপলব্ধিও তিনি লিখেছেন। প্রকাশনা সংস্থা প্রথমে বহু অংশ নিয়ে আপত্তি জানালেও শেষ পর্যন্ত তিন-চারটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ বাদ না দেওয়াতেই সমঝোতার পথ বন্ধ হয়ে যায় বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

পরবর্তী অনুসন্ধানে জানা যায়, পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়ার অন্তত তিনজন সম্পাদক ও পরামর্শদাতা পাণ্ডুলিপির কাজ করছিলেন। সংস্থার আইনজীবীরা অধ্যায় ধরে পরিবর্তন ও বর্জনের তালিকা তৈরি করে লেখকের প্রতিনিধিদের কাছে পাঠান। প্রথম দিকে আলোচনা সৌহার্দ্যপূর্ণ থাকলেও শেষ পর্যায়ে তা যথেষ্ট কঠিন হয়ে ওঠে।

লেখকপক্ষের যুক্তি ছিল, ভারতীয় প্রকাশকের আইনজীবীরা মাত্রাতিরিক্ত সতর্কতা দেখাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, তাঁদের প্রস্তাব মেনে মোদী, আরএসএস বা গালওয়ান-পরবর্তী ভারত-চিন অচলাবস্থার উল্লেখ বাদ দিলে একই বইয়ের দু’টি আলাদা পাঠ তৈরি হবে—একটি আন্তর্জাতিক পাঠকের জন্য, অন্যটি ভারতীয় পাঠকের জন্য। তখন ভারতীয় পাঠককে বিদেশি সংস্করণের সঙ্গে তুলনা করে দেখতে হবে, তাঁর দেশের জন্য ছাপা বই থেকে কোন কোন অংশ ‘শোধন’ করা হয়েছে।

তবে প্রকাশকের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া জানিয়েছে, কোনও বাইরের চাপের কারণে তারা বইটি প্রকাশ করা থেকে পিছিয়ে যায়নি। সংস্থার মুখপাত্র পল্লবী নারায়ণের বক্তব্য, বইটির স্বত্ব পাওয়া ছিল কঠিন; তাই তারা এটি প্রকাশ করতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিল। স্বাভাবিক সম্পাদকীয় প্রক্রিয়ায় কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল—কিছু ক্ষেত্রে লেখকপক্ষ পরিবর্তন মেনে নিয়েছিল, আবার কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রকাশক লেখকের বক্তব্যই গ্রহণ করেছিল। শেষ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় সোনিয়ার দলই আর এগোতে চায়নি। গোপনীয়তার চুক্তির কারণে সেই বিতর্কিত বিষয়টি কী, তা প্রকাশ করেনি সংস্থা।

অন্য দিকে কংগ্রেস নেতাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে যে বই অবিকৃত অবস্থায় প্রকাশ করা সম্ভব, ভারতে তার রাজনৈতিক অংশ ছেঁটে ফেলতে চাওয়ার পিছনে চাপের প্রশ্ন এড়ানো যায় না। বিজেপি অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, কোনও স্মৃতিকথায় তথ্যগত অসঙ্গতি থাকলে তা যাচাই করা প্রকাশকের দায়িত্ব। ফলে একটি সম্পাদকীয় মতভেদ দ্রুত রাজনৈতিক বাক্‌যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।

বিলংগিং প্রকাশের আন্তর্জাতিক তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ১০ নভেম্বর। পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউসের মার্কিন প্রতিষ্ঠান আলফ্রেড এ নফ বইটি প্রকাশ করবে; প্রথম মুদ্রণসংখ্যা এক লক্ষ। বইটিতে যুদ্ধোত্তর ইতালিতে সোনিয়ার শৈশব, কেমব্রিজে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে পরিচয়, ভারতে আগমন, নেহরু-গান্ধী পরিবারের অন্দরমহল, সঞ্জয় গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীবের মৃত্যু, তাঁর রাজনীতিতে প্রবেশ এবং ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার সিদ্ধান্ত স্থান পেয়েছে।

পেঙ্গুইন ইন্ডিয়ার সঙ্গে চুক্তি ভাঙার পরে ভারতীয় সংস্করণের জন্য একাধিক প্রকাশনা সংস্থা আগ্রহ দেখিয়েছে। হার্পারকলিন্স চুক্তি চূড়ান্ত করার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে খবর, যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও হয়নি। ফলে বইটি ভারতে প্রকাশিত হবে কি না, সেই সংশয় অনেকটাই কেটেছে; কিন্তু ভারতীয় পাঠক শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সংস্করণের অবিকৃত পাঠই হাতে পাবেন কি না—বিতর্কের মূল প্রশ্ন এখন সেটিই।