প্যাকেটজাত খাবারের সামনের দিকে লাল ষড়ভুজের মধ্যে বড় অক্ষরে লেখা থাকতে পারে—‘অতিরিক্ত চর্বি’, ‘অতিরিক্ত চিনি’ কিংবা ‘অতিরিক্ত নুন’। ভারতের খাদ্যনিরাপত্তা ও মান নির্ধারণ কর্তৃপক্ষ বা এফএসএসএআই সুপ্রিম কোর্টে এমনই এক প্রস্তাব জমা দিয়েছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে দোকানে দাঁড়িয়েই ক্রেতা বুঝতে পারবেন, কোনও খাবারে স্বাস্থ্যের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান মাত্রাতিরিক্ত রয়েছে কি না।

এত দিন প্যাকেটের পিছনে দেওয়া পুষ্টিগত তথ্য থেকে চর্বি, চিনি ও সোডিয়ামের পরিমাণ বিচার করতে হত। অধিকাংশ ক্রেতার পক্ষেই সেই হিসাব বোঝা সহজ নয়। নতুন ব্যবস্থায় জটিল সংখ্যা বিশ্লেষণের বদলে প্যাকেটের সামনেই স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেখা যাবে। অর্থাৎ, নিয়ন্ত্রণের দর্শন কেবল তথ্য প্রকাশ থেকে সরে এসে বিপদ সম্পর্কে সরাসরি সাবধান করার দিকে এগোচ্ছে।

এফএসএসএআইয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, আইসিএমআর–জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের ২০২৪ সালের খাদ্যনির্দেশিকায় নির্ধারিত সীমার ভিত্তিতেই সতর্কবার্তা বসবে। প্রথম পর্যায়ে এমন খাবারের মোড়কে লাল চিহ্ন থাকবে, যাতে অতিরিক্ত চর্বি, চিনি ও নুন—এই তিনটির মধ্যে অন্তত দু’টি মাত্রাতিরিক্ত। নির্দিষ্ট মিষ্টি পানীয়ের গায়ে লেখা হবে ‘অত্যধিক মিষ্টি পানীয়’। দ্বিতীয় পর্যায়ে তিনটি উপাদানের যে কোনও একটির মাত্রা বেশি হলেই সতর্কবার্তা দিতে হবে। প্যাকেটের পিছনের পুষ্টিতালিকার অক্ষরের তুলনায় সতর্কবার্তার অক্ষর অন্তত এক মাপ বড় রাখার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

ঘি, ভোজ্য তেল, নুন, চিনি, গুড়, মধু, শস্য এবং তাজা ফলমূলের মতো একক উপাদানের খাদ্যকে অবশ্য এই বিধির বাইরে রাখা হতে পারে। শিল্পসংস্থাগুলিকে খাদ্যের উপাদান বদলানো এবং নতুন মোড়ক তৈরির সময় দিতেই ব্যবস্থা ধাপে ধাপে চালুর কথা ভাবা হয়েছে। ফলে এই বিধি শুধু ক্রেতাকে সচেতন করবে না, সতর্কচিহ্ন এড়াতে উৎপাদকদের চিনি, নুন ও চর্বির পরিমাণ কমাতেও উৎসাহিত করতে পারে।

গত ১৩ আগস্ট বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা ও বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চ এফএসএসএআইয়ের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে দু’সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে বলেছিল। আদালতের মতে, প্যাকেটের সামনের চিহ্ন ক্রেতাকে কেনার মুহূর্তে সহজবোধ্য তথ্য দেওয়ার একটি সহায়ক ব্যবস্থা। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় শিশুদের স্থূলতা। ২০০০ সালে স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোরদের দুই শতাংশের ওজন অতিরিক্ত ছিল; ২০২২ সালে তা বেড়ে দশ শতাংশ হয়েছে। স্কুলের ভিতরে পাওয়া খাবারের প্রায় ৮০ শতাংশ সদ্য রান্না করা হলেও, স্কুলের আশপাশে বিক্রি হওয়া খাদ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই প্যাকেটজাত জলখাবার।

অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-২৬-এ বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বাজার দেড়শো শতাংশেরও বেশি বেড়েছে; একই সময়ে নারী ও পুরুষের মধ্যে স্থূলতাও দ্বিগুণ হয়েছে। চিলি, কানাডা ও ইজরায়েলের মতো দেশে সামনের সতর্কচিহ্ন ইতিমধ্যেই চালু। ভারতের প্রস্তাব এখনও চূড়ান্ত বিধি নয়; নির্ধারিত নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া ও সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী নির্দেশের উপর তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তবে লাল ষড়ভুজটি কার্যকর হলে তা নিছক নতুন মোড়ক নয়—জনস্বাস্থ্যকে খাদ্যশিল্পের সুবিধার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত মোড় হবে।