‘মাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল জল’: হাসপাতালের শয্যায় পাঁচ বছরের ইশারা

যা জানা জরুরি
- গলায় নরম বন্ধনী, হাতে ওষুধ দেওয়ার নল, মুখে আঘাতের চিহ্ন।
- কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষণ হাসপাতালের শিশু শল্যচিকিৎসা বিভাগের শয্যায় নিঃশব্দে শুয়ে পাঁচ বছরের ইশারা তামাং।
- কখনও চোখ মেলে চারপাশে তাকাচ্ছে, আবার চোখ বন্ধ করে দিচ্ছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
গলায় নরম বন্ধনী, হাতে ওষুধ দেওয়ার নল, মুখে আঘাতের চিহ্ন। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষণ হাসপাতালের শিশু শল্যচিকিৎসা বিভাগের শয্যায় নিঃশব্দে শুয়ে পাঁচ বছরের ইশারা তামাং। কখনও চোখ মেলে চারপাশে তাকাচ্ছে, আবার চোখ বন্ধ করে দিচ্ছে। পাশে পরিবারের কেউ নেই। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরাই আপাতত তার অভিভাবক।
২৬ আগস্ট নেপাল–তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুওয়া জেলায় আকস্মিক বন্যার সময় মায়ের সঙ্গে ছিল ইশারা। জল, কাদা ও পাথরের প্রবল স্রোতে দু’জনেই ভেসে যায়। কোনও ভাবে একটি জালে আটকে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যায় শিশুটি। উদ্ধারের পরে জ্ঞান ফিরলে হাসপাতালের কর্মীদের সে বলে, “মাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আমি লাফিয়ে সামনে এগোনোর চেষ্টা করেছিলাম। তার পর জালে আটকে যাই।” তার মা এখনও নিখোঁজ। বাবা কাঠমান্ডুতে থাকেন বলে ইশারা জানিয়েছে; সমাজমাধ্যমের সাহায্যে তাঁকে খোঁজা হচ্ছে।
ইশারার কাহিনি নেপালের বিপর্যস্ত জনজীবনের একটি মাত্র ছবি। বন্যায় উত্তর ও মধ্য নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ভুটে কোশী ও ত্রিশূলী নদীপথ ধরে নেমে আসা জলস্রোত ভাসিয়ে নিয়ে গেছে বাড়ি, দোকান, যানবাহন, সেতু ও রাস্তা। প্রাণহানি সাতশো ছাড়িয়েছে; নিখোঁজ প্রায় আড়াই হাজার মানুষ।
কাঠমান্ডুর হাসপাতালগুলির বাইরে এখন উদ্বিগ্ন মানুষের ভিড়। কেউ হাতে স্বজনের ছবি নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরছেন, কেউ দেওয়ালে সাঁটা নিখোঁজদের ছবির মধ্যে পরিচিত মুখ খুঁজছেন। আহত ও উদ্ধার হওয়া মানুষের তালিকায় নাম না পেলে আশার সঙ্গে ভয়ও বাড়ছে। বহু মৃতদেহ এতটাই ক্ষতবিক্ষত বা বিকৃত যে পরিচয় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে অশনাক্ত দেহ সমাধিস্থ করার কাজও শুরু হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও অলৌকিক উদ্ধারের ঘটনা আশা জোগাচ্ছে। সীমান্ত শহর টিমুরেতে ভেঙে পড়া নিরাপত্তা চৌকির নীচ থেকে কান্নার শব্দ শুনে উদ্ধারকারীরা ছ’বছরের এক শিশুকে জীবিত বার করেন। রাসুওয়ার স্যাব্রুবেসির কাছে ধ্বংসাবশেষের নীচে আটকে থাকা পাঁচ বছরের মনীষাকেও দু’দিন পরে জীবিত উদ্ধার করা হয়। কাঠমান্ডুর হাসপাতালে তার সঙ্গে বাবা-মায়ের পুনর্মিলন হয়েছে।
অন্য দিকে, টিমুরের ব্যবসায়ী নিশ্চল ত্রিপাঠী বহুতল থেকে লাফিয়ে পাহাড়ের দিকে ছুটে প্রাণ বাঁচিয়েছেন। কিন্তু তাঁর ভাই, সহকর্মী এবং সাত জন ট্রাকচালকের খোঁজ নেই। ত্রিশূলী বাজারের রেখা দেবী গোসাঁই হারিয়েছেন বাড়ি, চারটি দোকান এবং সমস্ত ওষুধ।
বৃষ্টি থেমে থেমে চলায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। নদীর জল আবার বাড়তে শুরু করায় নতুন বন্যার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। তবু কাদা সরিয়ে, ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে অনুসন্ধান চলছে। কারণ প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া নামের সঙ্গে এখনও জড়িয়ে রয়েছে ফিরে আসার ক্ষীণ কিন্তু অটুট আশা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



