নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সামনে আসছে পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা হিমবাহের ধস। বিপর্যয়ের সূত্রপাত ঠিক কীভাবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে ভারতের জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করছে। কর্তৃপক্ষের সদস্য কৃষ্ণস্বরূপ বৎস জানিয়েছেন, ভারতের বহু এলাকাতেও একই ধরনের বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। তাই নেপালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের হিমবাহবিশেষজ্ঞ অনিল কুলকার্নির প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিপুল বরফ ও পাথর প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার নীচে আছড়ে পড়েছিল। উপগ্রহচিত্রের ভিত্তিতে তাঁর ধারণা, পতনের প্রচণ্ড শক্তি এবং উপত্যকার জল ও ধ্বংসাবশেষ মিলে ভয়াবহ স্রোত তৈরি করে। যেখানে ধস নেমেছিল, সেখানে আগে হিমবাহ থাকলেও পরে বরফ সরে গিয়েছিল।

জাতীয় দূরসংবেদন কেন্দ্রের প্রাথমিক মূল্যায়নে আরেকটি সম্ভাবনার কথা এসেছে: বরফধস নদী আটকে দিয়েছিল, পরে সেই অস্থায়ী বাধা ভেঙে জল নেমে আসে। কুলকার্নি অবশ্য জানিয়েছেন, এই ঘটনাক্রম এখনই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে হিমবাহ ধসের সম্ভাবনা জোরালো হলেও, নদী অবরুদ্ধ হয়ে বাঁধভাঙা বন্যা হয়েছিল কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ।

বৃহত্তর উদ্বেগের কারণ হিমালয়ের হিমবাহ ও হ্রদগুলির দ্রুত পরিবর্তন। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার ২০২৪ সালের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট হিমালয়ীয় নদী অববাহিকায় চিহ্নিত দশ হেক্টরের বড় ২,৪৩১টি হ্রদের মধ্যে ৬৭৬টির আয়তন ১৯৮৪ সালের পর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এগুলির মধ্যে ১৩০টি ভারতের সীমানার ভিতরে। অর্থাৎ, গোটা অববাহিকার হিসাবকে শুধু ভারতের হ্রদের সংখ্যা বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

আয়তন বেড়ে যাওয়া ৬৭৬টি হ্রদের মধ্যে ৬০১টি দ্বিগুণেরও বেশি বড় হয়েছে। হিমবাহ পিছিয়ে গেলে নতুন হ্রদ তৈরি হয়, পুরনো হ্রদেও জল বাড়ে। বরফ, পাথর ও মাটির তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে সেই জল আচমকা নীচের জনপদে নেমে আসতে পারে। বরফ-পাথরের ধস কিংবা চরম আবহাওয়া এমন বাঁধ ভাঙার কারণ হতে পারে। তবে হ্রদের আয়তন বৃদ্ধির তথ্য একাই কোনও নির্দিষ্ট বিপর্যয়ের কারণ প্রমাণ করে না।

দুর্গম পাহাড়ে নিয়মিত সরেজমিন পর্যবেক্ষণ কঠিন। তাই একই এলাকার ধারাবাহিক উপগ্রহচিত্র থেকে হ্রদের বিস্তার এবং বরফের পরিবর্তন বোঝার উপর জোর দিয়েছে ইসরো। এই তথ্য বিপজ্জনক স্থান বাছাই ও ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনায় সহায়ক।

কিন্তু শুধু পরিচিত হ্রদগুলির দিকে নজর রাখলেই কি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে? সাম্প্রতিক একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, হঠাৎ ঝুলন্ত হিমবাহ ভেঙে পড়া কিংবা কয়েক সপ্তাহে বরফের উপরে নতুন হ্রদ তৈরি হওয়ার মতো পরিবর্তন প্রচলিত বিপদমানচিত্রে ধরা না-ও পড়তে পারে। তাই নজরদারির ব্যবস্থা হতে হবে পরিবর্তনশীল। নতুন উপগ্রহচিত্র ও তাৎক্ষণিক তথ্য অনুযায়ী ঝুঁকির মূল্যায়ন সংশোধন করতে হবে।

গবেষকদের মতে, আগাম সতর্কতার সাফল্য শুধু যন্ত্রপাতির উপর নির্ভর করে না। সতর্কবার্তা স্থানীয় মানুষ বুঝতে পারছেন কি না, প্রশাসন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে কি না এবং বিপদ দেখা দিলে নিরাপদ স্থানে সরানোর ব্যবস্থা আছে কি না—এসবও সমান জরুরি। স্থানীয় বাসিন্দাদের পর্যবেক্ষণও নজরদারির কাজে যুক্ত করা প্রয়োজন।

হিমালয়ের নদী ও পাহাড়ের বিপদ রাজনৈতিক সীমানা মেনে চলে না। তাই তথ্য বিনিময় ও প্রতিবেশী দেশগুলির সহযোগিতাকে মানবিক দায়িত্ব হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকেরা। নেপালের বিপর্যয় নিয়ে ভারতের প্রস্তাবিত সমীক্ষার গুরুত্ব এখানেই: কী ভেঙেছিল, কত দ্রুত স্রোত নেমেছিল এবং কোথায় সতর্কতার সুযোগ ছিল, তা বোঝা ভবিষ্যতের প্রস্তুতিকে কার্যকর করতে পারে। লক্ষ্য হওয়া উচিত বিপদের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাকে মানুষের কাছে সময়মতো পৌঁছনো সতর্কতা ও বাস্তব উদ্ধারপ্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত করা।