বিন্দুতেই অনন্ত

যা জানা জরুরি
- ছোট ছোট রঙিন বিন্দু দিয়ে বদলে দিয়েছিলেন শিল্পকে দেখার অভিজ্ঞতা।
- কখনও বিশাল কুমড়োর গায়ে, কখনও দেওয়ালজুড়ে, কখনও আয়নায় ঘেরা ঘরের অসংখ্য প্রতিফলনে—তাঁর শিল্পে বিন্দু হয়ে উঠেছিল অনন্তের প্রতীক।
- ১৪ অগস্ট টোকিয়োর একটি হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ছোট ছোট রঙিন বিন্দু দিয়ে বদলে দিয়েছিলেন শিল্পকে দেখার অভিজ্ঞতা। কখনও বিশাল কুমড়োর গায়ে, কখনও দেওয়ালজুড়ে, কখনও আয়নায় ঘেরা ঘরের অসংখ্য প্রতিফলনে—তাঁর শিল্পে বিন্দু হয়ে উঠেছিল অনন্তের প্রতীক। প্রয়াত হলেন জাপানি শিল্পী ইয়ায়োই কুসামা। বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।
১৪ অগস্ট টোকিয়োর একটি হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর। বৃহস্পতিবার, ২৭ অগস্ট, ইয়ায়োই কুসামা সংগ্রহশালা ও তাঁর নামাঙ্কিত ফাউন্ডেশন মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ করে। মৃত্যুর কারণ জানানো হয়নি।
দীর্ঘ শিল্পজীবনে ছবি, ভাস্কর্য, পরিবেশনাশিল্প, উপন্যাস ও কবিতা—বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন কুসামা। তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিবৃতি অনুযায়ী, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আঁকা থামাননি তিনি। পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারে ভালোবাসা—এই বিশ্বাসও শেষ পর্যন্ত ধরে রেখেছিলেন। তাঁর শিল্পের মাধ্যমে মানুষের কাছে আশা ও ভবিষ্যতের শক্তি পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
১৯২৯ সালে জাপানের মাতসুমোতো শহরে জন্ম কুসামার। ছোটবেলা থেকেই আঁকার প্রতি ঝোঁক ছিল। একই সঙ্গে তাঁকে তাড়া করত দৃষ্টিবিভ্রম ও উদ্বেগ। কখনও মনে হতো, চারপাশের ফুল কথা বলছে, কখনও পরিচিত দৃশ্য বদলে যাচ্ছে অচেনা কোনও জগতে। সেই অভিজ্ঞতাগুলিকে ক্যানভাসে ধরতে ধরতেই গড়ে ওঠে তাঁর স্বতন্ত্র শিল্পভাষা।
একই আকার, বিন্দু কিংবা নকশার অবিরাম পুনরাবৃত্তি তাঁর শিল্পে শুধু নান্দনিক কৌশল ছিল না; হয়ে উঠেছিল তাঁর মনের অভিজ্ঞতার দৃশ্যমান প্রকাশ। একটি বিন্দু থেকে অসংখ্য বিন্দু, আর সেখান থেকে যেন সীমাহীন এক মহাবিশ্ব—এই ছিল তাঁর শিল্পের নিজস্ব ব্যাকরণ।
টোকিও থেকে নিউ ইয়র্ক
জাপানের সামাজিক রক্ষণশীলতা ও শিল্পজগতের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে আমেরিকায় পাড়ি দেন কুসামা। নিউ ইয়র্কে শুরু হয় নতুন করে নিজেকে প্রতিষ্ঠার লড়াই। অর্থাভাব, ভাষার বাধা এবং পুরুষ-প্রধান শিল্পজগতের প্রতিকূলতার মধ্যেও ষাটের দশকে তাঁর পরীক্ষামূলক কাজ নজর কাড়তে শুরু করে।
শুধু ছবি বা ভাস্কর্যেই থেমে থাকেননি তিনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদে আয়োজন করেছিলেন পরিবেশনাশিল্প। শিল্পের সঙ্গে শরীর, রাজনীতি ও প্রতিবাদের সম্পর্ককে গ্যালারির বাইরেও নিয়ে এসেছিলেন তিনি।
যেখানে ঘরের শেষ নেই
কুসামার সবচেয়ে পরিচিত সৃষ্টিগুলির মধ্যে অন্যতম আয়নায় ঘেরা ‘ইনফিনিটি রুম’। আলো, রং ও নানা বস্তুর প্রতিফলন সেখানে অসংখ্য বার ফিরে আসে। দর্শকের সামনে তৈরি হয় এমন এক পরিসর, যার শুরু বা শেষ যেন চোখে ধরা পড়ে না।
তাঁর শিল্পের বিশেষত্ব এখানেই—দর্শককে শুধু সামনে দাঁড়িয়ে দেখার সুযোগ দেওয়া নয়, বরং শিল্পের ভিতরে প্রবেশের অনুভূতি দেওয়া। আয়না, আলো এবং পুনরাবৃত্তির মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বও যেন সেই অসীম পরিসরের একটি অংশ হয়ে ওঠে।
বিন্দুখচিত কুমড়োর ভাস্কর্যও হয়ে ওঠে তাঁর শিল্পীসত্তার অন্যতম পরিচিত প্রতীক।
যন্ত্রণা থেকে সৃষ্টির দিকে
১৯৭৩ সালে জাপানে ফিরে আসেন কুসামা। পরে স্বেচ্ছায় একটি মনোরোগ চিকিৎসাকেন্দ্রে থাকতে শুরু করেন। সেখান থেকে কাছের কর্মশালায় গিয়ে নিয়মিত শিল্পচর্চা করতেন।
মানসিক অসুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে থামাতে পারেনি। বরং ব্যক্তিগত ভয়, উদ্বেগ ও নিঃসঙ্গতাকে এমন এক শিল্পভাষায় রূপ দিয়েছিলেন, যার সামনে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার মিল খুঁজে পেয়েছেন।
অবহেলা থেকে বিশ্বমঞ্চে
জীবনের পরবর্তী সময়ে কুসামার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট-সহ বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত হয়েছে তাঁর কাজ। শিল্পের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর বিন্দুর নকশা পৌঁছে যায় পোশাক ও নকশার জগতেও।
২০১৬ সালে তিনি জাপানের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ‘অর্ডার অব কালচার’ সম্মানে ভূষিত হন। দীর্ঘ অবহেলা, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির এক স্বতন্ত্র মুখ।
তাঁর মৃত্যুর পরও টোকিয়োর কুসামা সংগ্রহশালায় চলতি প্রদর্শনী নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ৩০ অগস্ট পর্যন্ত চলবে বলে জানানো হয়েছে। শিল্পীর অনুপস্থিতিতে সেই প্রদর্শনী যেন তাঁর রেখে যাওয়া জগতের সঙ্গে আরও এক বার দেখা করার সুযোগ।
কুসামার শিল্পে কোনও বিন্দুই একা নয়। অসংখ্য বিন্দু একে অন্যের পাশে এসে তৈরি করে সীমাহীন বিস্তার। ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা, ভয় ও যন্ত্রণা থেকে সর্বজনীন বিস্ময়ে পৌঁছনোর সেই যাত্রাই ৯৭ বছরের এই শিল্পীর সবচেয়ে উজ্জ্বল উত্তরাধিকার।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



