প্রচলিত ধারণার বিপরীতে, ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি বেসরকারি ব্যাঙ্কের তুলনায় বেশি দক্ষ। বিশেষ করে গত তিন বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির দক্ষতা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক উপদেষ্টা পরিষদের একটি গবেষণাপত্রে এই দাবি করা হয়েছে।

‘গত এক দশকে ভারতের ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রের সংস্কার, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা: ডিইএ পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ’ শীর্ষক গবেষণাপত্রটির লেখক সৌম্যকান্তি ঘোষ এবং তাপসকুমার পারিদা। সৌম্যকান্তি প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক উপদেষ্টা পরিষদের আংশিক সময়ের সদস্য এবং ভারতীয় স্টেট ব্যাঙ্কের গোষ্ঠী মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। তাপসকুমার স্টেট ব্যাঙ্কের অর্থনৈতিক গবেষণা বিভাগের অর্থনীতিবিদ।

তাঁদের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির দক্ষতার হার ছিল ৯৩.১২ শতাংশ। সেখানে বেসরকারি ব্যাঙ্কের দক্ষতার হার ৮৬.০২ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাঙ্কের ৮৫.৮৮ শতাংশ।

দক্ষতার হার বলতে কী বোঝায়

কোনও ব্যাঙ্কের দক্ষতার হার ১০০ শতাংশের কম হওয়ার অর্থ হল, কম উপকরণ ব্যবহার করেও ব্যাঙ্কটি একই পরিমাণ পরিষেবা বা ফলাফল দিতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনও ব্যাঙ্কের দক্ষতার হার ৮৫ শতাংশ হলে, সেটি ১৫ শতাংশ উপকরণ কমিয়েও একই ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম।

২০১৪-১৫ থেকে ২০২৫-২৬—এই ১২ বছরের সামগ্রিক হিসাবেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি বেসরকারি ব্যাঙ্কের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির গড় দক্ষতার হার ছিল ৮৮.৫৩ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে তা ছিল ৮৫.৬২ শতাংশ। বিদেশি ব্যাঙ্কের হার সর্বোচ্চ—৮৮.৯৮ শতাংশ। তবে ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষে বিদেশি ব্যাঙ্কগুলির দক্ষতার হার ছিল ৯৫.৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ, গত এক দশকে তাদের দক্ষতা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে।

এই গবেষণায় ‘ডেটা এনভেলপমেন্ট অ্যানালিসিস’ বা তথ্যবেষ্টনী বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। একই ধরনের পণ্য বা পরিষেবা উৎপাদনকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আপেক্ষিক দক্ষতা নির্ধারণের জন্য এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।

গবেষণার ফলটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যখন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের আধিকারিকদের তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাঙ্কগুলিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে সেই প্রক্রিয়ায় ব্যাঙ্কিং ব্যবসার প্রয়োজনীয় সতর্কতা যেন ক্ষুণ্ণ না হয়, সে কথাও বলেছেন তিনি। অর্থমন্ত্রীর পর্যবেক্ষণ ছিল, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি এখনও সাধারণ মানুষের কাছে ‘সরকারি ব্যাঙ্ক’-এর পুরনো ভাবমূর্তিই বহন করছে।

শীর্ষে এইচএসবিসি ও জেপি মর্গ্যান

২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে একাধিক ব্যাঙ্ক দক্ষতার নিরিখে পূর্ণ ১০০ শতাংশ নম্বর পেয়েছে। তবে গবেষণার অন্তর্ভুক্ত ১২ বছরের প্রতিটি বছরেই কেবল দু’টি ব্যাঙ্ক এই পূর্ণমান ধরে রাখতে পেরেছে—এইচএসবিসি এবং জেপি মর্গ্যান চেজ।

গবেষকদের মতে, বিদেশি ব্যাঙ্কগুলির ব্যবসায়িক কাঠামোর কারণেই তাদের দক্ষতার হার সাধারণত দেশীয় ব্যাঙ্কগুলির তুলনায় বেশি।

বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলির মধ্যে ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৫-২৬ সময়কালে সবচেয়ে দক্ষ ছিল এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক। তার দক্ষতার হার ৯৭.৫৪ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির মধ্যে শীর্ষে থাকা ভারতীয় স্টেট ব্যাঙ্কের দক্ষতার হার ৯৭.৪৯ শতাংশ—এইচডিএফসি ব্যাঙ্কের চেয়ে সামান্য কম।

উল্লেখযোগ্য ভাবে, যে আইডিবিআই ব্যাঙ্কের বিলগ্নিকরণের চেষ্টা কেন্দ্রীয় সরকার বেশ কয়েক বছর ধরে চালাচ্ছে, সেটি গত ১২ বছরে দেশের সপ্তম সর্বাধিক দক্ষ ব্যাঙ্ক হিসেবে উঠে এসেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির মধ্যে কেবল ভারতীয় স্টেট ব্যাঙ্কই তার আগে রয়েছে।

সংযুক্তির প্রভাব পড়েছে দক্ষতায়

ব্যাঙ্কগুলির দক্ষতার হার নানা কারণে প্রভাবিত হতে পারে। গবেষণার অন্তর্ভুক্ত ৪৭টি ব্যাঙ্কের মধ্যে সর্বনিম্ন দক্ষতার হার ছিল ২০২১-২২ অর্থবর্ষে ডিবিএস ব্যাঙ্ক ইন্ডিয়ার—মাত্র ৪০.১২ শতাংশ। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে লক্ষ্মীবিলাস ব্যাঙ্কের সঙ্গে ডিবিএস ব্যাঙ্ক ইন্ডিয়ার সংযুক্তি এর অন্যতম কারণ হতে পারে।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২১-২২ অর্থবর্ষ ছাড়া বাকি সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি বেসরকারি ব্যাঙ্কের তুলনায় বেশি দক্ষ ছিল। ওই চার বছরে বিভিন্ন ব্যাঙ্কের সংযুক্তি এবং ব্যবসা, শাখা ও কর্মীর সংখ্যা পুনর্বিন্যাসের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির দক্ষতার হার সাময়িক ভাবে কমে থাকতে পারে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সংযুক্তি শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালের গোড়ায়। সেই সময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ভারতীয় স্টেট ব্যাঙ্কের পাঁচটি সহযোগী ব্যাঙ্ক এবং ভারতীয় মহিলা ব্যাঙ্ককে স্টেট ব্যাঙ্কের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে বিজয়া ব্যাঙ্ক ও দেনা ব্যাঙ্ককে ব্যাঙ্ক অব বরোদার সঙ্গে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সবচেয়ে বড় সংযুক্তির ঘোষণা হয় ২০২০ সালের মার্চে। সেই প্রক্রিয়ায় ওরিয়েন্টাল ব্যাঙ্ক অব কমার্স এবং ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়াকে পঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। সিন্ডিকেট ব্যাঙ্ক মিশে যায় কানাড়া ব্যাঙ্কের সঙ্গে। অন্ধ্র ব্যাঙ্ক ও কর্পোরেশন ব্যাঙ্ককে ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে এবং এলাহাবাদ ব্যাঙ্ককে ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্কের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়।

এই গোটা প্রক্রিয়ার ফলে দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১২।

সমান আকারের কয়েকটি বৃহৎ ব্যাঙ্ক গড়ার সুপারিশ

সৌম্যকান্তি ও তাপসকুমারের মতে, ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রে আরও সংযুক্তির উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তবে এমন ভাবে তা করতে হবে, যাতে বাজারের প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং প্রায় সমান আকারের কয়েকটি বৃহৎ ব্যাঙ্ক তৈরি হয়।

২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে উন্নত দেশে পরিণত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। সেই লক্ষ্য পূরণে অর্থনীতির ঋণের চাহিদা বিপুল ভাবে বাড়বে। বৃহৎ ও শক্তিশালী ব্যাঙ্ক তৈরি করা গেলে সেই চাহিদা পূরণ করা সহজ হবে বলে গবেষকদের মত।

গবেষণাপত্রে আরও বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে সাফল্যের প্রধান নির্ধারক হবে শুধু প্রযুক্তি নয়, মানবসম্পদের গুণমানও। দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি বাড়ছে। এই সমস্যা মোকাবিলায় ব্যাঙ্ক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে উপযুক্ত প্রতিভা আকর্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

আর্থিক ক্ষেত্রের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কর্মীদের সক্ষমতা নির্মাণ তাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার ব্যাঙ্কগুলির উৎপাদনশীলতাকে কতটা প্রভাবিত করেছে, ভবিষ্যতের গবেষণায় সেই বিষয়টিও বিশেষ ভাবে খতিয়ে দেখা দরকার বলে মত দুই অর্থনীতিবিদের।