০২৬ সালের মার্চে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সন্তানদের অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির সংরক্ষণ থেকে বাদ দেওয়ার একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না তাঁদের বেতন থেকে পাওয়া আয়। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ২০২৫-এর ফল প্রকাশের মাত্র পাঁচ দিন পরে এই রায় দেওয়া হয়। এখন সেই রায়ের প্রয়োগ সম্পর্কে শীর্ষ আদালতের ব্যাখ্যা চেয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।

এই মামলার বিষয়বস্তু কী, চাকরি ও নিয়োগ-সংক্রান্ত আইনে কোন নীতি প্রযোজ্য এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণে তার প্রভাবই এখানে আলোচ্য।

ক্রিমি লেয়ার মামলা

২০০৪ সালের ১৪ অক্টোবর কেন্দ্রীয় কর্মিবর্গ ও প্রশিক্ষণ দপ্তরের একটি চিঠি থেকেই এই মামলার সূত্রপাত। চিঠিটিতে ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বরের একটি সরকারি নির্দেশিকার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ওই নির্দেশিকায় অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির মধ্যে কারা ক্রিমি লেয়ারের অন্তর্ভুক্ত হবেন, তার মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয়েছিল।

ক্রিমি লেয়ার বলতে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির সেই সব আর্থিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে অগ্রসর সদস্যকে বোঝানো হয়, যাঁদের সরকারি সংরক্ষণের সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

১৯৯৩ সালের নির্দেশিকায় ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণের আয় ও সম্পত্তির পরীক্ষার ক্ষেত্রে বেতন এবং কৃষি থেকে পাওয়া আয় বাদ রাখা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৪ সালের ব্যাখ্যায় বলা হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন থেকে পাওয়া আয়ও ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণের মাপকাঠি হবে।

২০১৪ সাল পর্যন্ত এই ব্যাখ্যা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ২০১৫ অর্থাৎ ২০১৬ সালের আধিকারিকদের দল থেকে এটি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা শুরু হয়।

এর পর থেকে প্রায় ১০০ জন প্রার্থী উপযুক্ত সরকারি কর্তৃপক্ষের দেওয়া জাতিগত শংসাপত্র থাকা এবং সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও ক্রিমি লেয়ারের যুক্তিতে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির দাবির স্বীকৃতি পাননি। তাঁদের অধিকাংশই সুপ্রিম কোর্ট এবং বিভিন্ন হাইকোর্টে দায়ের হওয়া মামলার পক্ষ।

আবেদনকারীদের বক্তব্য, সরকারি কর্মীদের সন্তান এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সন্তানদের মধ্যে এই বিভাজন ‘বৈরিতামূলক বৈষম্য’ সৃষ্টি করেছে।

২০২৬ সালের ১১ মার্চ বিচারপতি পি এস নরসিংহ এবং বিচারপতি আর মহাদেবনের সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ রায় দেয়, অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির মধ্যে ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণের একমাত্র ভিত্তি আয় হতে পারে না।

আদালত বলেছিল, ক্রিমি লেয়ার বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্য একই সামাজিক শ্রেণির সমান অবস্থানে থাকা সদস্যদের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন সৃষ্টি করা নয়। একই অবস্থানে থাকা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির প্রার্থীদের সঙ্গে অসম আচরণ শুধু আইনগতভাবে ভুল নয়, সাংবিধানিকভাবেও অনুমোদনযোগ্য নয়।

শীর্ষ আদালত আরও বলেছিল, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের সন্তানদের শুধু বেতন থেকে পাওয়া আয়ের ভিত্তিতে সংরক্ষণের সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মী প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় না চতুর্থ শ্রেণির সমতুল পদে কাজ করছেন, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।

তা না হলে সমান অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে অসম আচরণ করা হবে। এর ফলে সরকারি কর্মী এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সন্তানদের মধ্যে বৈরিতামূলক বৈষম্য তৈরি হবে, যা সংবিধানের ১৪, ১৫ ও ১৬ অনুচ্ছেদের সাম্যের নীতির বিরোধী।

সুপ্রিম কোর্ট তার রায় কার্যকর করার জন্য ছয় মাস সময় দিয়েছিল। সেই সময়সীমা ১১ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়ার কথা। মঙ্গলবার কেন্দ্র ব্যাখ্যা চেয়ে আবেদন করার আগে পর্যন্ত সরকার রায়টি কার্যকর করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলেই মনে হয়েছিল।

১১ মার্চের রায় সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হলে শুধু ভবিষ্যতের পরীক্ষার্থীরাই সুবিধা পাবেন না; আগের পরীক্ষাগুলিতে যাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁরাও উপকৃত হতে পারেন। তার ফলে কয়েকজন প্রার্থীর মেধাক্রম নতুন করে নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

‘খেলার নিয়ম’ নীতি

চাকরি ও নিয়োগ-সংক্রান্ত আইনের একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি হল, নির্বাচন বা নিয়োগপ্রক্রিয়া চলাকালীন তার মাপকাঠি বদলানো যায় না। সুপ্রিম কোর্ট একে ‘খেলার নিয়ম’ নীতি বলে বর্ণনা করেছে।

২০২৪ সালে ‘তেজ প্রকাশ পাঠক বনাম রাজস্থান হাইকোর্ট’ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের সংবিধান বেঞ্চ বলেছিল, খেলার নিয়ম—অর্থাৎ নির্বাচনের মাপকাঠি—নির্বাচনপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাওয়ার পরে বা তার মাঝপথে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিবর্তন করতে পারে না।

কোনও নির্দিষ্ট নিয়মের ভিত্তিতে প্রার্থীরা নিয়োগ বা ভর্তির প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। তাঁদের স্বার্থ রক্ষা করাই এই নীতির উদ্দেশ্য। প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাওয়ার পরে কর্তৃপক্ষ নতুন শর্ত আরোপ করলে অথবা পুরনো নিয়ম পরিবর্তন করলে আদালত সাধারণত তা অনুমোদন করে না।

সাম্প্রতিক নিট মামলা

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ‘দিবজ্যোৎ সেখোঁ বনাম পাঞ্জাব সরকার’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট একই নীতি প্রয়োগ করেছিল। পাঞ্জাবের খেলোয়াড় সংরক্ষণের আওতায় এমবিবিএস এবং বিডিএস পাঠ্যক্রমে ভর্তি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল।

ভর্তির নির্দেশিকা প্রকাশ এবং প্রার্থীদের আবেদন জমা দেওয়ার পরে পাঞ্জাব সরকার খেলোয়াড় সংরক্ষণের যোগ্যতার পরিধি বাড়িয়েছিল।

সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, খেলা শুরু হয়ে যাওয়ার পরে খেলার নিয়ম বদলানো যায় না—এটি সুপ্রতিষ্ঠিত আইনি নীতি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রেও এই নীতি ঠিক ততটাই প্রযোজ্য, যতটা সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে।

আদালতের বক্তব্য ছিল, নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরে যেমন নিয়োগের নিয়ম বদলানো যায় না, তেমনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি শুরু হওয়ার আগে গোটা প্রক্রিয়ার প্রত্যেকটি দিক স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষের স্বার্থ পূরণ অথবা স্বজনপোষণের সুযোগ তৈরি করার জন্য পরে নতুন নিয়ম আরোপের অবকাশ রাখা বেআইনি।

পরিবর্তিত যোগ্যতার মাপকাঠিকে বেআইনি ঘোষণার পরে আদালতের সামনে প্রশ্ন ছিল, আবেদনকারীদের কী প্রতিকার দেওয়া হবে। সাধারণ পরিস্থিতিতে গোটা মেধাতালিকা নতুন করে তৈরির নির্দেশ দেওয়া যেত। কিন্তু আদালত তা করেনি। কারণ তেমন নির্দেশ দিলে মামলার পক্ষ নন, এমন প্রার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতেন এবং ইতিমধ্যে স্থির হয়ে যাওয়া ব্যবস্থা আবার ওলটপালট হয়ে যেত।

কেন্দ্রের আবেদন

সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া আবেদনে কেন্দ্রীয় সরকার বলেছে, ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণের এত দিনের প্রতিষ্ঠিত অবস্থান বদলে দেওয়া ১১ মার্চের রায়টি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ২০২৫-এর চূড়ান্ত ফল ঘোষণার পাঁচ দিন পরে দেওয়া হয়েছিল।

সরকারের বক্তব্য, রায় ঘোষণার আগেই সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ২০২৫-এর নির্বাচনপ্রক্রিয়া কার্যত সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। বর্তমানে প্রার্থীদের বিভিন্ন সরকারি পরিষেবায় বণ্টনের কাজও একেবারে শেষ পর্যায়ে।

কেন্দ্রের যুক্তি, ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ২০২৫-এর নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় ১১ মার্চের রায়টি যান্ত্রিকভাবে বা কোনও শর্ত ছাড়াই পূর্ববর্তী সময় থেকে কার্যকর করা হলে গুরুতর অসঙ্গতি তৈরি হবে। এমনকি একই পরীক্ষাবর্ষের প্রার্থীদের মধ্যেই নতুন বৈষম্যের জন্ম হতে পারে।

সরকার জানিয়েছে, এই পর্যায়ে বিভিন্ন সংরক্ষিত শ্রেণিভিত্তিক মেধাতালিকা আবার তৈরি করতে হলে তার ধারাবাহিক প্রভাব পড়বে প্রশিক্ষণসূচি, একটি দলের মোট আধিকারিকের সংখ্যা, রাজ্য বা কর্মক্ষেত্র বণ্টন, চাকরিতে জ্যেষ্ঠতা এবং বেতন নির্ধারণের উপরে।

কেন্দ্রের এই উদ্বেগের সঙ্গে দিবজ্যোৎ সেখোঁ মামলায় আদালতের বিবেচনার মিল রয়েছে। সেই মামলায় সংশ্লিষ্ট নিয়মকে বেআইনি ঘোষণা করা হলেও ইতিমধ্যে ভর্তি হয়ে যাওয়া এবং মামলার পক্ষ নন, এমন পড়ুয়াদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সুপ্রিম কোর্ট গোটা ভর্তি তালিকা নতুন করে তৈরির নির্দেশ দেয়নি।

কেন্দ্র তাই শীর্ষ আদালতের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছে—১১ মার্চের রায়টি যেন ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ২০২৫-এর ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সময় থেকে কার্যকর করা না হয়।

সরকারের মতে, রায়টি নিঃশর্তভাবে পুরনো নির্বাচনপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া ভর্তি, শেষ হয়ে যাওয়া শিক্ষাবর্ষ, ইতিমধ্যে দেওয়া শিক্ষাগত উপাধি এবং পড়ুয়াদের প্রতিষ্ঠিত অধিকারও নতুন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যেতে পারে।