শ্চিমবঙ্গের ৪,১৩৩টি স্কুলে এক জন পড়ুয়াও নথিভুক্ত নেই। অথচ সেই স্কুলগুলিতেই রয়েছেন ১৯,৫০২ জন শিক্ষক। অন্য দিকে, রাজ্যের ৬,৭৬৯টি স্কুল চলছে মাত্র এক জন শিক্ষককে নিয়ে, যেখানে পড়াশোনা করে ২ লক্ষ ২৯ হাজার ৫৬৯ জন ছাত্রছাত্রী। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের ‘ইউনিফায়েড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ফর এডুকেশন প্লাস’ বা ইউডাইস প্লাসের ২০২৫-২৬ সালের প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষার এই উদ্বেগজনক বৈপরীত্য ধরা পড়েছে।

কেন্দ্রীয় স্কুলশিক্ষা ও সাক্ষরতা বিভাগ জুলাই মাসে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। অগস্টে সেটি শিক্ষা মন্ত্রকের ওয়েবসাইটে তোলা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোটা দেশে পড়ুয়াবিহীন স্কুলের সংখ্যা ৫,৬৬৩। তার মধ্যে ৪,১৩৩টিই পশ্চিমবঙ্গে। অর্থাৎ, দেশের পড়ুয়াশূন্য স্কুলগুলির প্রায় ৭৩ শতাংশ এই রাজ্যে। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা উত্তরপ্রদেশে এমন স্কুলের সংখ্যা ৩১৩। সেখানে নিযুক্ত শিক্ষক রয়েছেন ১৭৭ জন।

পরিস্থিতি যে এক বছরে আরও খারাপ হয়েছে, তা আগের বছরের পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনা করলেই স্পষ্ট। ২০২৪-২৫ সালের ইউডাইস প্লাস প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে পড়ুয়াশূন্য স্কুল ছিল ৩,৮১২টি এবং সেই সব স্কুলে শিক্ষক ছিলেন ১৭,৯৬৫ জন। এক বছরের মধ্যে পড়ুয়াহীন স্কুল বেড়েছে ৩২১টি, শিক্ষক বেড়েছেন ১,৫৩৭ জন। একই সময়ে এক-শিক্ষক স্কুলের সংখ্যা ৬,৪৮২ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬,৭৬৯। তবে ওই সব স্কুলে মোট পড়ুয়ার সংখ্যা ২ লক্ষ ৩৫ হাজার ৪৯৪ থেকে কমে ২ লক্ষ ২৯ হাজার ৫৬৯ হয়েছে।

রাজ্যের স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মণ এই অসামঞ্জস্যের জন্য মূলত বেসরকারি স্কুলগুলির তথ্য নথিভুক্তির ভুলকে দায়ী করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কয়েকটি বেসরকারি স্কুল কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে শিক্ষকদের বিবরণ জমা দিলেও পড়ুয়াদের তথ্য ঠিকমতো দেয়নি। সেই কারণেই ওই স্কুলগুলিতে শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও পড়ুয়ার সংখ্যা শূন্য দেখাচ্ছে। সমস্যা সংশোধনের জন্য নতুন ব্যবস্থা তৈরির কাজ চলছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

তবে নিয়োগ ও শিক্ষক বণ্টনের সমস্যাও স্বীকার করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, গত ১৫ বছরে ব্যাপক দুর্নীতির কারণে প্রায় কোনও শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। অতিরিক্ত শিক্ষক থাকা স্কুল থেকে শিক্ষকশূন্য অথবা এক-শিক্ষক স্কুলে বদলি করে শিক্ষকসংখ্যার ভারসাম্য আনার কাজ শুরু হয়েছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে তাঁর দাবি।

ইউডাইস প্লাসের তথ্যে আরও দেখা যাচ্ছে, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতের নিরিখে দেশের দ্বিতীয় দুর্বলতম অবস্থানে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যে প্রতি ৩০ জন পড়ুয়ার জন্য এক জন শিক্ষক রয়েছেন। একমাত্র ঝাড়খণ্ডের অবস্থা আরও খারাপ—সেখানে অনুপাত ৩৬:১। গত বছর পশ্চিমবঙ্গে এই অনুপাত ছিল ২৯:১।

পশ্চিমবঙ্গে মোট স্কুলের সংখ্যা ৯৩,১৪৭। তার মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশ স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা দশ বা তার কম। বিপরীত দিকে, সাড়ে ৮ শতাংশ স্কুলে পড়ুয়া পাঁচশোর বেশি। ফলে কোনও স্কুলে শিক্ষক আছেন কিন্তু পড়ুয়া নেই, আবার কোথাও বিপুলসংখ্যক পড়ুয়ার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন মাত্র এক জন শিক্ষক।

পরিকাঠামোর ছবিও বিশেষ আশাব্যঞ্জক নয়। রাজ্যের মাত্র ৪০৩টি স্কুলে ডিজিটাল গ্রন্থাগার রয়েছে। কম্পিউটারের সুবিধা রয়েছে ২৩,৮৯৪টি স্কুলে এবং ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে ১৮,৩৭৪টি স্কুলে।

এর আগে ভারতের নিয়ন্ত্রক ও মহা হিসাব নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গের ৫২০টি স্কুলে মোট ৮,৫৯৬ জন পড়ুয়া থাকলেও শিক্ষক এক জনও নেই। আরও ৫,১৫২টি স্কুলে ১ লক্ষ ৭৬ হাজারের বেশি পড়ুয়ার জন্য শিক্ষক রয়েছেন মাত্র এক জন করে। প্রাথমিক স্কুলে ৩১,৬৮৪ জন এবং উচ্চপ্রাথমিক স্তরে ২,০৫৮ জন শিক্ষকের ঘাটতিও চিহ্নিত করা হয়েছিল।

ওই নিরীক্ষায় ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ সাল পর্যন্ত সমগ্র শিক্ষা অভিযানের কাজ পরীক্ষা করে দেখা হয়। উচ্চপ্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পৌঁছনোর পথে ২৮ থেকে ৪২ শতাংশ পড়ুয়া হারিয়ে যাচ্ছে। স্কুলছুটদের ৫৩ শতাংশ আর্থিক অনটনকে কারণ হিসেবে জানিয়েছে। অনিচ্ছা, কাজের সন্ধানে পরিযান এবং অল্পবয়সে বিয়েও পড়াশোনা বন্ধের বড় কারণ। ফলে বেসরকারি স্কুলের তথ্যগত ভুল সংশোধন করলেই পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষার গভীর শিক্ষক-বণ্টন ও স্কুলছুট সমস্যা মিটবে না—কেন্দ্রের প্রতিবেদন সেই কথাই স্পষ্ট করে দিয়েছে।