Home খবর মোদির ‘মিম-যুদ্ধে’ তরুণদের পাল্টা আঘাত!

মোদির ‘মিম-যুদ্ধে’ তরুণদের পাল্টা আঘাত!

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
9 views 5 minutes read
A+A-
Reset

স্মার্টফোন হাতে, ক্যামেরা চালু, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে লাখো মানুষের কাছে। ভারতের জেন-জি প্রজন্মের এই ডিজিটাল শক্তিই এবার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘদিনের সুসংগঠিত তথ্য-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে মোদি নিজের এক শক্তিশালী, প্রায় অভ্রান্ত রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন। কিন্তু এবার ভিডিও, মিম, ব্যঙ্গ, লাইভ স্ট্রিম এবং মোবাইলে ধারণ করা বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তরুণরা এমন এক বিকল্প বয়ান তৈরি করছে, যা সরকারি প্রচারযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

নয়াদিল্লির যন্তর-মন্তর থেকে শুরু হওয়া ছাত্র-যুব আন্দোলন ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশ্নফাঁস, বেকারত্ব, জবাবদিহির অভাব এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন সরাসরি প্রশ্ন তুলছে মোদি সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়েও।

প্রতিবাদস্থলে দেখা যাচ্ছে ব্যঙ্গাত্মক পোস্টার, ছড়া, স্লোগান ও শিল্পকর্ম। বহু পোস্টারের লক্ষ্য সরাসরি প্রধানমন্ত্রী। একসময় যাঁকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে অনেকে দ্বিধা বোধ করতেন, তাঁকেই এখন লক্ষ লক্ষ তরুণ সামাজিক মাধ্যমে কৌতুক, মিম ও তীব্র ব্যঙ্গের বিষয় করে তুলছেন।

‘৫৬ ইঞ্চি’র ব্যঙ্গ থেকে ভাইরাল মিম

একটি বহুল আলোচিত ভিডিওতে বিক্ষোভকারীরা মোদির বহুল প্রচারিত “৫৬ ইঞ্চি বুকের ছাতি” মন্তব্যকে ব্যঙ্গ করে স্লোগান দেন। আরও বহু ভিডিও ও পোস্টে সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কটাক্ষ করা হয়েছে আরও তীব্র ভাষায়।

সামাজিক মাধ্যম ও অ্যালগরিদম নিয়ে গবেষণা করা লেখক অনুরাগ মাইনাস বর্মার মতে, এত বিপুল সংখ্যক মানুষ একসঙ্গে রাস্তায় নেমে আসায় বহুদিনের জমে থাকা ভয় ভেঙে গেছে।

তাঁর মতে, জনসমাবেশ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করেছে। ফলে মানুষ এখন আরও খোলাখুলি নিজেদের মত প্রকাশ করছে। সেই মতপ্রকাশ অনেকটাই দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণের মতো।

শুরুটা কিন্তু মোদিকে ঘিরে ছিল না

আন্দোলনের শুরুতে মূল দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। সাম্প্রতিক একাধিক প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মে ক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। তিনি অনশন শুরু করার পর পুলিশ তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং যন্তর-মন্তরের আন্দোলনস্থল খালি করার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ ওঠে।

এরপরও কয়েক দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নীরব থাকেন। অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান আন্দোলনকারীদের “সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের বি-টিম” বলে আক্রমণ করেন।

তরুণদের একাংশ এই মন্তব্যকে বলছেন ‘হোয়াটসঅ্যাপ আঙ্কেল’ মানসিকতার উদাহরণ।

‘হোয়াটসঅ্যাপ আঙ্কেল’ বনাম জেন-জি

তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় এই শব্দবন্ধটি সাধারণত এমন এক প্রজন্মকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যারা একমুখী উপদেশমূলক ভাষায় কথা বলে এবং হোয়াটসঅ্যাপে ফরোয়ার্ড হওয়া রাজনৈতিক বার্তাকেই সত্য বলে ধরে নেয়।

বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংগঠিত রাজনৈতিক প্রচার চালিয়ে আসছে। কিন্তু এবার সেই ডিজিটাল পরিসরেই পাল্টা বয়ান তৈরি করছে তরুণ প্রজন্ম।

মে মাসে দেশের প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে বেকার যুবকদের “পরজীবী” ও “আরশোলা” বলার অভিযোগ ওঠে। তারই প্রতিক্রিয়ায় এক গবেষক ছাত্র ব্যঙ্গ করে “ককরোচ জনতা পার্টি” বা সিজেপি নামে একটি কাল্পনিক সংগঠন তৈরি করেন।

অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি ইনস্টাগ্রামে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। বর্তমানে তার অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৬০ লক্ষ—যা বিজেপির ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যার প্রায় তিন গুণ বলে দাবি করা হচ্ছে।

মূলধারার নীরবতা, ডিজিটাল মিডিয়ার সরব উপস্থিতি

আন্দোলনের প্রথম দিকের দিনগুলিতে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বড় অংশ প্রায় নীরব ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। কিন্তু স্বাধীন ইউটিউব চ্যানেল, ইনস্টাগ্রাম নির্মাতা এবং ছোট ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমগুলি ঘটনাস্থল থেকে ধারাবাহিকভাবে ভিডিও প্রকাশ করতে থাকে।

‘পিক টিভি’ নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মাত্র এক সপ্তাহে ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবে আন্দোলনসংক্রান্ত ছোট ভিডিও মিলিয়ে ২০ কোটিরও বেশি ভিউ পায়।

আবার ‘আনফিল্টার্ড বাই সামদিশ’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের দৃশ্য ব্যারিকেডের ভিতর থেকে ধারণ করে প্রকাশ করে। মাত্র দু’দিনে সেই ভিডিও ২০ লক্ষেরও বেশি মানুষ দেখেন।

প্রতিবাদকারীরাও সংঘর্ষের মুহূর্তগুলি নিজেদের মোবাইলে নথিবদ্ধ করেছেন। ফলে প্রশাসনের তৈরি বয়ানের পাশাপাশি সামনে এসেছে আন্দোলনকারীদের নিজেদের অভিজ্ঞতার ছবি।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ লাঠি হাতে ধাওয়া করছে আর তরুণরা দৌড়তে দৌড়তেই মোবাইলে ভিডিও করছেন। অন্য একটি ভিডিওতে পুলিশ ভ্যানে বসে এক ছাত্র আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মাদক মামলা দেওয়া হতে পারে। পরে ক্যামেরার দিকে তাঁর বিস্মিত মুখভঙ্গিই পরিণত হয়েছে ভাইরাল মিমে।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ জয়জিত পালের মতে, এই আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে যে গত এক দশকে সরকারের তৈরি কেন্দ্রীভূত তথ্য-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আর আগের মতো কার্যকর নেই।

তাঁর ভাষায়, আগে বয়ানটি ছিল—“দেখুন পুলিশ কী করেছে।” এখন তা বদলে হয়েছে—“আজকের দিনটা আমাদের কাছে ঠিক কেমন ছিল।” আর সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার এই বয়ানই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

আন্দোলন, মিম—সব একসঙ্গে

আন্দোলন এখন শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদের জায়গা নয়, একই সঙ্গে বিশাল ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রও হয়ে উঠেছে।

কেউ আন্দোলনে যাওয়ার আগে ‘গেট রেডি উইথ মি’ ভিডিও বানাচ্ছেন। কেউ পুলিশের লাঠির আঘাত থেকে বাঁচতে প্যান্টের ভিতরে ফোম ঢোকানোর কৌশল দেখাচ্ছেন। কেউ আবার ‘ফিট চেক’ ভিডিওতে জানাচ্ছেন, আন্দোলনে কী পোশাক পরে এসেছেন।

পুলিশের বাসে আটক হওয়ার পর এক তরুণ লিখেছেন, “বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রকে ধন্যবাদ, পুলিশ বাসে জানালার ধারের আসনটা পেলাম।”

আরেকটি ভিডিওতে এক তরুণ খাওয়াদাওয়া সেরে ফিরে আসা পুলিশকর্মীদের উদ্দেশে রসিকতা করে বলেন, “খেয়ে নিলেন আঙ্কেলজি? পেট ভরে গেছে? এবার যুদ্ধে যাচ্ছেন?”

ব্যঙ্গ, রসিকতা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এমন এক ডিজিটাল প্রতিবাদ, যা প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষার অনেকটাই বাইরে।

মোদির ‘সেলফি-স্টাইল’ বার্তা

এখনও স্পষ্ট নয়, ৭৫ বছর বয়সি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্মকে কীভাবে শান্ত করার চেষ্টা করবেন।

আন্দোলনের দাবিও ইতিমধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের সাধারণ ক্ষমা, প্রশ্নফাঁসের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও সামনে এসেছে।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে মোদি জনপ্রিয় ইউটিউবার, ইনফ্লুয়েন্সার এবং পডকাস্টারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছিলেন। সামাজিক মাধ্যমের বদলে যাওয়া চরিত্র সম্পর্কে তাঁর সচেতনতার ইঙ্গিত হিসেবেই সেই পদক্ষেপকে দেখেছিলেন অনেকে।

তবে এবার আন্দোলন নিয়ে প্রথমবার ভিডিও বার্তা দেওয়ার সময় তাঁর পরিচিত বহু-ক্যামেরার পরিশীলিত প্রযোজনা দেখা যায়নি। বরং মোবাইল ফোনে সেলফির মতো কাছ থেকে ধারণ করা ভিডিওতে ইংরেজিতে “ফ্রেন্ডস” বলে বক্তব্য শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি নিয়ে তিনি নীরব থাকেন।

আর ভিডিওটি প্রকাশের সময়ই দিল্লির যন্তর-মন্তর এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ ছিল।

সামাজিক মাধ্যমে এক ব্যবহারকারীর মন্তব্য তাই মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়—

“যন্তর-মন্তরে তো ইন্টারনেটই বন্ধ। সেখানে যারা আন্দোলন করছে, তারা আপনার এই ভিডিও দেখবে কীভাবে, স্যার?”

মোদির রাজনৈতিক যোগাযোগের শক্তি এখনও অটুট। বিজেপির সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, রাজ্য নির্বাচনে দল সাফল্য পাচ্ছে, বিরোধীরা ছন্নছাড়া এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থসংগ্রহের দিক থেকে মোদির সমকক্ষ এখনও কেউ নেই।

তবু নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট—ভারতের তরুণ প্রজন্ম এখন শুধু সরকারের বয়ান শুনছে না। তারা নিজেরাই ক্যামেরা ধরছে, নিজেরাই গল্প বলছে, নিজেরাই মিম বানাচ্ছে এবং নিজেরাই সেই গল্প ছড়িয়ে দিচ্ছে।

আর সেই কারণেই ভারতের রাজনৈতিক তথ্যযুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ এখন আর একমুখী নয়।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles