Home খবর গণ-আন্দোলনের চাপ, এই নিয়ে তৃতীয়বার পিছু হটল মোদী সরকার

গণ-আন্দোলনের চাপ, এই নিয়ে তৃতীয়বার পিছু হটল মোদী সরকার

Authored By নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়
28 views 6 minutes read
A+A-
Reset

ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদী সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল দৃঢ় সিদ্ধান্তের ভাবমূর্তি। একবার কোনও নীতি ঘোষণা হলে সরকার সাধারণত পিছিয়ে আসে না—এমন ধারণাই গত এক দশকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তব বলছে, জনমতের প্রবল চাপ যখন রাজনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করেছে, তখন মোদী সরকারও একাধিকবার অবস্থান বদলাতে বাধ্য হয়েছে।

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) বিতর্ক, তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার এবং সর্বশেষ নীট প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ—এই তিনটি ঘটনাকে একই সূত্রে গাঁথা যায়। তিন ক্ষেত্রেই প্রথমে সরকার অনড় থেকেছে, আন্দোলনের গুরুত্ব কমিয়ে দেখেছে, বিরোধীদের ভূমিকার কথা বলেছে। কিন্তু আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে, আর শেষ পর্যন্ত সরকারকে কৌশলগতভাবে পিছিয়ে আসতে হয়েছে।

প্রথম অধ্যায়: সিএএ-এনআরসি বিতর্ক

২০১৯ সালের সিএএ-বিরোধী আন্দোলন ছিল মোদী সরকারের সামনে প্রথম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং তার সঙ্গে সম্ভাব্য সর্বভারতীয় এনআরসি।

আইনগত দিক থেকে সরকার কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বভারতীয় এনআরসি চালুর বিজ্ঞপ্তি জারি করেনি। কিন্তু রাজনৈতিক বার্তা ছিল স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একাধিক সভায় দেশজুড়ে এনআরসি চালুর কথা বলেন এবং তাঁর বিখ্যাত “ক্রোনোলজি বুঝুন” মন্তব্য সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে কোনও সংশয় রাখেনি।

কিন্তু দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেন, সর্বভারতীয় এনআরসি নিয়ে সরকার কোনও সিদ্ধান্তই নেয়নি। এই বক্তব্য কার্যত সরকারের আগের অবস্থান থেকে সরে আসারই ইঙ্গিত দেয়। এরপর থেকে এনআরসি প্রসঙ্গ আর রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় ফিরে আসেনি।

এটি ছিল মোদী সরকারের প্রথম বড় কৌশলগত পশ্চাদপসরণ।

দ্বিতীয় অধ্যায়: কৃষক আন্দোলনের কাছে পরাজয়

দ্বিতীয় এবং আরও বড় ধাক্কা আসে কৃষক আন্দোলনে।

২০২০ সালে কেন্দ্র তিনটি কৃষি আইন পাশ করার পর পাঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ-সহ বিভিন্ন রাজ্যের কৃষকেরা দিল্লির সীমান্তে দীর্ঘ আন্দোলন শুরু করেন।

প্রথমদিকে সরকারের বিশ্বাস ছিল আন্দোলন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়বে। আন্দোলনকারীদের বিরোধীদের মদতপুষ্ট কিংবা সীমিত অঞ্চলের স্বার্থরক্ষাকারী হিসেবে তুলে ধরারও চেষ্টা হয়।

কিন্তু কৃষকেরা এক বছরেরও বেশি সময় অবস্থান চালিয়ে যান। আন্দোলন ক্রমশ জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে। শেষ পর্যন্ত গুরু নানকের জন্মজয়ন্তীর দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন এবং কৃষকদের কাছে ক্ষমাও চান।

স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি ছিল বিরল ঘটনা—যেখানে একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার সংসদে পাশ করানো আইন জনচাপের মুখে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

তৃতীয় অধ্যায়: নীট প্রশ্নফাঁস এবং ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ

সর্বশেষ ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ।

নীট-ইউজি প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।

এই আন্দোলনের চরিত্র আগের দুই আন্দোলনের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে কোনও একক রাজনৈতিক দল, কোনও শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন বা কোনও নির্দিষ্ট নেতৃত্ব ছিল না।

এটি ছিল মূলত তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। সামাজিক মাধ্যমই হয়ে ওঠে আন্দোলনের প্রধান সংগঠক। ইনস্টাগ্রাম রিল, মিম, ব্যঙ্গ, ছোট ভিডিও—এসবের মাধ্যমে প্রতিবাদের ভাষাই বদলে যায়।

ফলে সরকারের পরিচিত রাজনৈতিক কৌশল কার্যকর হয়নি।

সাধারণত সরকার আন্দোলনের নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করে, মতভেদ তৈরি করে বা সময়ের অপেক্ষা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। কিন্তু এখানে কোনও একক নেতৃত্বই ছিল না।

এমনকি সোনম ওয়াংচুক অনশন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দেওয়ার পরও ছাত্ররা ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকে। অর্থাৎ নেতৃত্ব ছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বহু মানুষের মধ্যে।

২০ জুলাইয়ের পর বদলে যায় পরিস্থিতি

২০ জুলাই পুলিশের কড়া পদক্ষেপ আন্দোলনকে দমন করার পরিবর্তে উল্টে তাকে আরও শক্তিশালী করে।

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, প্রশাসনিক কড়াকড়ি আন্দোলনকে ভীত করে তুলেছে। কিন্তু এখানে তার উল্টো ছবি দেখা যায়।

যুবকদের বড় অংশ পুলিশের পদক্ষেপকে দমনের পরিবর্তে প্রতিবাদের আরও বড় কারণ হিসেবে গ্রহণ করে। সরকারের কাছে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।

বিজেপির সবচেয়ে বড় উদ্বেগ

এই আন্দোলনের আরেকটি বিশেষ দিক বিজেপির জন্য আরও অস্বস্তিকর।

সিএএ আন্দোলনকে সরকার সহজেই বিরোধীদের আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছিল। কৃষক আন্দোলনকেও দীর্ঘদিন নির্দিষ্ট কয়েকটি রাজ্যের সমস্যা বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা হয়েছিল।

কিন্তু নীট আন্দোলনে সেই সুযোগ ছিল না।

এই আন্দোলনের বড় অংশের অংশগ্রহণকারী ছিলেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছাত্রছাত্রী—যাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে বিজেপির সম্ভাব্য সমর্থক বলেই ধরা হয়।

অর্থাৎ অসন্তোষ এবার বিরোধী রাজনীতির বাইরে গিয়েও শাসক দলের সামাজিক ভিত্তির মধ্যে প্রবেশ করেছে।

একজন বিজেপি নেতার কথায়, ঘোষিত বিরোধীদের প্রতিবাদকে রাজনৈতিক বলে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু নিজের সামাজিক ভিত্তির তরুণরা যখন রাস্তায় নামে, তখন পরিস্থিতি অনেক বেশি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।

এম জে আকবর: এক ভিন্ন নজির

মোদী আমলে জনচাপের মুখে মন্ত্রীর পদত্যাগের আরেকটি উদাহরণ অবশ্য রয়েছে।

#মি-টু আন্দোলনের সময় যৌন হেনস্থার অভিযোগের জেরে বিদেশ প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর পদত্যাগ করেন।

তবে সেই ঘটনা সরকারের নীতি বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ছিল না। ফলে সিএএ, কৃষি আইন বা নীট আন্দোলনের সঙ্গে তার সরাসরি তুলনা চলে না।

এই তিন ঘটনার শিক্ষা

এই তিনটি ঘটনাই দেখায়, মোদী সরকার সাধারণত বিরোধিতাকে রাজনৈতিক শক্তির পরীক্ষার চোখে দেখে। শুরুতে আপসের বদলে দৃঢ় অবস্থান নেয়। কিন্তু আন্দোলন যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং রাজনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করে, তখন সরকার বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

সরকারের সমর্থকদের মতে, এটি দুর্বলতা নয়; বাস্তববাদী রাজনীতি। সমালোচকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে সরকার যুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক চাপের প্রতি বেশি সাড়া দেয়।

ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগও সম্ভবত সেই ধারারই সর্বশেষ উদাহরণ। সরকার আপাতত ক্ষোভ প্রশমিত করতে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এই ঘটনা আরও একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—ভারতের নতুন প্রজন্ম কি দেশের রাজনীতিতে প্রতিবাদের ভাষা এবং সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দিচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আগামী দিনের ভারতীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles