এইচ-১বি-তে ৯০ লক্ষের ধাক্কা

যা জানা জরুরি
- নতুন আবেদনে ১ লক্ষ ৩ হাজার ডলারের মাশুল স্থায়ী করার প্রস্তাব ট্রাম্প প্রশাসনের, সবচেয়ে বড় চাপ ভারতীয়দের উপর আমেরিকায় উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ…
- এইচ-১বি ভিসার নতুন আবেদনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১ লক্ষ ৩ হাজার ২৬৫ ডলারের মাশুল স্থায়ী করার প্রস্তাব দিয়েছে আমেরিকার স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দফতর।
- ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৯০ লক্ষ টাকা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নতুন আবেদনে ১ লক্ষ ৩ হাজার ডলারের মাশুল স্থায়ী করার প্রস্তাব ট্রাম্প প্রশাসনের, সবচেয়ে বড় চাপ ভারতীয়দের উপর
আমেরিকায় উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ আরও ব্যয়বহুল করতে চাইছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। এইচ-১বি ভিসার নতুন আবেদনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১ লক্ষ ৩ হাজার ২৬৫ ডলারের মাশুল স্থায়ী করার প্রস্তাব দিয়েছে আমেরিকার স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দফতর। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৯০ লক্ষ টাকা। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে বর্তমানে কয়েক হাজার ডলারের মধ্যে থাকা ভিসা-সংক্রান্ত খরচ এক লাফে বহুগুণ বাড়বে।
সোমবার প্রকাশিত সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বার্ষিক সংখ্যাসীমার আওতায় থাকা নতুন এইচ-১বি আবেদনের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে। উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে সংরক্ষিত ২০ হাজার ভিসার আবেদনও এর আওতায় পড়বে। প্রচলিত অন্যান্য মাশুলের পাশাপাশি এই অর্থ দিতে হবে নিয়োগকারী সংস্থাকে।
ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত প্রস্তাব
প্রস্তাবটি নিয়ে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জনমত নেওয়া হবে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ বিধি চূড়ান্ত করাই প্রশাসনের লক্ষ্য।
কেন এত টাকা?
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থা পরিচালনায় স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা, বিচার, বিদেশ এবং শ্রম দফতরের বিপুল খরচ হয়। সেই ব্যয়ের একটি অংশ মেটাতেই এই মাশুল। বছরে ৮৫ হাজার আবেদন ধরে সরকারের সম্ভাব্য আয় প্রায় ৮৮০ কোটি ডলার হতে পারে বলে সরকারি নথিতে হিসাব করা হয়েছে।
তবে সমালোচকদের বক্তব্য, এটি শুধু রাজস্ব সংগ্রহের পরিকল্পনা নয়; বিদেশি কর্মী নিয়োগ নিরুৎসাহিত করাই এর অন্যতম লক্ষ্য। বড় প্রযুক্তি সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য এই বিপুল অর্থ দিতে পারলেও ছোট সংস্থা, স্টার্ট-আপ, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার কিংবা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রত্যেক কর্মীর জন্য প্রায় ৯০ লক্ষ টাকা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।
আদালতে ধাক্কা খেয়েছিল আগের মাশুল
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রপতির ঘোষণায় নতুন এইচ-১বি ভিসার উপর অস্থায়ী ভাবে ১ লক্ষ ডলারের মাশুল বসানো হয়েছিল। সেই ব্যবস্থার মেয়াদ আগামী সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু জুনে বোস্টনের ফেডারেল বিচারক লিয়ো সরোকিন সেই ব্যবস্থা বাতিল করে প্রশ্ন তোলেন—এটি আদৌ মাশুল, নাকি কার্যত কর? তাঁর যুক্তি ছিল, কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া রাষ্ট্রপতি এমন কর আরোপ করতে পারেন না।
২০টি ডেমোক্র্যাট-শাসিত অঙ্গরাজ্যের মামলায় আদালত আরও বলেছিল, বৈধ বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে এ ভাবে অর্থদণ্ড চাপানো যায় না। জুলাইয়ে প্রথম সার্কিট আপিল আদালতও নিম্ন আদালতের রায় স্থগিত করার প্রশাসনের আবেদন খারিজ করে। মূল আপিল অবশ্য এখনও বিচারাধীন।
নতুন প্রস্তাব তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আগের মাশুল রাষ্ট্রপতির একতরফা ঘোষণার মাধ্যমে বসানো হয়েছিল। এবার স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দফতর পূর্ণাঙ্গ বিধি প্রণয়নের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আইনি অবস্থান আরও শক্ত করতে চাইছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—কংগ্রেস কি সত্যিই এত বিপুল অর্থ আদায়ের ক্ষমতা দফতরকে দিয়েছে?
কাদের উপর পড়বে কোপ?
এইচ-১বি ব্যবস্থায় প্রতি বছর সাধারণ বিভাগে ৬৫ হাজার এবং আমেরিকায় উচ্চতর ডিগ্রিপ্রাপ্তদের জন্য আরও ২০ হাজার ভিসা দেওয়া হয়। সাধারণত ভিসার মেয়াদ তিন বছর, পরে তা ছয় বছর পর্যন্ত বাড়ানো যায়।
আগের অস্থায়ী ব্যবস্থায় আমেরিকার বাইরে থাকা নতুন আবেদনকারীদের উপর অতিরিক্ত মাশুলটি মূলত প্রযোজ্য ছিল। আমেরিকায় ছাত্র ভিসায় থেকে এইচ-১বি-তে পরিবর্তনকারী এবং পুরনো ভিসা নবীকরণকারীরা এর বাইরে ছিলেন।
নতুন প্রস্তাবের ভাষা অবশ্য আরও বিস্তৃত। বার্ষিক সংখ্যাসীমার আওতায় থাকা সব নতুন আবেদনকেই এর মধ্যে আনার কথা বলা হয়েছে। চূড়ান্ত বিধিতে কী কী ছাড় থাকবে, তাই এখন বড় প্রশ্ন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৭০টি নিয়োগকারী সংস্থা মোট ৮৫টি আবেদনের জন্য আগের ১ লক্ষ ডলারের মাশুল দিয়েছিল। এত কম সংখ্যক আবেদনই দেখাচ্ছে, বিপুল মাশুল নিয়োগের সিদ্ধান্তে কতটা বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।
ভারতীয়দের জন্য বড় দুশ্চিন্তা
এইচ-১বি ভিসাপ্রাপকদের মধ্যে ভারতীয়দের অংশ দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে বেশি। তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বহু ভারতীয় এই ভিসার মাধ্যমে আমেরিকায় কাজ করেন।
নতুন মাশুল কার্যকর হলে মার্কিন সংস্থাগুলি বিদেশ থেকে সরাসরি কর্মী নিয়োগ কমিয়ে দিতে পারে। অত্যন্ত বিশেষায়িত পদের ক্ষেত্রেই শুধু এইচ-১বি-র আবেদন করার প্রবণতা বাড়তে পারে। পাশাপাশি, আমেরিকায় ইতিমধ্যে থাকা বিদেশি ছাত্রদের নিয়োগের দিকে সংস্থাগুলি বেশি ঝুঁকতে পারে।
বড় ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলিও বিদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর বদলে আমেরিকায় স্থানীয় নিয়োগ বাড়াতে বাধ্য হতে পারে। ফলে সদ্য স্নাতক, মাঝারি দক্ষতার কর্মী এবং ছোট সংস্থায় চাকরিপ্রার্থীদের উপর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে এখনও এই ৯০ লক্ষ টাকার মাশুল কার্যকর হয়নি। বিধি চূড়ান্ত করা, আদালতে চলা আপিল এবং সম্ভাব্য নতুন আইনি চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়েই ঠিক হবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবের মাটিতে কতটা নামতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



